একাধিক ফৌজদারি মামলায় পৃথকভাবে সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়া একই সময়ে সব সাজা ভোগ করতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ, পৃথক মামলায় দণ্ড দেওয়ার সময় সাজা একসঙ্গে কার্যকর হওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ না থাকলে একটি মামলার সাজা শেষ হওয়ার পর অন্য মামলার সাজা শুরু হবে।
চেক ডিজঅনারের ছয়টি পৃথক মামলায় দণ্ডিত এক ব্যক্তির কারাবন্দিত্বের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের রুল খারিজ করে ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট এ রায় দেন বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর হাইকোর্ট বেঞ্চ। সম্প্রতি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
‘মো. নাসির উদ্দিন বনাম রাষ্ট্র’ মামলার রায়ে নাসির উদ্দিনকে দুই মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি শেখ তাহসিন আলী।
মামলার ঘটনা
রায়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মো. নাসির উদ্দিন নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় দায়ের হওয়া ছয়টি পৃথক চেক ডিজঅনার মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত হন। ২০২১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে অন্য মামলাগুলোতেও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
সাজা শেষ হওয়ার পরও তাকে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে ২০২২ সালে হাইকোর্টে রিট করেন নাসির উদ্দিন। ওই বছরের ১১ এপ্রিল প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত রুল জারির পাশাপাশি তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন।
রিটের শুনানিতে নাসির উদ্দিনের আইনজীবী মো. শাহ আলম যুক্তি দেন, মামলাগুলোর বিচার চলার সময় নাসির কারাগারে ছিলেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারার আওতায় ওই সময় সাজা থেকে সমন্বয় করা হলে তার কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তাই তাকে মুক্তি দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সামীর সাত্তার বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৯৭ ধারা অনুযায়ী, আদালত আলাদাভাবে দেওয়া সাজাগুলো একই সঙ্গে চলবে বলে স্পষ্ট নির্দেশ না দিলে সাজাগুলো পরপর কার্যকর হবে। নাসির উদ্দিনের মামলাগুলোতে এমন কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
তিনি আরও জানান, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ ধারা অনুযায়ী বিচারাধীন অবস্থায় কোনো নির্দিষ্ট মামলায় আটক থাকার সময় কেবল সেই মামলার সাজা থেকে বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্য কোনো মামলার সাজা থেকে ওই সময় সমন্বয় করা যাবে না।
দুই পক্ষের বক্তব্য ও মামলার নথি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দেন।
কারাভোগের সময় গণনার নির্দেশ
রায়ে নাসির উদ্দিনের আইনজীবীকে ছয়টি মামলার বিচার চলাকালে তার কারাভোগের সময় হিসাব করে একটি ‘ক্যালকুলেশন শিট’ তৈরি করতে বলা হয়েছে। নিম্ন আদালতের নথি যাচাই করে সেই হিসাব কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে।
কারা কর্তৃপক্ষ প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে বিচারাধীন অবস্থায় আটক থাকার সময় আলাদাভাবে হিসাব করবে এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মামলার সাজা থেকে তা বাদ দেবে। তবে একটি মামলায় আটক থাকার সময় অন্য মামলার সাজা থেকে সমন্বয় করা যাবে না।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
আদালত বলেছেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫এ অনুযায়ী বিচার চলাকালে আসামি যে মামলায় কারাগারে ছিলেন, শুধু সেই মামলার সাজা থেকে ওই সময় বাদ দেওয়া যাবে।
অন্যদিকে ৩৯৭ ধারা অনুযায়ী, পৃথক মামলায় দেওয়া সাজা একই সময়ে কার্যকর করার বিষয়ে আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ না থাকলে সাজাগুলো ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হবে।
হাইকোর্ট আরও বলেন, কোনো আইনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলে রিট এখতিয়ার ব্যবহার করে ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিল করার সুযোগ নেই। একইভাবে রিটের মাধ্যমে বিচারিক আদালতের দেওয়া ফৌজদারি রায়েও হস্তক্ষেপ করা যায় না।
মতামত