হঠাৎ কেউ অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলে অনেকেই তার মুখে পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করেন। কেউ কেউ আবার মুখে পানি, শরবত বা অন্য কোনো পানীয় দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এসব কাজ বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে অচেতন ব্যক্তির মুখে পানি বা খাবার দিলে তা শ্বাসনালিতে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্ট কিংবা দম বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে প্রথমে তার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে অজ্ঞান হওয়ার সম্ভাব্য কারণ বুঝে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
কেন মানুষ অজ্ঞান হয়ে যায়?
শরীরে পানিশূন্যতা, রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়া কিংবা রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়ার কারণে মানুষ সাময়িকভাবে জ্ঞান হারাতে পারেন। অতিরিক্ত গরম, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, তীব্র মানসিক চাপ, নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ কিংবা হঠাৎ বসা বা শোয়া অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ানোর কারণেও এমনটি হতে পারে।
এ ছাড়া হৃদযন্ত্র বা স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতা, অতিরিক্ত কাশি এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও অজ্ঞান হওয়ার কারণ হতে পারে। তাই অজ্ঞান হওয়ার ঘটনাকে সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।
অজ্ঞান ব্যক্তির মুখে পানি ছিটানো কেন বিপজ্জনক?
অচেতন অবস্থায় মানুষের গিলে খাওয়ার স্বাভাবিক ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। এ সময় মুখে পানি, শরবত বা অন্য কোনো তরল ঢেলে দিলে তা খাদ্যনালির পরিবর্তে শ্বাসনালিতে প্রবেশ করতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ঘটনাকে ‘অ্যাসপিরেশন’ বলা হয়। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, শ্বাসনালি বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা ফুসফুসে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া মুখে পানি ছিটানো, থাপ্পড় দেওয়া, ঝাঁকানো কিংবা স্যান্ডেল দিয়ে আঘাত করার মাধ্যমে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা কার্যকর প্রাথমিক চিকিৎসা নয়। বরং এসব করতে গিয়ে জরুরি চিকিৎসা দিতে দেরি হতে পারে। অজ্ঞান হওয়ার পেছনে হৃদযন্ত্রের গুরুতর সমস্যা থাকলে সেই বিলম্ব প্রাণঘাতীও হতে পারে।
কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে কী করবেন?
কেউ হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
প্রথমে ব্যক্তিটি সাড়া দিচ্ছেন কি না এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন কি না, তা পরীক্ষা করুন। আশপাশের কাউকে জরুরি চিকিৎসাসেবায় ফোন করতে বলুন। ব্যক্তি শ্বাস না নিলে বা স্বাভাবিক শ্বাস না থাকলে জরুরি সহায়তা ডেকে দ্রুত সিপিআর শুরু করুন, যদি তা জানা থাকে।
ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিলে এবং মেরুদণ্ডে আঘাতের আশঙ্কা না থাকলে তাকে নিরাপদ অবস্থানে রাখুন। অচেতন অবস্থায় শ্বাস চলতে থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী একপাশে কাত করে শুইয়ে রাখা যেতে পারে, যাতে বমি বা লালা শ্বাসনালিতে প্রবেশের ঝুঁকি কমে। তবে মাথা, ঘাড় বা মেরুদণ্ডে আঘাতের আশঙ্কা থাকলে অপ্রয়োজনে নড়াচড়া করাবেন না।
গলা বা বুকের আঁটসাঁট পোশাক ঢিলে করে দিন এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে নজর রাখুন। অচেতন ব্যক্তির মুখে কোনো খাবার, পানি বা ওষুধ দেবেন না। জ্ঞান ফিরে এলেও পুরোপুরি সুস্থ বোধ করার আগে তাকে তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াতে দেবেন না।
কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?
অজ্ঞান হওয়ার পর এক মিনিটের মধ্যে স্বাভাবিক জ্ঞান ফিরে না এলে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে। এ ছাড়া পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পাওয়া, রক্তপাত, খিঁচুনি, বুকে ব্যথা, তীব্র বুক ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট কিংবা হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
ব্যায়ামের সময় বা শুয়ে থাকা অবস্থায় কেউ অজ্ঞান হয়ে পড়লেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। গর্ভবতী ব্যক্তি কিংবা আগে থেকে ডায়াবেটিস বা হৃদরোগে আক্রান্ত কারও ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন
অজ্ঞান ব্যক্তির মুখে পানি বা শরবত ঢালা, মুখে পানি ছিটানো, থাপ্পড় দেওয়া কিংবা জোরে ঝাঁকানো থেকে বিরত থাকুন। শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা না করে শুধু জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করাও ঠিক নয়। একই সঙ্গে ব্যক্তিকে একা ফেলে রাখবেন না।
অজ্ঞান হওয়ার কারণ সব সময় সাধারণ নাও হতে পারে। তাই দ্রুত পরিস্থিতি যাচাই, শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: Healthdirect, MedlinePlus, Healthwise ও The Indian Express।
মতামত