মাছ চাষের পুকুরের তলদেশের পলি ও মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা অধিকাংশ পুকুরের তলদেশের পলিতে মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ রয়েছে।
নদীর পানি, পলি ও মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে আগেও বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। এমনকি নদী ও সমুদ্রে বসবাসকারী ইলিশ মাছেও পাওয়া গেছে প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র কণা। এবার মাছ চাষের পুকুরের পলি ও মাছের নমুনায় এসব কণার অস্তিত্ব শনাক্ত করলেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, পুকুরে কীভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হচ্ছে এবং মাছের মাধ্যমে তা জলজ খাদ্যশৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ছে, তা বুঝতে এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গবেষকদের দাবি, বাংলাদেশের মিঠাপানিতে মাছ চাষের পুকুরের পলি ও মাছ নিয়ে এ ধরনের সমন্বিত গবেষণা প্রথমবারের মতো করা হয়েছে।
ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় পরিচালিত এই গবেষণায় পরীক্ষার আওতায় থাকা সব পুকুরের পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। মাছের নমুনাতেও মিলেছে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা। গবেষণার এই ফলাফল মাছের উৎপাদন, পরিবেশের ভারসাম্য ও জনস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাছ চাষ করা হলেও কীভাবে এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পুকুরে প্রবেশ করছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
গবেষণাটির শিরোনাম ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার: এভিডেন্স অব সেডিমেন্ট–ফিশ ট্রান্সফার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটেড ইকোলজিক্যাল রিস্ক ইন বাংলাদেশ’। চলতি মাসে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।
ত্রিশালের ২৫টি পুকুরে গবেষণা
গবেষণার মাঠপর্যায়ের কাজ হয়েছে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায়। এলাকাটি মিঠাপানির মাছ চাষের অন্যতম অঞ্চল। সেখানে বাণিজ্যিকভাবে মাছ উৎপাদনের জন্য নিবিড় ও আধা নিবিড় পদ্ধতিতে চাষ করা হয়। গবেষকেরা শীতকালে নির্বাচিত ২৫টি মাছ চাষের খামার থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক বদিউজ্জামান খান এ গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। তিনি বলেন, মিঠাপানির চাষের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে এ ধরনের গবেষণা এই প্রথম। এটি দেশের মৎস্যসম্পদের সম্ভাব্য ক্ষতি নিরূপণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল মাছ চাষের পুকুরের তলদেশের পলি ও মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করা। পাশাপাশি মাছের দেহের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের সম্পর্ক, প্লাস্টিকের রাসায়নিক গঠন এবং সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন।
মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে সাধারণত পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে বোঝায়। প্লাস্টিকের ব্যাগ, মোড়ক, দড়ি, মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য প্লাস্টিকসামগ্রী ভেঙে এসব ক্ষুদ্র কণা তৈরি হতে পারে। বিভিন্ন বর্জ্য ও প্লাস্টিক পণ্য থেকেও কণা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
পুকুরের পলিতে কী পাওয়া গেল
গবেষণায় পুকুরের তলদেশের পলিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ১১ দশমিক ০৪টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। পলিতে দূষণের মাত্রা মূল্যায়নে ব্যবহৃত পলিউশন লোড ইনডেক্স বা দূষণভার সূচকের মান ছিল ১ থেকে ৪ দশমিক ৫। এ সূচকের ভিত্তিতে অধিকাংশ নমুনা সংগ্রহস্থলকে মাঝারি থেকে উচ্চ দূষণযুক্ত হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন গবেষকেরা।
পুকুরের তলদেশের পলি মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হতে পারে। প্রবহমান নদীর তুলনায় মাছ চাষের পুকুরে পানির বিনিময় সীমিত হলে তলদেশে বিভিন্ন কণা দীর্ঘ সময় জমে থাকার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তলদেশে খাবার খোঁজা মাছ এবং পলির সংস্পর্শে থাকা অন্যান্য জলজ প্রাণীর ক্ষেত্রে তাই এসব কণার সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া মানেই সব মাছ একই মাত্রায় দূষিত, এমন নয়। মাছের প্রজাতি, খাদ্য গ্রহণের ধরন, বসবাসের স্তর এবং পুকুরের পরিবেশের ওপর কণা গ্রহণের মাত্রা নির্ভর করতে পারে।
ছয় প্রজাতির ১৫০টি মাছ পরীক্ষা
