ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতা বিপ্লবের মাধ্যমে যখন জিয়াউর রহমান দেশের হাল ধরেন এবং পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের ২১ই এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সংকটময়। সেখান থেকে শক্ত হাতে তিনি একটি অরাজক দেশকে সুশৃঙ্খল, সম্মানজনক ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্রে রূপান্তর করেছিলেন।
১৯৮১ সালের কথা। জীবন ও জীবিকার তাগিদে আমি দুবাই চলে যাই। প্রবাসে অবস্থান করলেও সবসময় দেশের খবর রাখতাম। তিনি ক্ষমতায় আসার পর আমরা দেখেছি—কীভাবে দ্রুত তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিলেন।
তাঁর শাসনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল অপরাধের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' ও শক্ত প্রশাসনিক শৃঙ্খলা। অপরাধী, বখাটে কিংবা আইন ভঙ্গকারীদের বিষয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল এক চুল ছাড় না দেওয়া নীতিতে কঠোর। গভীর রাতেও সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে রাস্তায় চলাফেরা করতে পারত। তিনি কথার চেয়ে কাজের শক্তিতে বেশি বিশ্বাসী ছিলেন। কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়—খাল কাটা কর্মসূচি, কৃষি বিপ্লব, প্রবাসী শ্রমবাজারের দ্বার উন্মোচন এবং তৈরি পোশাক শিল্পের ভিত্তি স্থাপনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশকে স্বনির্ভরতার সঠিক পথ দেখিয়েছিলেন।
কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক মর্মান্তিক ও দেশবিরোধী চক্রান্তের মাধ্যমে কতিপয় বিদ্রোহী সেনাসদস্য তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেই রক্তঝরা সংবাদের পর সমগ্র বাংলাদেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। দল-মত নির্বিশেষে দেশের কোটি কোটি মানুষ সেদিন চোখের জলে ভেসেছিল। ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর জানাজায় মানুষের যে বিপুল জনসমুদ্র নেমেছিল, তা জাতীয় ইতিহাসে বিরল।
আজকে যখন প্রবাসে বসে দেশের পরিস্থিতি দেখি, সত্যি ভীষণ অবাক ও মর্মাহত হই। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জায়গায় যা ঘটছে—হাসপাতালে প্রকাশ্য হামলা ও ভাঙচুর চালানো, কিংবা 'মব' সৃষ্টি করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তার জন্য দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু হাসপাতাল বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করা হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জায়গাটি কোথায় থাকে?
এভাবে চলতে থাকলে দেশের আনাচে-কানাচে যে যার মতো আইন হাতে তুলে নেবে। এটি আর যা-ই হোক, কখনোই গণতন্ত্র হতে পারে না; এটি অবাধ বিশৃঙ্খলা ও 'মব-রুল'।
একটি দেশকে সঠিক পথে রাখতে এবং জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যে কঠোর অনুশাসন, দূরদর্শী নেতৃত্ব ও আইনি শাসন দরকার—প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তা বাস্তব কাজের মাধ্যমেই প্রমাণ করে গেছেন। সেই কারণেই যুগ পার হয়ে গেলেও একজন সৎ, দূরদর্শী ও শক্ত হাতের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মানুষ আজও তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করে।
মতামত