সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM

মৃতপ্রায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র: দখল-দূষণে হারাচ্ছে নদী, ফিরবে কি নাব্যতা?



মৃতপ্রায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র: দখল-দূষণে হারাচ্ছে নদী, ফিরবে কি নাব্যতা?

একসময় যে নদীর বুকে নৌযান চলেছে, যার তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে জনপদ, হাট-বাজার ও শিল্প-বাণিজ্যের বিস্তার সেই পুরাতন ব্রহ্মপুত্র আজ নরসিংদীর বহু এলাকায় অস্তিত্ব সংকটে।

শেখেরচর-বাবুরহাট, পাঁচদোনা, চর্ণগরদীসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীর পুরোনো প্রবাহপথ এখন কোথাও সরু জলধারা, কোথাও ময়লা-আবর্জনায় ভরা খাত, আবার কোথাও দখল ও ভরাটের কারণে প্রায় অদৃশ্য এই নদ!

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদ-নদীর তালিকায় ‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র’ উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের একটি মৌসুমি নদী হিসেবে স্বীকৃত। একই তালিকায় নরসিংদী-মুন্সিগঞ্জ অংশের ‘ব্রহ্মপুত্র’কেও মৌসুমি নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এই নদীপথের ঐতিহাসিক পরিচয় কেবল স্থানীয় স্মৃতির বিষয় নয়; সরকারি নদী-তালিকাতেও এর অস্তিত্ব স্বীকৃত।

ব্রহ্মপুত্রের বুকেই গড়ে উঠেছিল নরসিংদীর জনপদ নরসিংদী জেলা প্রশাসনের ইতিহাসবিষয়ক তথ্যে বলা হয়েছে, পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুতে রাজা নরসিংহ প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী এলাকায় ‘নরসিংহপুর’ নামে একটি নগর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেই নামের বিবর্তনের সঙ্গে বর্তমান নরসিংদীর নামের সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

একইভাবে সরকারি তথ্যে বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্রের তীর ঘেঁষে শেখেরচর-বাবুরহাট এলাকায় গড়ে উঠেছে দেশের বৃহৎ তাঁতবস্ত্র বিপণন কেন্দ্র। এছাড়াও জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাট-বাজার যেমন পাচদোনা, চর্ণগরদী, পারুলিয়া সাধুরবাজার, কালী বাজারসহ চরসিন্দুর বাজার এই নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল সেই সাথে জনপদ ও।

১৭১৭ সাল থেকে চলে আসা ব্যবসায়িক ঐতিহ্যের কারণে বাবুরহাট আজ নরসিংদীর অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

অর্থাৎ, নদীটি শুধু একটি জলধারা ছিল না; নরসিংদীর জনবসতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নের ইতিহাসের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।

ঐতিহাসিক ও স্থানীয় বিভিন্ন বর্ণনায় ব্রহ্মপুত্রের প্রাচীন প্রবাহের সঙ্গে নরসিংদীর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকার যোগাযোগের কথা পাওয়া যায়। পারুলিয়া, চর্ণগরদী, জিনারদী, পাঁচদোনা, শীলমান্দী হয়ে শেখেরচর-বাবুরহাট ও মাধবদীর দিকে বিস্তৃত পুরোনো জলপথের উল্লেখ রয়েছে।

তবে এই পুরো পথকে বর্তমান ‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র’ নদীর একই অবিচ্ছিন্ন জীবন্ত প্রবাহ হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ও ভূ-প্রাকৃতিক যাচাই প্রয়োজন। নদীর গতিপথ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিবর্তিত হয়েছে। 

নদীর জায়গায় শিল্প-বাণিজ্যের বিস্তার

নদীর তীরবর্তী নরসিংদীতে শিল্পায়ন যেমন কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিকে এগিয়েছে, তেমনি অপরিকল্পিত শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নদীর জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে।

নরসিংদী সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী এলাকায় অর্ধশত  ডাইং কারখানার বর্জ্যে নদী দূষণের ক্ষেত্রে ভুমিকা রাখছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যে এখনো অনেক কারখানার পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই এবং পাঁচদোনা-শেখেরচর এলাকার প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশের দুই তীরে শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে।

ব্রহ্মপুত্রসহ জেলার বিভিন্ন নদ-নদীতে শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য পড়ার অভিযোগ তুলে নদীর পানি ও পরিবেশের ওপর এর প্রভাবের কারণে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনে ভুমিকা রাখছে।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের অনলাইন নথিতে শেখেরচর-বাবুরহাট ঠিকানায় ডাইং ও প্রিন্টিং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন পাওয়া যায়।

