নীলফামারীর ডোমার উপজেলার ১নং ভোগডাবুড়ী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে কর্মরত ফার্মাসিস্ট পলাশ চন্দ্র সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা না দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ছাগল, কবুতর ও হাঁসের খামারে পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। সেখানে গিয়ে আরও দেখা যায়, কেন্দ্রের সম্মুখের দুই পাশে ঘাস লাগিয়ে পোকামাকড়ের অভয়াশ্রমের পাশাপাশি কেন্দ্রটিকে ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত করা হয়েছে। রাস্তা দিয়ে গেলে দেখে মনে হবে এটি দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত ও অপরিচ্ছন্ন একটি ভবন। চারদিকে শুধু জঙ্গল আর ময়লায় আচ্ছন্ন।
স্থানীয়রা জানান, ফার্মাসিস্ট পলাশ সর্বদাই মূল গেটটি বন্ধ করে রাখেন। ছোট পকেট গেটটি খোলা রাখলেও সেটিও প্রায়ই বন্ধ থাকে। কাউকে ভেতরে ঢুকতে হলে গেটটি চাপ দিয়ে খুলে প্রবেশ করতে হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ফার্মাসিস্ট পলাশ কেন্দ্রটিতে এলাকার সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা প্রদানের পরিবর্তে ভবনের ছাদের উপরে ছাগল, হাঁস-মুরগি ও কবুতরের খামার তৈরি করেছেন। ছাদের উপরে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি চেয়ার-টেবিল নিয়ে গিয়ে সেখানে ছাগলের বসার জায়গা করা হয়েছে ও ঘিরে খামার বানানো হয়েছে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহের ছয় দিন কেন্দ্রটি খোলা রাখার কথা থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে সপ্তাহে তিন দিন প্রতিষ্ঠানটি খোলা থাকে, তাও আবার দুপুর ১টার পর। অনেককে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির গেট বন্ধ দেখে সেবা না নিয়েই চলে যেতে দেখা যায়। কেন্দ্রটি নিয়মিত খোলা না থাকায় এলাকাবাসী দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ তাদের।
বর্তমানে কেন্দ্রটির পরিবেশ এতটাই নোংরা যে, ঘরের মেঝেতে ছাগলের বিষ্ঠা ও হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা পড়ে থাকে। এতে প্রতিমুহূর্তে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি কেন্দ্রটি গোয়ালঘরে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এলাকাবাসী একাধিকবার ফার্মাসিস্ট পলাশকে এসব বিষয়ে অবগত করলেও তিনি কারও কথার তোয়াক্কা না করে নিজের প্রভাব খাটিয়ে এখানে রীতিমতো ব্যবসা করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অথচ এমন একটা সময় ছিল, ভোগডাবুড়ী ইউনিয়নের এই পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি মা ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা প্রদানে উপজেলার শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। অথচ বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি কী বেহাল দশার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, তা দেখার কেউ নেই বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
এলাকাবাসী জানায়, পলাশ চন্দ্রকে একাধিকবার বলার পরও তিনি বলেন, ‘এটা আমার পরিবার। এখানে আমার পরিবার পরিচালনা করতে গিয়ে যা যা করা দরকার, আমি তাই করব। আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাকে অনুমতি দিয়েছে, তার কথায় আমি এখানে খামার তৈরি করেছি।’
এলাকাবাসীর অভিযোগ, তারা যখন বলেন এটি একটি সেবাকেন্দ্র, এখানে এসব করা যাবে না, তখন পলাশ তাদের হুমকি দিয়ে বলেন, ‘বেশি বাড়াবাড়ি করলে সংখ্যালঘুর ওপর নির্যাতন এবং চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে তোমাদের জেল খাটাবো।’
এখন এলাকাবাসীর একটাই প্রশ্ন?কোন ক্ষমতার বলে তিনি এমন ভাব নিয়ে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের খেয়াল-খুশিমতো যা ইচ্ছে তাই করছেন?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিস সূত্রে জানা যায়, পলাশ চন্দ্র এর আগে যে জায়গায় চাকরি করেছিলেন, সেখানেও নিয়মবহির্ভূত স্বেচ্ছাচারিতা ও নিজের খেয়াল-খুশিমতো কাজ করার কারণে তাকে সেখান থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে ডোমারে পাঠানো হয়েছিল বলে জানা যায়। কোন ক্ষমতার বলে তিনি এসব করার সাহস পান, সেটিও প্রশ্ন থেকে যায়।
এ বিষয়ে ভোগডাবুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য তাকদীরুল আহসান সোহেল জানান, ‘কেন্দ্রটি আমার বাড়ির পাশে। আমি দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি, তিনি ছাদের উপরে ছাগল ও হাঁসের খামার বানিয়েছেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির সামনের জায়গায় ঘাস চাষ করে নোংরা পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। আমি আমার সন্তানকে টিকা দিতে আসলে মূল গেটটি বন্ধ পাই। পরে ছোট গেট দিয়ে ঢুকে সন্তানকে টিকা দিই। অর্থাৎ মূল গেটটিও সবসময় বন্ধ থাকে। তাকে বারবার এসব পালন করতে নিষেধ করা সত্ত্বেও তিনি এখন পর্যন্ত সেগুলো পালন করেই যাচ্ছেন।’
তিনি আরও জানান, পলাশ চন্দ্র সেখানে দাদন ব্যবসা ও চাকরির পাশাপাশি নিজের ওষুধের দোকানও পরিচালনা করেন।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির পরিদর্শক শাহাদাত হোসেন জানান, ‘ছাগল পালনের বিষয়টি সম্পর্কে আমি আমার উপজেলা কর্মকর্তাকে অবহিত করেছি।’
এ বিষয়ে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তবিবুর রহমান জানান, ‘আপনি বললেন, যেহেতু আমি খুব দ্রুত পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেব।’
নীলফামারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আল কামাল মুঠোফোনে জানান, ‘আমি এ বিষয়ে পূর্ব থেকে কিছু জানি না। আমাকে কিছু জানানো হয়নি। এখন আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। আমি অবগত হলাম। আমি উপজেলা কর্মকর্তাকে জানাবো। তিনি সেখানে গিয়ে পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন দেবেন। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ডোমার উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা শায়লা সাঈদ তন্বী জানান, এসব তো স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ায়। এ বিষয়ে আমি উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সাথে কথা বলবো ।
মতামত