গবেষকেরা ছয় প্রজাতির মোট ১৫০টি চাষের মাছ পরীক্ষা করেছেন। এসব মাছের নমুনায় মোট ৯০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। প্রতিটি মাছে গড় কণার সংখ্যা ছিল শূন্য দশমিক ৬০।
প্রজাতিভেদে কণা গ্রহণের পার্থক্য ছিল উল্লেখযোগ্য। সরপুঁটি মাছের ক্ষেত্রে প্রতিটি মাছে গড়ে ১ দশমিক ২০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। রুই ও মৃগেলের ক্ষেত্রে এ গড় ছিল শূন্য দশমিক ৬৮।
অন্যদিকে কাতলা, কমন কার্প ও পাঙাশ মাছের নমুনায় তুলনামূলক কম কণা পাওয়া গেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মাছের বসবাসের স্তর বিবেচনায় তলদেশে বসবাসকারী মাছের মধ্যে মোট শনাক্ত কণার ৫২ শতাংশ পাওয়া গেছে। তলদেশ ও পানির মধ্যবর্তী স্তরে চলাচলকারী মাছের ক্ষেত্রে এ হার ৩৫ শতাংশ এবং পানির উপরিভাগের কাছাকাছি বসবাসকারী মাছের ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ।
গবেষক অধ্যাপক বদিউজ্জামান খান বলেন, ‘মাছকে প্রচুর ফিড খাওয়ানো হয়। সব ফিড যে খারাপ, তা বলছি না। তবে কিছু ফিডে এসব থাকে। অনেক সময় বন্যার পানিতে অন্য স্থানের মাইক্রোপ্লাস্টিক পুকুরে চলে আসে। মাছের পরিপাকতন্ত্রে আমরা মূলত এর উপস্থিতি দেখেছি।’
গবেষণায় পলিথিন (পিই) ও পলিপ্রপিলিন (পিপি) প্রধান মাইক্রোপ্লাস্টিক পলিমার হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। পলিথিন সাধারণত প্লাস্টিকের ব্যাগ, মোড়ক ও প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত হয়। পলিপ্রপিলিন ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন পাত্র, প্যাকেজিং, দড়ি ও অন্যান্য প্লাস্টিক পণ্যে।
গবেষকেরা এসব পলিমারের উপস্থিতিকে মাছ চাষের কার্যক্রম ও গৃহস্থালি ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাব্য উৎসের ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মাছের খাদ্য, খাবারের বস্তা ও মোড়ক, মাছ ধরার সরঞ্জাম, পানি সরবরাহের পাইপ এবং আশপাশের গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা পুকুরে প্রবেশ করতে পারে। তবে গবেষণায় পাওয়া পলিমারের ধরন থেকে নির্দিষ্ট কোনো উৎসকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। উৎস নিশ্চিত করতে এসব উপকরণ ও পুকুরে প্রবেশ করা পানির পৃথক নমুনা বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
ত্রিশাল মাছ চাষের একটি বড় ক্ষেত্র। এ উপজেলায় ২২ হাজার পুকুরে মাছ চাষ করা হয় বলে উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্র জানায়। প্রতিবছর এ উপজেলায় ৭২ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। তবে এই মাছ চাষে যে দূষণের ঘটনা ঘটছে, তা জানালেন জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহানা নাজনীন। তিনি বলেন, ‘মাছের পুকুরের পাড়ে পোলট্রির জন্য মাছ চাষে দূষণের ঘটনা ঘটতে পারে। এ নিয়ে আমরা ইতিমধ্যে অভিযান শুরু করেছি। ইতিমধ্যে একটি পুকুরের পাশ থেকে মুরগির খামার তুলে দেওয়া হয়েছে।’
গবেষণাটি ত্রিশালের ২৫টি পুকুরে সীমিত। ফলে এর ফলাফল দিয়ে দেশের সব মাছ চাষের পুকুরের দূষণের মাত্রা নির্ধারণ করা যাবে না।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সহযোগী বিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্যবিদ মাহবুবুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে কাজ করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। এটা কোথায় ফেলা হবে, এর কোনো সঠিক জায়গা নেই। প্রক্রিয়াজাত প্রায় হচ্ছেই না। মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আমরা দেখেছি। মাছ থেকে তাই এটি মানুষের শরীরে পৌঁছাবে না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব কী
মাছে পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবস্বাস্থ্যে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মাছ ভাজা বা রান্নার সময় উচ্চ তাপমাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক নষ্ট হয়ে যায় কি না, এমন প্রশ্নও আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিমুল হালদার প্রথম আলোকে বলেন, পলিথিন অসংখ্য অণুর সমন্বয়ে গঠিত। তাই রান্নার তাপেও এটি সহজে নষ্ট হয় না। মাছের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক
মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাঁর মতে, এসব কণা যকৃত ও কিডনির কার্যক্রমে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
মাছ চাষের পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়া উদ্বেগের বিষয়, এ কথা উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, তবে দূষণের মাত্রা, মাছের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
মতামত