টেক্সটাইল ও ডাইং শিল্পের অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নদীতে পড়লে পানির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে পানির গুণগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষতিকর পরিবর্তনকে দূষণের আওতায় ধরা হয়েছে।

ফলে নদীর পানি কালো হওয়া, দুর্গন্ধ, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হওয়া, তলদেশে দূষিত পলি জমা এবং পানির স্বাভাবিক ব্যবহার ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট কারখানাকে দূষণের জন্য দায়ী করতে হলে বর্তমান পরিবেশগত ছাড়পত্র, বর্জ্য নির্গমন পয়েন্ট ও পরীক্ষাগারভিত্তিক পানির মানের তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

দখল নদী হত্যার আরেক নীরব প্রক্রিয়া

শিল্পবর্জ্যের পাশাপাশি নদীর জায়গা দখল ও ভরাটও পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের সংকটকে গভীর করেছে।

২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাবুরহাট এলাকায় ব্রহ্মপুত্রের জায়গা দখল করে দোকান নির্মাণের অভিযোগও উঠে এসেছে। সেখানে নদী দখল ও ভরাটের কারণে নদীর জায়গা সংকুচিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ, নদী শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে শুধু প্রকৃতির পরিবর্তনকে দায়ী করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। প্রবাহ কমেছে—তারপর দখল হয়েছে; দখলের সঙ্গে ভরাট হয়েছে; শিল্পায়নের সঙ্গে বর্জ্যের চাপ বেড়েছে; আর সব মিলিয়ে নদীর স্বাভাবিক জলধারণ ও প্রবাহের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্রকে পুনরুজ্জীবিত করতে শুধু একবার ড্রেজিং করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ নদীর তলদেশ খনন করে গভীরতা বাড়ানো হলেও যদি দুই পাড় দখলে থাকে, নতুন করে ভরাট চলতে থাকে এবং শিল্পবর্জ্য নদীতে পড়তেই থাকে, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার নদীর নাব্যতা কমে যাবে।

বাংলাদেশে নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধারে ড্রেজিং একটি স্বীকৃত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। বিআইডব্লিউটিএর চলমান প্রকল্পের তালিকাতেও পুরাতন ব্রহ্মপুত্রসহ কয়েকটি নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প রয়েছে, যার মেয়াদ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত।

তবে নরসিংদীর এই ঐতিহাসিক প্রবাহপথ পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন হবে দখলমুক্তকরণ, সঠিক জরিপ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং, পুনঃদখল ঠেকানো এই পাঁচটির সমন্বিত প্রয়াস।

পুরাতন সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান, মৌজা ম্যাপ, স্যাটেলাইট ছবি, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ভূমি রেকর্ড মিলিয়ে নদীর প্রকৃত পুরোনো সীমানা নির্ধারণ করতে হবে।

শুধু বর্তমানে যেখানে পানি আছে, সেটিকে নদী ধরে জরিপ করলে চলবে না। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নদীতীরের সরকারি রেকর্ডভুক্ত জমিও চিহ্নিত করতে হবে। শেখেরচর-বাবুরহাট থেকে পাঁচদোনা হয়ে সংশ্লিষ্ট পুরোনো প্রবাহপথের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করা যেতে পারে।

প্রতিটি দখলকৃত স্থানের মৌজা, খতিয়ান, দাগ, জমির শ্রেণি, দখলকারীর পরিচয়, দখলের পরিমাণ, স্থাপনার ধরন ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা হলে উচ্ছেদ ও পরবর্তী নজরদারি অনেক বেশি স্বচ্ছ হবে।

দখল উচ্ছেদ কিন্তু পরিকল্পিতভাবে

দখলদারদের তালিকা যাচাই করে পর্যায়ক্রমে নদীর জায়গা উদ্ধার করতে হবে। দোকান, গুদাম, কারখানার সম্প্রসারিত অংশ, সড়ক বা অন্যান্য স্থাপনা যা নদীর সরকারি সীমানার মধ্যে পড়বে, আইন অনুযায়ী তা উচ্ছেদের আওতায় আনতে হবে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩-তে নদীর অবৈধ দখলমুক্তকরণ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে কমিশনের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।

দখলমুক্ত জমিতে আবার স্থাপনা নয়

শুধু উচ্ছেদ করলেই হবে না। উদ্ধার করা নদীতীরকে খুঁটি, সীমানা চিহ্ন, ওয়াকওয়ে বা প্রয়োজনীয় সংরক্ষণব্যবস্থার মাধ্যমে দৃশ্যমানভাবে চিহ্নিত করতে হবে।নইলে কয়েক বছর পর আবার নতুন দখল শুরু হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

শিল্পবর্জ্যের জন্য ‘জিরো ডিসচার্জ’ নজরদারি

নদী পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর একটি হলো নদীতে অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য বন্ধ করা।

প্রতিটি শিল্পকারখানার ক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন; ইটিপি চালু আছে কি না,

ইটিপির সক্ষমতা কারখানার উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, বর্জ্য পরিশোধনের পর পানি কোথায় যাচ্ছে, নির্গত পানির pH, BOD, COD, TSS, রং ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় মান

গোপন বাইপাস পাইপ আছে কি না?

শুধু কাগজে ইটিপি আছে কি না তা দেখলেই হবে না; ইটিপি বাস্তবে চালু আছে কি না এবং নির্গত পানি পরীক্ষায় মানসম্মত কি না সেটিই হতে হবে মূল নজরদারি।

দূষিত তলানি পরীক্ষা করে তারপর ড্রেজিং

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক বিষয় আছে। ড্রেজিংয়ের আগে তলানি পরীক্ষা করে দেখতে হবে সেখানে ক্ষতিকর রাসায়নিক বা ভারী ধাতুর মাত্রা কত। প্রয়োজন অনুযায়ী দূষিত পলি নিরাপদ ব্যবস্থাপনার আওতায় নিতে হবে।

বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং নদীর কোথায় কত গভীরতা প্রয়োজন, কোথায় স্রোত তৈরি করতে হবে, কোথায় পলি বেশি জমে এসব নির্ধারণ করে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের ভিত্তিতে ড্রেজিং করতে হবে।

শুধু গভীর করে দিলেই নদী বাঁচবে না। নদীর প্রস্থ, গভীরতা, ঢাল, পানির প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং উজান-ভাটির সংযোগ বিবেচনায় নিয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনর্গঠন করতে হবে।

পুরোনো সংযোগপথ ও খাল পুনরুদ্ধার

যদি ঐতিহাসিকভাবে এই প্রবাহের সঙ্গে সংযুক্ত কোনো খাল বা জলপথ বর্তমানে ভরাট হয়ে থাকে, সেগুলোরও তালিকা তৈরি করতে হবে।

কারণ নদীর মূল খাত খনন করেও যদি পানি প্রবেশের পথ বন্ধ থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত নাব্যতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

নদীতীরে সবুজ বেষ্টনী ও জনপরিসর

দখলমুক্ত নদীতীরে স্থানীয় প্রজাতির গাছ, হাঁটার পথ ও নিয়ন্ত্রিত জনপরিসর তৈরি করা যেতে পারে। এতে নদীর জায়গা দৃশ্যমান থাকবে এবং ভবিষ্যৎ দখলের সুযোগ কমবে।

তবে নদীতীর উন্নয়নের নামে আবার যেন কংক্রিটের স্থাপনা দিয়ে নদীর প্রাকৃতিক জায়গা সংকুচিত না করা হয় এ বিষয়েও কঠোর নকশাগত নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র পুনরুদ্ধার টাস্কফোর্স’ গঠন

এই কাজ একক কোনো সংস্থার পক্ষে করা কঠিন। জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভূমি প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

প্রথম ধাপে যে কাজগুলো করা যেতে পারে!

৬ মাসের নদী জরিপ, দখলদারির পূর্ণ তালিকা, দূষণের উৎস শনাক্ত, পানি ও পলি পরীক্ষা,  অগ্রাধিকারভিত্তিক উচ্ছেদ,  পাইলট ড্রেজিং ও পানি প্রবাহ পর্যবেক্ষণ। এরপর ফলাফল বিশ্লেষণ করে পুরো নদীপথে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।

নদী বাঁচলে শুধু পানি নয়, বাঁচবে অর্থনীতিও

পুরাতন ব্রহ্মপুত্রকে শুধু ‘মৃত নদী’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি নরসিংদীর ইতিহাস, জনবসতি, তাঁতশিল্প, বাণিজ্য ও পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত একটি জল-ভূপ্রকৃতি।

