লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের বাংলা লজ্জাবতী বানরের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও উদ্ধারকৃত বন্যপ্রাণী অবমুক্তকরণের কেন্দ্র।
লজ্জাবতী বানর আসলে বানর নয়।এটা হলো *Slow Loris* বা *লজ্জাবতী লেমুর*। বাংলায় এটাকে লজ্জাবতী বানরই বলে সবাই। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, যথাযথ আবাসস্থল ও খাদ্য নিশ্চিত না করে হঠাৎ বনে অবমুক্ত করা হলে এদের বেঁচে থাকার হার বেশ কম। অন্য লজ্জাবতী বানরের আক্রমণে এবং উপযুক্ত বাসস্থান না পাওয়ায় ২০২২ -২০২৩ সালে লাউয়াছড়ায় ছাড়া ৯ টার মধ্যে ৭ টা লজ্জাবতী বানরই মারা গেছে।আর সড়ক ও রেলে কাটা পড়েও মারা যাচ্ছে। ২০১৭ সালে শুধু ৬ মাসেই ৫ টি লজ্জাবতী বানরের মৃত্যুর রেকর্ড আছে লাউয়াছড়ায়।
২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ৯টি লজ্জাবতী বানরকে জাতীয় উদ্যান লাউয়াছড়া বনে অবমুক্ত করা হয়েছিল । এর মধ্যে ৫টিকে জানকিছড়া এলাকার কাছাকাছি এবং বাকি ৪টিকে অন্য স্থানে ছাড়া হয়েছিল। গবেষকেরা প্রতিটি বানরের গলায় রেডিও কলার পরিয়ে আট মাস ধরে মোট ১৩৮ রাত তাদের অবস্থান ও আচরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অবমুক্ত করার মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ৩টি বানর মারা যায়। অন্য ৪টি বানর এক মাসের বেশি সময় বেঁচে থাকলেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। এর মধ্যে ‘অনু’ নামের একটি পুরুষ বানর ১৭৯ দিন টিকে থাকার পর অন্য বানরের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা যায়।
কেবল ‘ডারউইন’ ও ‘নিশাত’ নামের দুটি লজ্জাবতী বানর ছয় মাসের বেশি সময় টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছিল। মারা যাওয়া ৭টি বানরের মধ্যে ৪টির দেহ পরীক্ষার উপযোগী অবস্থায় পাওয়া যায় এবং তাদের মাথা, মুখ ও আঙুলে অন্য লজ্জাবতী বানরের কামড় ও আক্রমণের ক্ষতচিহ্ন ছিল। বাকি ৩টির দেহ পচে যাওয়ায় মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘যত্রতত্র প্রাণী ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়। এ জন্য নির্দিষ্ট প্রটোকল আছে; কিন্তু সেগুলো মেনে চলার ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি থাকে।'বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নেটওয়ার্ক সদস্য নুরুল মুহাইমিন মিল্টন বলেন, পুরনো গাছ অবৈধভাবে কাটার ফলে খাদ্যের উৎস আরও সংকুচিত হয়েছে। ফলে লজ্জাবতী বানরেরা তাদের আবাসস্থল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে এবং এদের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার মতো বিপদের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।
মানুষ দেখলে মুখ হাত দিয়ে ঢেকে ফেলে, লজ্জা পাওয়ার মতো ভাব করে - এজন্য লজ্জাবতী বানর নাম হয়েছে। আসলে এরা ভয় পেয়ে এমন করে।নিশাচর প্রাণী লজ্জাবতীর ওজন: ১ থেকে ২ কেজি হয় বলে জানা যায়। এদের বড় বড় গোল চোখ, দেখতে খুব মায়াবী,লোম ঘন,ধূসর-বাদামি বর্ণ,লেজ খুব ছোট, প্রায় নেই বললেই চলে, হাত-পা শক্ত, গাছ আঁকড়ে ধরতে পারে।খুব ছোট, বিড়ালের বাচ্চার মতো, লোমশ, দুইটা বড় মার্বেলের মতো চোখ - রাতের বেলায় টর্চের আলোতে জ্বলজ্বল করে। গাছের ডালে আস্তে আস্তে হাঁটে।তাদের প্রশস্ত চোখ, মৃদু নড়াচড়া এবং শান্ত আচরণের সাথে, ধীর লরিসগুলিকে আদর্শ পোষা প্রাণী হিসাবে সহজেই ভুল করা হয়। কিন্তু এই বিপন্ন প্রাইমেটরা বন্য, বিষাক্ত এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল, বন্দিত্বের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। ক'বছর আগে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশন-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় জানা গেছে, বাংলাদেশী গবেষক হাসান আল-রাজীর ২ বছরের জরিপ অনুযায়ী :লাউয়াছড়ায়: ২৩ টি,সাতছড়িতে: ৩৩ টি, রেমা-কালেঙ্গায়: ৮ টি ও আদমপুরে: ৪ টি লজ্জাবতী বানর ছিলো। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশের গবেষক হাসান আল-রাজি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দেশি–বিদেশি আরও ১০ গবেষক।
গবেষণায় বন বিভাগসহ বাংলাদেশ, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল। এদেশের একমাত্র নিশাচর বানর গোত্রীয় প্রাণী 'Bengal slow loris বা লজ্জাবতী বানর আমাদের জীব বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মহাবিপন্ন এ প্রার ও এর আবাসস্থল সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরী। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশে ২০২২ সাল থেকে লজ্জাবতী বানর সংরক্ষণে কাজ করছে জার্মানভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্লামপ্লরিস ইভি। সেই থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থান থেকে ২৩টি লজ্জাবতী বানর উদ্ধার করে জানকীছড়া বন্য প্রাণী রেসকিউ সেন্টারে নিয়ে আসা হয়েছে।
সংস্থার লোকজন এই প্রাণীদের দেখাশোনা, চিকিৎসা, সেবা-শুশ্রূষা ও খাবারদাবারের বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন। এই ২৩টির মধ্যে ১৫টি লজ্জাবতী বানরকে এরই মধ্যে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করা হয়েছে। বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সহযোগিতায় প্লামপ্লরিস ইভি প্রথমটি অবমুক্ত করেছে ২০২২ সালের ১০ মার্চ। এ সংস্থাটি দ্বায়িতশীল ইকো-ট্যুরিজমের উপরও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। চিরহরিৎ বন লাউয়াছড়া,সাতছড়ি, রেমা-কালেঙ্গায় আবারও দেখা মিলবে লাজুক লজ্জাবতী বানরের।

মতামত