দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চাপে পড়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। আয় সামান্য বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহণ ও বাসাভাড়ার খরচ বেড়েছে অনেক বেশি। ফলে অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ঋণ করে সংসার চালাতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির হিসাবে, গত চার বছরে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ বেড়েছে। শুধু গত এক বছরেই নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন।
বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, বর্তমানে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে থাকা প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশিও ভবিষ্যতে দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাদের অবস্থার অবনতি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে দেশের জন্য বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
দারিদ্র্য কমার ধারায় ছেদ
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল অত্যন্ত দুর্বল। সত্তরের দশকে দেশের দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের ফলে কয়েক দশকে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার একসময় কমে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে। ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে এ হার আরও কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সময়ে অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
দারিদ্র্য কমানোর এই অগ্রগতির কারণে ২০২০ সালে বাংলাদেশকে দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে একটি বৈশ্বিক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল বিশ্বব্যাংক। তখন ২০৩১ সালের মধ্যে দেশ পুরোপুরি দারিদ্র্যমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই প্রবণতায় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশে অতি দারিদ্র্যের হার বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। মোট দারিদ্র্যের হারও বেড়ে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ হিসাবে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৫০ লাখের বেশি।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে দুর্বলতা
দারিদ্র্য বাড়ার পেছনে অর্থনীতির মন্থর গতি বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দুর্বল অবস্থাকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
করোনা মহামারির সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করে। মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পরও অনেক মানুষ আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে ফিরতে পারেননি বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন।
তার মতে, পরবর্তীতে বিনিয়োগ বাড়ার মাধ্যমে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা থাকলেও তা যথেষ্ট মাত্রায় হয়নি। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতসহ অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থপাচারের মতো ঘটনাও পরিস্থিতিকে দুর্বল করেছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এর প্রভাব বিনিয়োগের ওপরও পড়েছে।
এর সঙ্গে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হয়েছে। ফলে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান কমার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ
টানা চার বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। করোনা মহামারির সময় অনেকের আয় কমে যাওয়ার পরও নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও ৮ দশমিক ৩ শতাংশে রয়েছে, যা এখনো উচ্চ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাবও পড়েছে মানুষের দৈনন্দিন খরচে। অনেক পরিবার সংসার চালাতে পুরোনো সঞ্চয় ব্যবহার করছে। কেউ কেউ সম্পদ বিক্রি করেও ব্যয় মেটানোর চেষ্টা করছেন।
আয় ও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান বাড়ার কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের একটি অংশ ধীরে ধীরে দারিদ্র্যের দিকে চলে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
দুর্বল করব্যবস্থা
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের করব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। কর পরিশোধের প্রবণতা কম এবং কর প্রশাসনে দুর্বলতার কারণে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই।
সংস্থাটি করনীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনের মধ্যে স্পষ্ট পৃথকীকরণ, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে কর ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল করা, করদাতাদের সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি এবং কর পরিপালন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভর্তুকির সুবিধা কারা পাচ্ছে?
দরিদ্র মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও বিভিন্ন ভর্তুকি থাকলেও এর বড় অংশ প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির হিসাবে, দেশের প্রায় ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ প্রধান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছেন। যারা সুবিধা পাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রেও ধনী শ্রেণির তুলনায় সহায়তার পরিমাণ কম।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ বছরে গড়ে ৭ হাজার ১৪০ টাকা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পান। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এ সুবিধার পরিমাণ ১০ হাজার ৪৭২ টাকা।
বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈষম্য রয়েছে। বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করায় সমাজের উচ্চ আয়ের মানুষ ভর্তুকির বড় অংশ পাচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশের সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের জন্য বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যয় হয়।
অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, সবার জন্য একইভাবে ভর্তুকি দেওয়ার পরিবর্তে প্রকৃত দরিদ্রদের লক্ষ্য করে সামাজিক সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।
ফ্যামিলি কার্ডে সম্ভাবনা
বিশ্বব্যাংক মনে করছে, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি দারিদ্র্য কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মার মতে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা দেওয়া হলে বছরে প্রায় ১৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারেন। তবে প্রকৃত দরিদ্রদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করে কার্ড দেওয়া সম্ভব হলে বছরে প্রায় সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন।
সরকারের বক্তব্য
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের বেশ কিছু কারণ আগের সরকারগুলোর সময় থেকেই তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দুর্বলতা রয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার কথাও সরকার উল্লেখ করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, এসব সমস্যার অনেকগুলোই বহিরাগত কারণ কিংবা পূর্ববর্তী সময়ের উত্তরাধিকার।
তার ভাষ্য, সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। বিশ্বব্যাংকের সংস্কারসংক্রান্ত পরামর্শগুলোও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
মতামত