মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে দুর্গাপূজাকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতামূলক আয়োজন ‘শারদ সম্মাননা-২০২৬’-এ প্রতিমার সৌন্দর্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম, শ্রীমঙ্গল। দেবীমঞ্চের উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মাননা অনুষ্ঠানে প্রতিমার শৈল্পিক সৌন্দর্য ও নির্মাণশৈলীর স্বীকৃতি হিসেবে সেবাশ্রমকে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে শ্রীমঙ্গল পৌর মহসিন অডিটোরিয়ামে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ‘শারদ সম্মাননা-২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সাংস্কৃতিক সংগঠন দেবীমঞ্চ।
এবারের প্রতিযোগিতায় সেরা প্রতিমা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে স্বরলিপি সংঘ,দ্বিতীয় শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম, তৃতীয় শ্রীশ্রী শ্রীমঙ্গলেশ্বরী কালীবাড়ি,চতুর্থ দক্ষিণ রুপশপুর পূজা উদযাপন পরিষদ এবং পঞ্চম স্থান অর্জন করে পূর্বাশা সার্বজনীন দুর্গাবাড়ী।
অন্যদিকে,সেরা পূজামণ্ডপ বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে সবুজবাগ সার্বজনীন দুর্গাপূজা উদযাপন পরিষদ। দ্বিতীয় হয় সবুজবাগ যুব দুর্গাপূজা উদযাপন পরিষদ, তৃতীয় লালবাগ সার্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাবাড়ী, চতুর্থ আদর্শ শ্রীমঙ্গল পূজা উদযাপন পরিষদ এবং পঞ্চম স্থান অর্জন করে দক্ষিণ ভাড়াউড়া পূজা উদযাপন পরিষদ (২ নম্বর পুল)।
অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করেন বিশ্বরঙের স্বত্বাধিকারী,খ্যাতিমান ফ্যাশন ডিজাইনার ও সংগীতশিল্পী বিপ্লব সাহা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিভাগের সাবেক পরিচালক ডা. সত্যকাম চক্রবর্ত্তী এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক সরফরাজ আহমেদ শরফু। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী এসকে দাশ সুমন। উপস্থিত ছিলেন দেবীমঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার রুপম আচার্য্য। স্বাগত বক্তব্য দেন অনুষ্ঠানের পরিচালক ও প্রধান সমন্বয়ক সুচিত্রা দেব সুচি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন অনিতা দেব।
উদ্বোধনী বক্তব্যে বিপ্লব সাহা বলেন, দুর্গাপূজা বাঙালির শিল্প,সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার এক অনন্য প্রকাশ। প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে মণ্ডপসজ্জা পর্যন্ত প্রতিটি কাজের সঙ্গে শিল্পী ও কারিগরদের মেধা,শ্রম ও ভালোবাসা জড়িয়ে থাকে। এ ধরনের আয়োজন তাঁদের সৃজনশীল কাজকে মূল্যায়ন ও উৎসাহিত করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী করে তুলবে।
বিসিবি পরিচালক সরফরাজ আহমেদ শরফু তাঁর বক্তব্যে বলেন,শারদীয় দুর্গোৎসব আনন্দ,সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা বহন করে। উৎসবকে কেন্দ্র করে এমন প্রতিযোগিতামূলক আয়োজন বিভিন্ন পূজামণ্ডপের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা ও সৃজনশীলতার পরিবেশ তৈরি করবে। শ্রীমঙ্গলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এ উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সভাপতির বক্তব্যে এসকে দাশ সুমন বলেন,প্রতিমা ও মণ্ডপের সৌন্দর্য কেবল বাহ্যিক সাজসজ্জার বিষয় নয়,এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিল্পীদের সৃজনশীলতা, আয়োজকদের নিষ্ঠা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এ ধরনের উদ্যোগ শিল্পী ও পূজা উদযাপন পরিষদগুলোর কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যকে আরও সুদৃঢ় করবে।
অনুষ্ঠানে পুরস্কার বিতরণের পাশাপাশি ছিল সংগীতানুষ্ঠান,নৃত্য পরিবেশনা ও ধর্মীয় ফ্যাশন শো। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে অডিটোরিয়ামটি দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে।
শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমের পক্ষ থেকে জানানো হয়,প্রতিমা সৌন্দর্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন তাদের কাছে শুধু একটি পুরস্কার নয়,বরং সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সৃজনশীলতা, নিষ্ঠা,ভক্তি ও আন্তরিকতার মূল্যবান স্বীকৃতি। এ অর্জনের পেছনে সেবাশ্রমের সদস্যদের নিরলস পরিশ্রম,পারস্পরিক সহযোগিতা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভালোবাসা ও আশীর্বাদ রয়েছে। যাঁদের শ্রম, সময় ও নিষ্ঠায় এবারের আয়োজন সুন্দর ও সার্থক হয়েছে,তাঁদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সেবাশ্রমের সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকেরা।
তাঁরা আরও জানান,পুরস্কার অর্জনই কোনো আয়োজনের চূড়ান্ত সার্থকতা নয়। ধর্মীয় চেতনা,ভক্তি,সম্প্রীতি ও মানবসেবার আদর্শ ধারণ করে কাজ করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। মা দুর্গার কৃপায় এ অর্জন আগামী দিনের ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে আরও অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন।
দেবীমঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার রুপম আচার্য্য শনিবার (৩১ অক্টোবর) জানান, ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দেবীমঞ্চের যাত্রা শুরু হয়। শুরু থেকেই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের পাশে থাকা এবং ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সংগঠনটি কাজ করছে। সেই ধারাবাহিকতায় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ‘শারদ সম্মাননা-২০২৬’ আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি বলেন,দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়,এটি শিল্প, সৃজনশীলতা,নান্দনিকতা ও সম্প্রীতির অনন্য প্রকাশ। প্রতিটি দৃষ্টিনন্দন প্রতিমা ও সুন্দর পূজামণ্ডপের পেছনে অসংখ্য শিল্পী,কারিগর ও আয়োজকের শ্রম,মেধা ও ভালোবাসা রয়েছে। তাঁদের সৃজনশীল কাজের যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দেওয়াই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
রুপম আচার্য্য আরও বলেন,সবার ভালোবাসা,সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা নিয়েই দেবীমঞ্চ এগিয়ে যেতে চায়। সবার সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে আগামী বছর আরও বৃহৎ পরিসরে ‘শারদ সম্মাননা-২০২৭,সিজন টু’ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
আয়োজক সূত্রে জানা যায়,দুর্গাপূজা চলাকালে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিমার শৈল্পিক সৌন্দর্য,নির্মাণশৈলী,মণ্ডপের থিম, নান্দনিকতা ও সাজসজ্জাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিচারকার্য পরিচালনা করা হয়। বিচারকদের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে সেরা প্রতিমা ও সেরা পূজামণ্ডপ নির্বাচন করা হয়।
সিলেট বিভাগে প্রথমবারের মতো এ ধরনের প্রতিযোগিতামূলক আয়োজন করেছে দেবীমঞ্চ। তাঁদের প্রত্যাশা,এ উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রীমঙ্গলের দুর্গাপূজার শিল্প-নান্দনিকতা,সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। পাশাপাশি আগামী বছরগুলোতেও এ আয়োজন অব্যাহত থাকবে।
মতামত