শেখেরচর-বাবুরহাটের মতো বিশাল বাণিজ্যকেন্দ্রের ইতিহাসও নদীর সঙ্গে যুক্ত। তাই নদী পুনরুদ্ধারকে শিল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং শিল্প ও নদী দুটোকেই টিকিয়ে রাখার পরিকল্পনা প্রয়োজন।

কারখানা থাকবে, কর্মসংস্থান থাকবে, বাবুরহাটের ব্যবসা থাকবে কিন্তু শিল্পবর্জ্য নদীতে যাবে না। বাজার থাকবে কিন্তু নদীর জায়গা দখল করে নয়। উন্নয়ন হবে,কিন্তু নদীর প্রবাহ বন্ধ করে নয়।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের মৃত্যু একদিনে ঘটেনি। নদীর স্বাভাবিক গতিপথের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পলি জমা, প্রবাহ কমে যাওয়া, দখল, ভরাট এবং শিল্পবর্জ্যের চাপ। ফলে একসময়ের জলপথ আজ বহু জায়গায় মৃতপ্রায়।

সরকারি নথিতে নদীটি এখনো স্বীকৃত। সরকারি নথিতেই নদীতীরবর্তী অবৈধ দখলের তালিকা রয়েছে। আবার সরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর চলমান প্রকল্পে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের নাব্যতা উন্নয়নের বিষয়ও রয়েছে।

তাই প্রশ্ন এখন শুধু ‘নদীটি কেন মরে গেল?’

যে নদী নরসিংদীর জনপদ ও অর্থনীতির জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তার কতটুকু এখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব?

উত্তরটি খুঁজতে হলে প্রথমে নদীর জায়গা নদীকে ফিরিয়ে দিতে হবে। এরপর বন্ধ করতে হবে দূষণের উৎস। তারপর বৈজ্ঞানিক জরিপের ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনতে হবে পানির প্রবাহ ও নাব্যতা।

কারণ নদীকে শুধু খনন করে বাঁচানো যায় না-নদীকে বাঁচাতে হলে নদীর জায়গা, পানি ও স্বাভাবিক প্রবাহ তিনটিই ফিরিয়ে দিতে হয়।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


মৃতপ্রায় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র: দখল-দূষণে হারাচ্ছে নদী, ফিরবে কি নাব্যতা?

প্রকাশের তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

একসময় যে নদীর বুকে নৌযান চলেছে, যার তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে জনপদ, হাট-বাজার ও শিল্প-বাণিজ্যের বিস্তার সেই পুরাতন ব্রহ্মপুত্র আজ নরসিংদীর বহু এলাকায় অস্তিত্ব সংকটে।

শেখেরচর-বাবুরহাট, পাঁচদোনা, চর্ণগরদীসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীর পুরোনো প্রবাহপথ এখন কোথাও সরু জলধারা, কোথাও ময়লা-আবর্জনায় ভরা খাত, আবার কোথাও দখল ও ভরাটের কারণে প্রায় অদৃশ্য এই নদ!

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদ-নদীর তালিকায় ‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র’ উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের একটি মৌসুমি নদী হিসেবে স্বীকৃত। একই তালিকায় নরসিংদী-মুন্সিগঞ্জ অংশের ‘ব্রহ্মপুত্র’কেও মৌসুমি নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এই নদীপথের ঐতিহাসিক পরিচয় কেবল স্থানীয় স্মৃতির বিষয় নয়; সরকারি নদী-তালিকাতেও এর অস্তিত্ব স্বীকৃত।

ব্রহ্মপুত্রের বুকেই গড়ে উঠেছিল নরসিংদীর জনপদ নরসিংদী জেলা প্রশাসনের ইতিহাসবিষয়ক তথ্যে বলা হয়েছে, পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুতে রাজা নরসিংহ প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী এলাকায় ‘নরসিংহপুর’ নামে একটি নগর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেই নামের বিবর্তনের সঙ্গে বর্তমান নরসিংদীর নামের সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

একইভাবে সরকারি তথ্যে বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্রের তীর ঘেঁষে শেখেরচর-বাবুরহাট এলাকায় গড়ে উঠেছে দেশের বৃহৎ তাঁতবস্ত্র বিপণন কেন্দ্র। এছাড়াও জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাট-বাজার যেমন পাচদোনা, চর্ণগরদী, পারুলিয়া সাধুরবাজার, কালী বাজারসহ চরসিন্দুর বাজার এই নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল সেই সাথে জনপদ ও।

১৭১৭ সাল থেকে চলে আসা ব্যবসায়িক ঐতিহ্যের কারণে বাবুরহাট আজ নরসিংদীর অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

অর্থাৎ, নদীটি শুধু একটি জলধারা ছিল না; নরসিংদীর জনবসতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নের ইতিহাসের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।

ঐতিহাসিক ও স্থানীয় বিভিন্ন বর্ণনায় ব্রহ্মপুত্রের প্রাচীন প্রবাহের সঙ্গে নরসিংদীর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকার যোগাযোগের কথা পাওয়া যায়। পারুলিয়া, চর্ণগরদী, জিনারদী, পাঁচদোনা, শীলমান্দী হয়ে শেখেরচর-বাবুরহাট ও মাধবদীর দিকে বিস্তৃত পুরোনো জলপথের উল্লেখ রয়েছে।

তবে এই পুরো পথকে বর্তমান ‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র’ নদীর একই অবিচ্ছিন্ন জীবন্ত প্রবাহ হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ও ভূ-প্রাকৃতিক যাচাই প্রয়োজন। নদীর গতিপথ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিবর্তিত হয়েছে। 

নদীর জায়গায় শিল্প-বাণিজ্যের বিস্তার

নদীর তীরবর্তী নরসিংদীতে শিল্পায়ন যেমন কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিকে এগিয়েছে, তেমনি অপরিকল্পিত শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নদীর জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে।

নরসিংদী সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী এলাকায় অর্ধশত  ডাইং কারখানার বর্জ্যে নদী দূষণের ক্ষেত্রে ভুমিকা রাখছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যে এখনো অনেক কারখানার পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই এবং পাঁচদোনা-শেখেরচর এলাকার প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশের দুই তীরে শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে।

ব্রহ্মপুত্রসহ জেলার বিভিন্ন নদ-নদীতে শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য পড়ার অভিযোগ তুলে নদীর পানি ও পরিবেশের ওপর এর প্রভাবের কারণে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনে ভুমিকা রাখছে।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের অনলাইন নথিতে শেখেরচর-বাবুরহাট ঠিকানায় ডাইং ও প্রিন্টিং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন পাওয়া যায়।

টেক্সটাইল ও ডাইং শিল্পের অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নদীতে পড়লে পানির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন ঘটতে পারে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে পানির গুণগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষতিকর পরিবর্তনকে দূষণের আওতায় ধরা হয়েছে।

ফলে নদীর পানি কালো হওয়া, দুর্গন্ধ, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হওয়া, তলদেশে দূষিত পলি জমা এবং পানির স্বাভাবিক ব্যবহার ব্যাহত হওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট কারখানাকে দূষণের জন্য দায়ী করতে হলে বর্তমান পরিবেশগত ছাড়পত্র, বর্জ্য নির্গমন পয়েন্ট ও পরীক্ষাগারভিত্তিক পানির মানের তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

দখল নদী হত্যার আরেক নীরব প্রক্রিয়া

শিল্পবর্জ্যের পাশাপাশি নদীর জায়গা দখল ও ভরাটও পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের সংকটকে গভীর করেছে।

২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাবুরহাট এলাকায় ব্রহ্মপুত্রের জায়গা দখল করে দোকান নির্মাণের অভিযোগও উঠে এসেছে। সেখানে নদী দখল ও ভরাটের কারণে নদীর জায়গা সংকুচিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ, নদী শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে শুধু প্রকৃতির পরিবর্তনকে দায়ী করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। প্রবাহ কমেছে—তারপর দখল হয়েছে; দখলের সঙ্গে ভরাট হয়েছে; শিল্পায়নের সঙ্গে বর্জ্যের চাপ বেড়েছে; আর সব মিলিয়ে নদীর স্বাভাবিক জলধারণ ও প্রবাহের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্রকে পুনরুজ্জীবিত করতে শুধু একবার ড্রেজিং করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ নদীর তলদেশ খনন করে গভীরতা বাড়ানো হলেও যদি দুই পাড় দখলে থাকে, নতুন করে ভরাট চলতে থাকে এবং শিল্পবর্জ্য নদীতে পড়তেই থাকে, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার নদীর নাব্যতা কমে যাবে।

বাংলাদেশে নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধারে ড্রেজিং একটি স্বীকৃত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। বিআইডব্লিউটিএর চলমান প্রকল্পের তালিকাতেও পুরাতন ব্রহ্মপুত্রসহ কয়েকটি নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প রয়েছে, যার মেয়াদ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত।

তবে নরসিংদীর এই ঐতিহাসিক প্রবাহপথ পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন হবে দখলমুক্তকরণ, সঠিক জরিপ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং, পুনঃদখল ঠেকানো এই পাঁচটির সমন্বিত প্রয়াস।

পুরাতন সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান, মৌজা ম্যাপ, স্যাটেলাইট ছবি, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ভূমি রেকর্ড মিলিয়ে নদীর প্রকৃত পুরোনো সীমানা নির্ধারণ করতে হবে।

শুধু বর্তমানে যেখানে পানি আছে, সেটিকে নদী ধরে জরিপ করলে চলবে না। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নদীতীরের সরকারি রেকর্ডভুক্ত জমিও চিহ্নিত করতে হবে। শেখেরচর-বাবুরহাট থেকে পাঁচদোনা হয়ে সংশ্লিষ্ট পুরোনো প্রবাহপথের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করা যেতে পারে।

প্রতিটি দখলকৃত স্থানের মৌজা, খতিয়ান, দাগ, জমির শ্রেণি, দখলকারীর পরিচয়, দখলের পরিমাণ, স্থাপনার ধরন ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা হলে উচ্ছেদ ও পরবর্তী নজরদারি অনেক বেশি স্বচ্ছ হবে।


দখল উচ্ছেদ কিন্তু পরিকল্পিতভাবে

দখলদারদের তালিকা যাচাই করে পর্যায়ক্রমে নদীর জায়গা উদ্ধার করতে হবে। দোকান, গুদাম, কারখানার সম্প্রসারিত অংশ, সড়ক বা অন্যান্য স্থাপনা যা নদীর সরকারি সীমানার মধ্যে পড়বে, আইন অনুযায়ী তা উচ্ছেদের আওতায় আনতে হবে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩-তে নদীর অবৈধ দখলমুক্তকরণ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে কমিশনের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।

দখলমুক্ত জমিতে আবার স্থাপনা নয়

শুধু উচ্ছেদ করলেই হবে না। উদ্ধার করা নদীতীরকে খুঁটি, সীমানা চিহ্ন, ওয়াকওয়ে বা প্রয়োজনীয় সংরক্ষণব্যবস্থার মাধ্যমে দৃশ্যমানভাবে চিহ্নিত করতে হবে।নইলে কয়েক বছর পর আবার নতুন দখল শুরু হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

শিল্পবর্জ্যের জন্য ‘জিরো ডিসচার্জ’ নজরদারি

নদী পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর একটি হলো নদীতে অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য বন্ধ করা।

প্রতিটি শিল্পকারখানার ক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন; ইটিপি চালু আছে কি না,

ইটিপির সক্ষমতা কারখানার উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, বর্জ্য পরিশোধনের পর পানি কোথায় যাচ্ছে, নির্গত পানির pH, BOD, COD, TSS, রং ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় মান

গোপন বাইপাস পাইপ আছে কি না?

শুধু কাগজে ইটিপি আছে কি না তা দেখলেই হবে না; ইটিপি বাস্তবে চালু আছে কি না এবং নির্গত পানি পরীক্ষায় মানসম্মত কি না সেটিই হতে হবে মূল নজরদারি।

দূষিত তলানি পরীক্ষা করে তারপর ড্রেজিং

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক বিষয় আছে। ড্রেজিংয়ের আগে তলানি পরীক্ষা করে দেখতে হবে সেখানে ক্ষতিকর রাসায়নিক বা ভারী ধাতুর মাত্রা কত। প্রয়োজন অনুযায়ী দূষিত পলি নিরাপদ ব্যবস্থাপনার আওতায় নিতে হবে।

বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং নদীর কোথায় কত গভীরতা প্রয়োজন, কোথায় স্রোত তৈরি করতে হবে, কোথায় পলি বেশি জমে এসব নির্ধারণ করে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের ভিত্তিতে ড্রেজিং করতে হবে।

শুধু গভীর করে দিলেই নদী বাঁচবে না। নদীর প্রস্থ, গভীরতা, ঢাল, পানির প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং উজান-ভাটির সংযোগ বিবেচনায় নিয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনর্গঠন করতে হবে।

