শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
Bangla FM

কৃষকদের অতিরিক্ত সারের দাবিতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ডিলাররা বিপাকে



কৃষকদের অতিরিক্ত সারের দাবিতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ডিলাররা বিপাকে
ঘোড়াঘাট উপজেলা কৃষি অফিস।

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে আমন মৌসুমে সার বিক্রি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ডিলাররা। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ‘খামারি অ্যাপ’-এ জমির ধরন ও ফসল বিবেচনায় যে পরিমাণ সার ব্যবহারের সুপারিশ করা হচ্ছে, অনেক কৃষক তার তিন থেকে চার গুণ বেশি সার দাবি করছেন। এতে কৃষক ও ডিলারদের মধ্যে প্রায়ই বাগ্‌বিতণ্ডা ও বিরোধের সৃষ্টি হচ্ছে।

ডিলারদের দাবি, অ্যাপের সুপারিশের বাইরে অতিরিক্ত সার বিক্রি করলে সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার না দিলেও উপজেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান ও জরিমানার মুখোমুখি হওয়ার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।

উপজেলার বুলাকিপুর ইউনিয়নের সার ডিলার আহম্মদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ইশতিয়াক আহম্মেদ খান বলেন, ‘সরকারি নিয়ম মেনেই সার দিতে চাই। ডিএপি ও এমওপি নিয়ে তেমন সমস্যা নেই। তবে টিএসপি নিয়ে সবচেয়ে বেশি চাপ।’

তিনি জানান, ঘোড়াঘাট উপজেলায় সার ডিলার রয়েছেন ১৯ জন। এর মধ্যে পৌরসভায় চারজন, সিংড়া ইউনিয়নে ছয়জন, পালশায় চারজন, ঘোড়াঘাট ইউনিয়নে দুজন এবং বুলাকিপুর ইউনিয়নে তিনজন ডিলার রয়েছেন। ১৯ ডিলারের জন্য প্রতি মাসে টিএসপি বরাদ্দ ১৩৫ মেট্রিক টন। সে হিসাবে গড়ে একজন ডিলারের ভাগে পড়ে প্রায় ৭ দশমিক ১৫ মেট্রিক টন।

ইশতিয়াক আহম্মেদ বলেন, ‘টিএসপির চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। বিঘাপ্রতি যেখানে ৬ থেকে ৭ কেজি টিএসপি প্রয়োজন, সেখানে কৃষক ১৫ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত নিতে আসেন। তিন-চার গুণ বেশি সার চাইলে আমরা কীভাবে দেব? বেশি দিলে নিয়ম ভাঙার অভিযোগ, আবার কম দিলে কৃষকের অভিযোগ।’

তবে কৃষকদের দাবি, শুধু অ্যাপে দেওয়া সুপারিশের ভিত্তিতে সব জমির সারের চাহিদা নির্ধারণ করা ঠিক নয়। জমির ধরন, আগের ফসল, মাটির উর্বরতা এবং দীর্ঘদিনের চাষাবাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অনেক সময় অতিরিক্ত সার প্রয়োজন হয় বলে তাঁদের দাবি।

বুলাকিপুর ইউনিয়নের সোনারপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল আলিম এবং সিংড়া ইউনিয়নের বৈদর গ্রামের আনোয়ার ও আব্দুল আজিজ বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে জমি চাষ করছি। কোন জমিতে কত সার লাগে, সে বিষয়ে আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। অ্যাপে কম সার দেওয়ার সুপারিশ থাকলে প্রয়োজনের তুলনায় কম সার ব্যবহার করে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

অন্যদিকে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহার করলেই ফলন বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং অতিরিক্ত সার ব্যবহারে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ঘোড়াঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুজ্জামান বলেন, ‘এবার উপজেলায় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ হচ্ছে। ফসলের ধরন, জমির মাটির গুণাগুণ ও প্রয়োজন বিবেচনা করেই খামারি অ্যাপে সারের সুপারিশ করা হয়। কৃষকদের ওই সুপারিশ অনুযায়ী সুষম সার ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত সার ব্যবহার করে কৃষক লাভবান হওয়ার পরিবর্তে ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। ডিলারদেরও সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সার বিক্রি করতে বলা হয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, খামারি অ্যাপে সারের সুপারিশের বিষয়টি কৃষকদের কাছে আরও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো এলাকার মাটির বাস্তব অবস্থা ও অ্যাপের সুপারিশের মধ্যে পার্থক্য থাকলে তা মাঠপর্যায়ে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা দরকার।

আমন মৌসুমে কৃষকের সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও ডিলারদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, ঘোড়াঘাটে সার নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধ কেবল সরবরাহের সংকট নয়; সরকারি সুপারিশ, ডিলারদের বিক্রয়-নিয়ম এবং কৃষকের মাঠের অভিজ্ঞতার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও এর অন্যতম কারণ।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬


কৃষকদের অতিরিক্ত সারের দাবিতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ডিলাররা বিপাকে

প্রকাশের তারিখ : ২১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে আমন মৌসুমে সার বিক্রি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ডিলাররা। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ‘খামারি অ্যাপ’-এ জমির ধরন ও ফসল বিবেচনায় যে পরিমাণ সার ব্যবহারের সুপারিশ করা হচ্ছে, অনেক কৃষক তার তিন থেকে চার গুণ বেশি সার দাবি করছেন। এতে কৃষক ও ডিলারদের মধ্যে প্রায়ই বাগ্‌বিতণ্ডা ও বিরোধের সৃষ্টি হচ্ছে।

ডিলারদের দাবি, অ্যাপের সুপারিশের বাইরে অতিরিক্ত সার বিক্রি করলে সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার না দিলেও উপজেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান ও জরিমানার মুখোমুখি হওয়ার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।

উপজেলার বুলাকিপুর ইউনিয়নের সার ডিলার আহম্মদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ইশতিয়াক আহম্মেদ খান বলেন, ‘সরকারি নিয়ম মেনেই সার দিতে চাই। ডিএপি ও এমওপি নিয়ে তেমন সমস্যা নেই। তবে টিএসপি নিয়ে সবচেয়ে বেশি চাপ।’

তিনি জানান, ঘোড়াঘাট উপজেলায় সার ডিলার রয়েছেন ১৯ জন। এর মধ্যে পৌরসভায় চারজন, সিংড়া ইউনিয়নে ছয়জন, পালশায় চারজন, ঘোড়াঘাট ইউনিয়নে দুজন এবং বুলাকিপুর ইউনিয়নে তিনজন ডিলার রয়েছেন। ১৯ ডিলারের জন্য প্রতি মাসে টিএসপি বরাদ্দ ১৩৫ মেট্রিক টন। সে হিসাবে গড়ে একজন ডিলারের ভাগে পড়ে প্রায় ৭ দশমিক ১৫ মেট্রিক টন।

ইশতিয়াক আহম্মেদ বলেন, ‘টিএসপির চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। বিঘাপ্রতি যেখানে ৬ থেকে ৭ কেজি টিএসপি প্রয়োজন, সেখানে কৃষক ১৫ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত নিতে আসেন। তিন-চার গুণ বেশি সার চাইলে আমরা কীভাবে দেব? বেশি দিলে নিয়ম ভাঙার অভিযোগ, আবার কম দিলে কৃষকের অভিযোগ।’

তবে কৃষকদের দাবি, শুধু অ্যাপে দেওয়া সুপারিশের ভিত্তিতে সব জমির সারের চাহিদা নির্ধারণ করা ঠিক নয়। জমির ধরন, আগের ফসল, মাটির উর্বরতা এবং দীর্ঘদিনের চাষাবাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অনেক সময় অতিরিক্ত সার প্রয়োজন হয় বলে তাঁদের দাবি।

বুলাকিপুর ইউনিয়নের সোনারপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল আলিম এবং সিংড়া ইউনিয়নের বৈদর গ্রামের আনোয়ার ও আব্দুল আজিজ বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে জমি চাষ করছি। কোন জমিতে কত সার লাগে, সে বিষয়ে আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। অ্যাপে কম সার দেওয়ার সুপারিশ থাকলে প্রয়োজনের তুলনায় কম সার ব্যবহার করে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

অন্যদিকে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহার করলেই ফলন বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং অতিরিক্ত সার ব্যবহারে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ঘোড়াঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুজ্জামান বলেন, ‘এবার উপজেলায় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ হচ্ছে। ফসলের ধরন, জমির মাটির গুণাগুণ ও প্রয়োজন বিবেচনা করেই খামারি অ্যাপে সারের সুপারিশ করা হয়। কৃষকদের ওই সুপারিশ অনুযায়ী সুষম সার ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত সার ব্যবহার করে কৃষক লাভবান হওয়ার পরিবর্তে ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। ডিলারদেরও সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সার বিক্রি করতে বলা হয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, খামারি অ্যাপে সারের সুপারিশের বিষয়টি কৃষকদের কাছে আরও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো এলাকার মাটির বাস্তব অবস্থা ও অ্যাপের সুপারিশের মধ্যে পার্থক্য থাকলে তা মাঠপর্যায়ে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা দরকার।

আমন মৌসুমে কৃষকের সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও ডিলারদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, ঘোড়াঘাটে সার নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধ কেবল সরবরাহের সংকট নয়; সরকারি সুপারিশ, ডিলারদের বিক্রয়-নিয়ম এবং কৃষকের মাঠের অভিজ্ঞতার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও এর অন্যতম কারণ।



Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream