সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM

আমেরিকায় ‘নো কিংস’ আন্দোলন: রাজতন্ত্রের ছায়া ও প্রজাতন্ত্রের আত্মরক্ষা



আমেরিকায় ‘নো কিংস’ আন্দোলন: রাজতন্ত্রের ছায়া ও প্রজাতন্ত্রের আত্মরক্ষা
আমেরিকায় ‘নো কিংস’ আন্দোলন: রাজতন্ত্রের ছায়া ও প্রজাতন্ত্রের আত্মরক্ষা

১৭৭৬ সালে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের শৃঙ্খল ভেঙে জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। জর্জ ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন, এই নতুন ভূখণ্ডে ক্ষমতার উৎস হবেন জনগণ—কোনো একক রাজা বা একনায়ক নয়। কিন্তু প্রায় আড়াইশ বছর পর, একবিংশ শতাব্দীর মার্কিন রাজনীতির উত্তাল ময়দানে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষকে ‘নো কিংস’ বা ‘কোনো রাজা নয়’ ব্যানারে রাজপথে নামতে হয়, তখন বুঝতে হবে আমেরিকান গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিমূলে এক গভীর সংকট তৈরি হয়েছে।

‘নো কিংস’ আন্দোলনের মূল ভিত্তি নিহিত রয়েছে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন এবং মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বিতর্কিত ‘প্রেসিডেন্সিয়াল অনাক্রম্যতা’ বিষয়ক রায়ের বিরুদ্ধে। আদালতের ওই ঐতিহাসিক রায়ে বলা হয়, দায়িত্বে থাকাকালে রাষ্ট্রপতির করা "অফিসিয়াল কাজের" জন্য তাকে ফৌজদারি বিচার থেকে অনাক্রম্যতা বা দায়মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। আমেরিকানদের বড় একটি অংশ এটিকে দেখছেন ডেমোক্রেসির মূল দর্শন—"আইনের চোখে সবাই সমান"—এর ওপর এক নির্মম আঘাত হিসেবে। যে দেশে কোনো প্রেসিডেন্টই আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না, সেখানে আদালতই যেন এক আধুনিক 'রাজকীয় অধিকার' বা 'আবসোলিউট পাওয়ার'-এর স্বীকৃতি দিয়ে দিল।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতার স্বৈরাচারী চর্চা—যেমন বিচারে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, অভিবাসন নীতিতে চরম কঠোরতা, বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণ এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার প্রবণতা—জনগণকে গভীরভাবে শঙ্কিত করেছে। এর প্রতিক্রিয়াতেই ওয়াশিংটন ডিসি থেকে শুরু করে ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস কিংবা নিউ ইয়র্কের রাজপথে লক্ষ লক্ষ মানুষ গর্জে উঠেছেন। আন্দোলনকারীদের বার্তা একটাই: "আমেরিকা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে, কোনো রাজা নয়"।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে 'নো কিংস অ্যাক্ট' বিল উত্থাপনের উদ্যোগ এবং রাজপথের গণবিক্ষোভ প্রমাণ করে, নাগরিক সমাজ তাদের সাংবিধানিক অ অধিকার রক্ষায় জাগ্রত। মার্কিন সংবিধান তৈরিই হয়েছিল 'চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স' বা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য। যখন বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগ সেই ভারসাম্য নষ্ট করে ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করতে চায়, তখন সার্বভৌম জনগণকেই শেষ রক্ষাকবচ হিসেবে দাঁড়াতে হয়।

তবে কেবল রাজপথে স্লোগান দেওয়া কিংবা ট্রাম্পবিরোধী ক্ষোভ প্রকাশ করাই এই আন্দোলনের শেষ কথা হতে পারে না। ট্রাম্প কেবল একটি চরিত্র; আসল সংকট লুকিয়ে আছে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা তাকে এই সীমাহীন ক্ষমতা চর্চার সুযোগ করে দিচ্ছে তার মধ্যে। 'নো কিংস' আন্দোলনকে যদি কেবল দলীয় রাজনীতি বা ব্যক্তি-বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে এর মূল চেতনা ব্যাহত হবে। এটিকে রূপ দিতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক সংস্কারের এক দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে।

ইতিহাসের শিক্ষা হলো—গণতন্ত্র কোনো স্থায়ী উপহার নয়, এটি রক্ষা করতে হলে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। 'নো কিংস' আন্দোলন মার্কিন শাসকশ্রেণী ও বিশ্ব রাজনীতিকে এই চিরন্তন সত্যটিই মনে করিয়ে দিচ্ছে: সংবিধানের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, এবং ব্যালট ও রাজপথের শক্তিতেই শেষ পর্যন্ত প্রজার জয় হয়, কোনো ‘রাজার’ নয়।

লেখক

এ এইচ শুভ

সাংবাদিক, সিএনবিসি

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬


আমেরিকায় ‘নো কিংস’ আন্দোলন: রাজতন্ত্রের ছায়া ও প্রজাতন্ত্রের আত্মরক্ষা

প্রকাশের তারিখ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

১৭৭৬ সালে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের শৃঙ্খল ভেঙে জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। জর্জ ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন, এই নতুন ভূখণ্ডে ক্ষমতার উৎস হবেন জনগণ—কোনো একক রাজা বা একনায়ক নয়। কিন্তু প্রায় আড়াইশ বছর পর, একবিংশ শতাব্দীর মার্কিন রাজনীতির উত্তাল ময়দানে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষকে ‘নো কিংস’ বা ‘কোনো রাজা নয়’ ব্যানারে রাজপথে নামতে হয়, তখন বুঝতে হবে আমেরিকান গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিমূলে এক গভীর সংকট তৈরি হয়েছে।

‘নো কিংস’ আন্দোলনের মূল ভিত্তি নিহিত রয়েছে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন এবং মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বিতর্কিত ‘প্রেসিডেন্সিয়াল অনাক্রম্যতা’ বিষয়ক রায়ের বিরুদ্ধে। আদালতের ওই ঐতিহাসিক রায়ে বলা হয়, দায়িত্বে থাকাকালে রাষ্ট্রপতির করা "অফিসিয়াল কাজের" জন্য তাকে ফৌজদারি বিচার থেকে অনাক্রম্যতা বা দায়মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। আমেরিকানদের বড় একটি অংশ এটিকে দেখছেন ডেমোক্রেসির মূল দর্শন—"আইনের চোখে সবাই সমান"—এর ওপর এক নির্মম আঘাত হিসেবে। যে দেশে কোনো প্রেসিডেন্টই আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না, সেখানে আদালতই যেন এক আধুনিক 'রাজকীয় অধিকার' বা 'আবসোলিউট পাওয়ার'-এর স্বীকৃতি দিয়ে দিল।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতার স্বৈরাচারী চর্চা—যেমন বিচারে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, অভিবাসন নীতিতে চরম কঠোরতা, বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণ এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার প্রবণতা—জনগণকে গভীরভাবে শঙ্কিত করেছে। এর প্রতিক্রিয়াতেই ওয়াশিংটন ডিসি থেকে শুরু করে ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস কিংবা নিউ ইয়র্কের রাজপথে লক্ষ লক্ষ মানুষ গর্জে উঠেছেন। আন্দোলনকারীদের বার্তা একটাই: "আমেরিকা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে, কোনো রাজা নয়"।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে 'নো কিংস অ্যাক্ট' বিল উত্থাপনের উদ্যোগ এবং রাজপথের গণবিক্ষোভ প্রমাণ করে, নাগরিক সমাজ তাদের সাংবিধানিক অ অধিকার রক্ষায় জাগ্রত। মার্কিন সংবিধান তৈরিই হয়েছিল 'চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স' বা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য। যখন বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগ সেই ভারসাম্য নষ্ট করে ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করতে চায়, তখন সার্বভৌম জনগণকেই শেষ রক্ষাকবচ হিসেবে দাঁড়াতে হয়।

তবে কেবল রাজপথে স্লোগান দেওয়া কিংবা ট্রাম্পবিরোধী ক্ষোভ প্রকাশ করাই এই আন্দোলনের শেষ কথা হতে পারে না। ট্রাম্প কেবল একটি চরিত্র; আসল সংকট লুকিয়ে আছে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা তাকে এই সীমাহীন ক্ষমতা চর্চার সুযোগ করে দিচ্ছে তার মধ্যে। 'নো কিংস' আন্দোলনকে যদি কেবল দলীয় রাজনীতি বা ব্যক্তি-বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে এর মূল চেতনা ব্যাহত হবে। এটিকে রূপ দিতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক সংস্কারের এক দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে।

ইতিহাসের শিক্ষা হলো—গণতন্ত্র কোনো স্থায়ী উপহার নয়, এটি রক্ষা করতে হলে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। 'নো কিংস' আন্দোলন মার্কিন শাসকশ্রেণী ও বিশ্ব রাজনীতিকে এই চিরন্তন সত্যটিই মনে করিয়ে দিচ্ছে: সংবিধানের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, এবং ব্যালট ও রাজপথের শক্তিতেই শেষ পর্যন্ত প্রজার জয় হয়, কোনো ‘রাজার’ নয়।

লেখক

এ এইচ শুভ

সাংবাদিক, সিএনবিসি



Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream