কোটাবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও জাতীয় সংসদ সচিবালয়জুড়ে জেঁকে বসেছে অনিয়ম, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের ক্যাডার পুনর্বাসনের মারাত্মক অভিযোগ। এই পুরো সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মো. আকবর হোসেন সবুজ। নিজ গ্রেড লঙ্ঘন করে প্রভাব খাটিয়ে অতিরিক্ত সচিবদের জন্য নির্ধারিত ডুপ্লেক্স বাসা দখল, নিষিদ্ধ সংগঠনের ক্যাডারদের প্রশ্রয় এবং কেনাকাটায় অবিশ্বাস্য লুটপাটের মাধ্যমে তিনি সংসদ সচিবালয়কে বিতর্কিত করে তুলেছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এপিএস সবুজের পরিবার ও রাজনৈতিক বলয় সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত। তার দুই ভাই—সুমন যুবলীগের ক্যাডার এবং রায়হান ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। বিগত দিনে ভোলার সাবেক সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের পক্ষে আয়োজিত দলীয় কর্মসূচিতে মাথায় ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ খচিত ফিতা বেঁধে মিছিলে অংশ নেন রায়হান। এছাড়া উপজেলা ছাত্রলীগ কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবির নিচে দাঁড়িয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে মিষ্টিমুখ করা এবং যুবলীগ নেতৃত্বের সাথে ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যের স্থিরচিত্র প্রকাশ্যে এসেছে।
অভিযোগ উঠেছে, গণঅভ্যুত্থানের পরও এসব চিহ্নিত ক্যাডাররা অবাধে সংসদ ভবনে যাতায়াত করছে এবং কর্মকর্তাদের নিয়ে ভেতরের গোপন বৈঠকসহ নানা অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, বিগত সরকারের আমলে জাতীয় সংসদ সচিবালয় ড্রাইভার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত সাবেক স্পিকারের গাড়িচালক জাকিরকে বর্তমান স্পিকারের চালক হিসেবে পুনর্বাসন করেছেন সবুজ। এর ফলে স্পিকারসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ও সংসদ সচিবালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও সবুজের ক্ষমতার অপব্যবহার চরমে পৌঁছেছে। সংসদ সচিবালয় এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিধিমালা অনুযায়ী এপিএস সবুজ ‘ডি-১’ (D-1) গ্রেডের ফ্ল্যাট পাওয়ার প্রাধিকারভুক্ত হলেও চাপ প্রয়োগ করে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত শেরেবাংলা নগরের সুপিরিয়র টাইপ এইচ, সি-১৩ নম্বর ফ্ল্যাটটি বাগিয়ে নিয়েছেন। চলতি বছরের ১১ এপ্রিল সংসদ সচিবালয়ের এস্টেট শাখা থেকে জারি করা বরাদ্দপত্রে স্পষ্ট দেখা যায়, বাসাটি ‘মাননীয় স্পিকারের কোটায়’ বরাদ্দ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। কোটায় পাওয়া ও রাজকীয় সাজে সাজানো এই ডুপ্লেক্স বাসায় বর্তমানে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবাধ আনাগোনা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সংসদ সচিবালয়ে সবুজ তৈরি করেছেন ভয়াবহ দুর্নীতির সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের কাছে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। গাড়ির তেল চুরির টাকা থেকে শুরু করে এমন কোনো দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নেই, যা তারা করে না।
এছাড়া সবুজের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে ভোলাতেও; লালমোহনে খালের ১ কোটি ৭ লাখ টাকার প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করে ভুয়া বিলে অর্থ আত্মসাৎ এবং পৌরসভার ২ কোটি টাকার বিশেষ কাজ জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে তাঁর দুই ভাই। অভিযোগ রয়েছে, সংসদ সচিবালয়ের নাম ভাঙিয়ে বদলি, নিয়োগ ও পদায়নের বাণিজ্য চালিয়েও হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্পিকারের এপিএস মো. আকবর হোসেন সবুজ অনিয়মের বিষয়টি একপ্রকার স্বীকার করে বলেন, বরাদ্দকৃত বাসাটি তাদের গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য নয়, তবে স্পিকারের বিশেষ কোটায় তিনি এটি নিয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
অন্যদিকে এত অভিযোগের পরও স্পিকারের ছেলে শাহরুখ হাফিজ ফেসবুকে এপিএস সবুজের পক্ষ নেওয়ায় নানা প্রশ্ন ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, স্পিকারের সুনামের সাথে এপিএস সবুজের অবস্থান যায় না। এরপরও শাহরুখ হাফিজ ফেসবুকে সবুজের পক্ষ নেওয়ায় স্পিকারের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। স্পিকারের ক্লিন ইমেজ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।



মতামত