পুরোনো সংযোগপথ ও খাল পুনরুদ্ধার

যদি ঐতিহাসিকভাবে এই প্রবাহের সঙ্গে সংযুক্ত কোনো খাল বা জলপথ বর্তমানে ভরাট হয়ে থাকে, সেগুলোরও তালিকা তৈরি করতে হবে।

কারণ নদীর মূল খাত খনন করেও যদি পানি প্রবেশের পথ বন্ধ থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত নাব্যতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

নদীতীরে সবুজ বেষ্টনী ও জনপরিসর

দখলমুক্ত নদীতীরে স্থানীয় প্রজাতির গাছ, হাঁটার পথ ও নিয়ন্ত্রিত জনপরিসর তৈরি করা যেতে পারে। এতে নদীর জায়গা দৃশ্যমান থাকবে এবং ভবিষ্যৎ দখলের সুযোগ কমবে।

তবে নদীতীর উন্নয়নের নামে আবার যেন কংক্রিটের স্থাপনা দিয়ে নদীর প্রাকৃতিক জায়গা সংকুচিত না করা হয় এ বিষয়েও কঠোর নকশাগত নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র পুনরুদ্ধার টাস্কফোর্স’ গঠন

এই কাজ একক কোনো সংস্থার পক্ষে করা কঠিন। জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভূমি প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

প্রথম ধাপে যে কাজগুলো করা যেতে পারে!

৬ মাসের নদী জরিপ, দখলদারির পূর্ণ তালিকা, দূষণের উৎস শনাক্ত, পানি ও পলি পরীক্ষা,  অগ্রাধিকারভিত্তিক উচ্ছেদ,  পাইলট ড্রেজিং ও পানি প্রবাহ পর্যবেক্ষণ। এরপর ফলাফল বিশ্লেষণ করে পুরো নদীপথে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।

নদী বাঁচলে শুধু পানি নয়, বাঁচবে অর্থনীতিও

পুরাতন ব্রহ্মপুত্রকে শুধু ‘মৃত নদী’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি নরসিংদীর ইতিহাস, জনবসতি, তাঁতশিল্প, বাণিজ্য ও পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত একটি জল-ভূপ্রকৃতি।

শেখেরচর-বাবুরহাটের মতো বিশাল বাণিজ্যকেন্দ্রের ইতিহাসও নদীর সঙ্গে যুক্ত। তাই নদী পুনরুদ্ধারকে শিল্পের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং শিল্প ও নদী দুটোকেই টিকিয়ে রাখার পরিকল্পনা প্রয়োজন।

কারখানা থাকবে, কর্মসংস্থান থাকবে, বাবুরহাটের ব্যবসা থাকবে কিন্তু শিল্পবর্জ্য নদীতে যাবে না। বাজার থাকবে কিন্তু নদীর জায়গা দখল করে নয়। উন্নয়ন হবে,কিন্তু নদীর প্রবাহ বন্ধ করে নয়।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের মৃত্যু একদিনে ঘটেনি। নদীর স্বাভাবিক গতিপথের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পলি জমা, প্রবাহ কমে যাওয়া, দখল, ভরাট এবং শিল্পবর্জ্যের চাপ। ফলে একসময়ের জলপথ আজ বহু জায়গায় মৃতপ্রায়।

সরকারি নথিতে নদীটি এখনো স্বীকৃত। সরকারি নথিতেই নদীতীরবর্তী অবৈধ দখলের তালিকা রয়েছে। আবার সরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর চলমান প্রকল্পে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের নাব্যতা উন্নয়নের বিষয়ও রয়েছে।

তাই প্রশ্ন এখন শুধু ‘নদীটি কেন মরে গেল?’

যে নদী নরসিংদীর জনপদ ও অর্থনীতির জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তার কতটুকু এখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব?

উত্তরটি খুঁজতে হলে প্রথমে নদীর জায়গা নদীকে ফিরিয়ে দিতে হবে। এরপর বন্ধ করতে হবে দূষণের উৎস। তারপর বৈজ্ঞানিক জরিপের ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনতে হবে পানির প্রবাহ ও নাব্যতা।

কারণ নদীকে শুধু খনন করে বাঁচানো যায় না-নদীকে বাঁচাতে হলে নদীর জায়গা, পানি ও স্বাভাবিক প্রবাহ তিনটিই ফিরিয়ে দিতে হয়।




Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream