সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চরম তারল্য সংকট এবং একীভূতকরণের (Merger) আলোচনার কারণে পুরো আর্থিক খাতেই এক ধরনের অনাস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের অভাব: দেশের পুঁজিবাজারের বড় চালিকাশক্তি হলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তারল্য সংকট থাকায় তারা বাজারে কোনো সাপোর্ট বা নতুন বিনিয়োগ করতে পারছে না।
বিনিয়োগকারীদের মনস্তাত্ত্বিক ভয়: আর্থিক খাতের ভিত্তি নড়বড়ে দেখলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজি রক্ষায় প্যানিক সেল (Panic Sell) শুরু করেন, যার ফলে বাজারের সূচক টানা নিম্নমুখী থাকে।
গত ১৭ বছর বাংলাদেশের শেয়ার বাজার উন্নতি না হওয়ার মূল কারণ
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বছরের পর বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে থাকার প্রধানতম কারণগুলো হলো:
ফ্লোর প্রাইসের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব: কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম ধরে রাখার (Floor Price) নীতির কারণে দীর্ঘদিন বাজারে স্বাভাবিক লেনদেন ব্যাহত হয়েছে এবং বিদেশী ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
আইপিও (IPO) ও দুর্বল কোম্পানির দাপট: ভালো ও লাভজনক বহুজাতিক বা বড় দেশীয় কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনা সম্ভব হয়নি। উল্টো কারসাজিপূর্ণ আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেওয়া দুর্বল কোম্পানিকে প্রিমিয়ামসহ আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
ইনস্ট্রুমেন্টের অভাব (Lack of Product Diversity): ১৭ বছর ধরে বাজার কেবল ইকুইটি/শেয়ার-নির্ভর রয়ে গেছে। উন্নত বন্ড মার্কেট, মিউচুয়াল ফান্ড, ডেরিভেটিভস কিংবা ইটিএফ (ETF) গড়ে না ওঠায় সাধারণ বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি কমানোর সুযোগ ছিল না।
ইনসাইডার ট্রেডিং ও শাস্তির অভাব: কারসাজির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রগুলোকে বড় ধরনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বা আর্থিক জরিমানা আদায় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধারাবাহিকতার অভাব: বারবার নীতি পরিবর্তন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার (BSEC) মধ্যকার সমন্বয়হীনতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করেছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জরুরি করণীয়
পুঁজিবাজারে বিগত দেড় দশকের সঞ্চিত ক্ষত দূর করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অবিলম্বে কিছু নীতিগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে:
বিশেষ তদন্ত কমিটি ও ট্রাইব্যুনাল গঠন: গত ১৭ বছরে যারা ফ্লোর প্রাইস, প্লেসমেন্ট শেয়ার এবং ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীর পুঁজি হাতিয়ে নিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
'টার্নঅ্যারাউন্ড ফান্ড' ও ডেট-টু-ইকুইটি সোয়াপ: দেউলিয়া না করে সম্ভাবনাময় বন্ধ কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে ব্যাংকের অকার্যকর ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর (Debt-to-Equity Swap) করার আইনি অবকাঠামো তৈরি করতে হবে।
বহুজাতিক ও লাভজনক সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্তকরণ: বাজারে মানসম্পন্ন শেয়ারের জোগান বাড়াতে ভালো পারফর্ম করা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান (যেমন: গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের লাভজনক কোম্পানি) এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার জন্য নীতিগত বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে।
বিএসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয় সেল: পুঁজিবাজার ও ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দূর করে সুনির্দিষ্ট নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে, যেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে আশ্বস্ত হন।
উপসংহার
বিএসইসির চেয়ারম্যানের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক নীতিগত যৌক্তিকতা থাকলেও, শুধুমাত্র লেনদেন বন্ধ বা তালিকাচ্যুত করাই বাজারের সমাধান নয়। যেসব নিষ্ক্রিয় কোম্পানির বিশাল সম্পদ রয়েছে, সেগুলোকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় নতুন ব্যবস্থাপনা ও বোর্ডের অধীনে এনে চালু করার কার্যকর রূপরেখা থাকা প্রয়োজন—যাতে বাজারের গভীরতা (Market Depth) বৃদ্ধি পায় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসে।
মতামত