ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরবেন—এমন ঘোষণা আগে এলেও বর্তমানে সেই সম্ভাবনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। তার দেশে ফেরার বিষয়টি এখন শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইনি প্রক্রিয়া, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নিরাপত্তার মতো একাধিক বিষয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়ার পর ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। এরপর আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতা বিদেশে চলে যান, কেউ কারাগারে এবং অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে দলটি সাংগঠনিকভাবে বড় ধরনের সংকটে পড়ে।
এর মধ্যেও ভার্চুয়াল মাধ্যমে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন শেখ হাসিনা। গত জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানান। এতে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত তার দেশে ফেরাকে ঘিরে দলীয় পর্যায়ে বড় কোনো প্রস্তুতি দৃশ্যমান হয়নি।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর পাশাপাশি বর্তমানে ঢাকার কাছে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারত যদি তাকে সেখানে রাখে, তাহলে যেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ না দেওয়া হয় এমন অবস্থান রয়েছে সরকারের।
বাংলাদেশের আশঙ্কা, ভারতের মাটি থেকে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া বা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাংগঠনিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে। ফলে প্রত্যর্পণের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও ঢাকা-দিল্লির আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের আলোচনায় বাণিজ্য, সীমান্ত ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় ইস্যুর পাশাপাশি শেখ হাসিনার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দেশে ফেরার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার জন্য অন্যতম বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে আইনি কারণে। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিচার হয়েছে এবং একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায়ও দেওয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় দেশে ফিরলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। ফলে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরে যাওয়ার সুযোগ কতটা থাকবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতের মাটিতে রয়েছেন। তাকে বাংলাদেশে ফেরানোর বিষয়টি তাই ভারতের সিদ্ধান্ত, দেশটির নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও নির্ভরশীল।
শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থাও আগের মতো নেই। দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অনেক নেতা কারাগারে, কেউ বিদেশে এবং অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরাও মামলা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
ফলে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেও তাকে ঘিরে আগের মতো বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনার সাংগঠনিক সক্ষমতা আওয়ামী লীগের রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তার বিরুদ্ধে থাকা জনক্ষোভ, সম্ভাব্য বিক্ষোভ এবং পাল্টা কর্মসূচি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার ভাষ্য, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ইচ্ছা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি তার একার সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হওয়ার সুযোগ নেই। ভারত, আইনি প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
দলের একটি অংশ অবশ্য মনে করছে, দেশে অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ বাড়লে ভবিষ্যতে শেখ হাসিনার ফেরার রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তবে ডিসেম্বরের মধ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত কোনো ইঙ্গিত নেই।
রাজনীতি বিশ্লেষক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা কম। তার মতে, দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতা বড় বিষয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানও মনে করেন, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন এখন আর তার একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল নয়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, দুই দেশের অবস্থান, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভারতের আইনি প্রক্রিয়ার মতো বিষয় এতে যুক্ত হয়েছে।
তার মতে, ডিসেম্বর খুব বেশি দূরে নয়; কিন্তু এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পক্ষে দৃশ্যমান কোনো প্রস্তুতি বা বাস্তব অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগের মধ্যেও তাকে ঘিরে বড় ধরনের প্রস্তুতির লক্ষণ নেই।
সব মিলিয়ে, ডিসেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা থাকলেও বর্তমান আইনি, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই প্রত্যাবর্তন এখনো অনিশ্চিত।
সুত্রঃ আগামীর সময়
মতামত