নীলফামারীর সৈয়দপুরে প্রশাসনকে বাল্য বিয়ের খবর দেওয়ার পরও চতুর্থ শ্রেণীর এক ছাত্রীর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। কাজীর মাধ্যমে কাবিন করাসহ ঘটা করেই হয়েছে বর ও কনের বাড়ির বিয়ের নানা অনুষ্ঠান। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই তিন দিন ধরে স্বামীর সংসার করছে শিশু শিক্ষার্থীটি। একটা বাল্য বিয়ে সম্পন্ন হলেও বিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন নির্বিকার থাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে সচেতন মহলে।
জানা যায়, সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের ধলাগাছ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী জিনু আক্তার। তার রোল নং ১৩। সে সৈয়দপুর পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডের হাজী মনিরুদ্দিন রোড ধলাগাছ কয়া কিসামতপাড়ার জসির উদ্দিন ও জাহেদা বেগম দম্পত্তির দ্বিতীয় কন্যা। সর্বশেষ গত ২৭ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) সে বিদ্যালয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার পরদিনই তাকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের কাঙ্গালুপাড়া এলাকার ট্রলি চালক মহুবার রহমানের ছেলে মুন্নাত (১৮)। পেশায় সৈয়দপুর শুটকি আড়তের দিনমজুর।
এলাকার লোকজন এই বাল্য বিয়ের বন্ধের চেষ্টা করেও ব্যার্থ হওয়ায় খবর দেন সৈয়দপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি) সাব্বির হোসেনকে। এর প্রেক্ষিতে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) মোখছেদুল ইসলামকে ওই বিয়ে বন্ধের নির্দেশ দেন এসি ল্যান্ড। ইউপি সচিব গ্রাম পুলিশ ফয়সাল হোসেন ও শ্রী সত্যদাস এবং ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জালাল উদ্দিনকে পাঠান মেয়ের নানীর বাড়ি নয়াহাট আশ্রয়ন প্রকল্পে। কিন্তু তারা ঘুরে আসার পর রাতে মেয়েটিকে তার নানীর বড় বোন নুরুন্নাহারের বাড়ি একই ইউনিয়নের অসুরখাই সর্দারপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই বিয়ের কাবিননামা সম্পন্ন করা হয়। বিয়ে পড়ান কামারপুকুর ইউনিয়নের নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার ও কামারপুকুর বাজারের হোমিও চিকিৎসক মাওলানা মোতাসিম বিল্লাহ।
রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুরে ধলাগাছ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গেলে প্রধান শিক্ষক উম্মে হাবিবা বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানের কোন ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে এ বিষয়ে আমার কিছুই জানা নাই। পরে পিয়ন ও চতুর্থ শ্রেণীর কয়েকজন শিক্ষার্থীর মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে আর আমাদের কিছুই করার নাই। তবে মেয়েটির অভিভাবকদের ডেকে কেন বিয়ে দিলো তা জানার চেষ্টা করবো এবং প্রয়োজন হলে আমার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো। এসময় তিনি জিনু আক্তারের ভর্তি তথ্য রেজিষ্টার দেখে জানান, তার জন্ম তারিখ ২২-৭-২০১৩ ইং। সে অনুযায়ী আজ পর্যন্ত তার বয়স ১৩ বছর ১ মাস ৬ দিন।
ঘটনার সত্যতা উদঘাটনে বরের বাড়ি উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের কাঙ্গালুপাড়ায় গেলে বর ও কনেকে কৌশলে সরিয়ে ফেলা হয়। পরে মেয়ের বড় নানী নুুরুন্নাহার ও ছেলের মা মুক্তা বিয়ের বিষয় স্বীকার করেন এবং বর ও কনেকে ডেকে আনেন। এসময় বাল্য বিয়ের শিকার মেয়েটি সংবাদকর্মীদের জানান, আমার বিয়ে হয়েছে। আমি এখন স্বামীর সংসার করবো। স্কুলে আর যাওয়া হবেনা।
এরপর কামারপুকুর ইউনিয়নের নিকাহ রেজিষ্ট্রার কার্যালয় আয়শা হোমিও হলে কাজী মাওলানা মোতাসিম বিল্লাহর সাথে কথা হয়। তিনি বাল্য বিয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, মূলত: ছেলে ও মেয়ের আত্মীয় স্বজনের চাপেই বিয়েটা হয়েছে। তবে এটা আমার ভুল হয়েছে। ভবিষ্যতে আর এমন কাজ করবোনা। তবে এমন বিয়ের কাবিন আমি না করলেও অন্য কেউ করতো। কেননা অহরহ বাল্য বিয়ে হচ্ছে।
চতুর্থ শ্রেণীর একজন নিয়মিত ছাত্রীর বিয়ে হওয়ায় স্কুল থেকে ঝরে গেলো এক শিক্ষার্থী এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে উপজেলা সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (এটিইও) মরিয়ম নেছা বলেন, আমি আর কি করবো। কর্তৃপক্ষকে ঝরে পড়ার রিপোর্ট জানাবো। আমি আর এব্যাপারে কোন খোঁজ খবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করছিনা।
এ বিষয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নুরুন্নাহার শাহাজাদী বলেন, আমরা বাল্য বিয়ে নিয়ে আমাদের মত করে কাজ করছি। স্কুলেও এধরণের সেমিনার করেছি। তারপরও বাল্য বিয়ের খবর পেলে আমরা প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। এখন যেহেতু বিয়ে হয়েই গেছে সেক্ষেত্রে আমাদের আর কিছুই করার নাই। তবে এব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিবো।
উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভুমি) সাব্বির হোসেন বলেন, এ বিষয়ে খবর পেয়ে ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ ও ইউপি সদস্যকে নয়াহাট আশ্রয়ন প্রকল্পে মেয়ের নানী বাড়িতে পাঠিয়েছিলাম। তারা জানিয়েছিল সেখানে বিয়ের কোন আয়োজন নেই, বাড়িতে তালা। কিন্তু পরে যদি বিয়ে হয়ে থাকে তাহলে আমাদের আর কি করার আছে। মূলত: আমরা ভ্রাম্যমান আদালত স্পটে কোন ঘটনা পেলে তার ব্যবস্থা নিই। এখন এ ঘটনায় নিয়মিত মামলা করলে পুলিশ প্রশাসন ব্যবস্থা নিবে।
মতামত