জীবনে সুখী হওয়ার জন্য অনেকেই বেশি আয়, বড় বাড়ি কিংবা কর্মক্ষেত্রে বড় সাফল্যের স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু সুখের জন্য সব সময় আরও বেশি কিছু অর্জন করতেই হবে, এমন নয়। নিজের প্রয়োজন বুঝে চলা, যা আছে তা উপভোগ করা এবং জীবনের নানা ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার মধ্যেও সুখ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। সুইডেনের জনপ্রিয় জীবনদর্শন ‘লাগোম’ মূলত সেই কথাই শেখায়।
লাগোমের সহজ অর্থ হলো, কোনো কিছুই প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত নয়, আবার প্রয়োজনের চেয়ে কমও নয়। অর্থাৎ, যতটুকু দরকার, ততটুকুই যথেষ্ট। খাবার গ্রহণ থেকে শুরু করে কাজ, বিশ্রাম, কেনাকাটা কিংবা অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই পরিমিতিবোধের ওপর গুরুত্ব দেয় এই দর্শন। বিশ্ব সুখ প্রতিবেদনেও সুইডেন নিয়মিতভাবে সুখী দেশগুলোর মধ্যে স্থান পেয়ে থাকে।
প্রয়োজন বুঝে চলার অভ্যাস
লাগোমের মূল শিক্ষা হলো, কোনো কিছু ব্যবহার বা গ্রহণ করার আগে নিজের প্রকৃত প্রয়োজন বুঝতে শেখা। অনেক সময় আমরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জিনিস সংগ্রহ করি, অতিরিক্ত খাবার নিই কিংবা সামর্থ্যের বাইরে খরচ করি। পরে এসবের কিছু অংশ কাজে লাগে না, আবার কখনো অপচয়ও হয়।
ধরা যাক, দুপুরের খাবারের সময় নিজের ক্ষুধার তুলনায় অনেক বেশি খাবার নেওয়া হলো। পরে খেতে না পারায় সেই খাবার নষ্ট হতে পারে। অথচ শুরুতেই প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার নিলে অপচয় এড়ানো সম্ভব। একইভাবে বাজার করার সময় প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা তৈরি করলে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটাও কমানো যায়।
ধরা যাক, দুপুরের খাবারের সময় নিজের ক্ষুধার তুলনায় অনেক বেশি খাবার নেওয়া হলো। পরে খেতে না পারায় সেই খাবার নষ্ট হতে পারে। অথচ শুরুতেই প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার নিলে অপচয় এড়ানো সম্ভব। একইভাবে বাজার করার সময় প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা তৈরি করলে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটাও কমানো যায়।
অর্থাৎ, লাগোম মানুষকে সবকিছু ছেড়ে দিতে বলে না; বরং কোনটি প্রয়োজন আর কোনটি কেবল অতিরিক্ত চাওয়া, তা বুঝতে সাহায্য করে।
অর্থাৎ, লাগোম মানুষকে সবকিছু ছেড়ে দিতে বলে না; বরং কোনটি প্রয়োজন আর কোনটি কেবল অতিরিক্ত চাওয়া, তা বুঝতে সাহায্য করে।
নিজের পাশাপাশি অন্যের প্রয়োজনও গুরুত্বপূর্ণ
লাগোম শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সংযমের শিক্ষা দেয় না, অন্যদের প্রতি দায়িত্বশীল হতেও উৎসাহিত করে। নিজের সুবিধা নিশ্চিত করতে গিয়ে অন্য কেউ বঞ্চিত হচ্ছেন কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা এই দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
যেমন, পরিবারের সবাই মিলে খাবার খাওয়ার সময় প্রত্যেকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার নিলে সবার জন্য পর্যাপ্ত খাবার থাকে। কিন্তু একজন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নিয়ে নিলে অন্যদের জন্য খাবার কমে যেতে পারে। তাই নিজের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অন্যের প্রয়োজনের প্রতিও নজর রাখা জরুরি।
এই চিন্তা দৈনন্দিন জীবনেও কাজে লাগানো যায়। পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খাবার ব্যবহারে সচেতন হলে অপচয় কমে। কল খোলা না রাখা, অপ্রয়োজনে বাতি জ্বালিয়ে না রাখা কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার না নেওয়ার মতো ছোট অভ্যাস ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের জন্য উপকারী।
বেশি সম্পদ মানেই কি বেশি আনন্দ?
নতুন কিছু কেনা কিংবা দীর্ঘদিনের কোনো ইচ্ছা পূরণ হলে স্বাভাবিকভাবেই আনন্দ হয়। তবে সেই আনন্দ সব সময় স্থায়ী হয় না। কিছুদিন পর নতুন জিনিসটির প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে। তখন আবার অন্য কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। এভাবে একের পর এক চাহিদা বাড়তে থাকলে সন্তুষ্টি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ধরা যাক, কারও একটি ভালো মোটরসাইকেল রয়েছে। সেটি দিয়ে তিনি নিয়মিত যাতায়াত করেন এবং বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যান। কিন্তু অন্য কারও আরও দামি মোটরসাইকেল দেখে নিজেরটিকে ছোট মনে হতে শুরু করল। ফলে আগের জিনিসটি থাকা সত্ত্বেও তার আনন্দ কমে গেল। অথচ মোটরসাইকেলটির কার্যকারিতা বা মান বদলায়নি, বদলেছে নিজের সঙ্গে অন্যের তুলনা করার অভ্যাস।
লাগোম শেখায়, অন্যের সম্পদ কিংবা জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজের জীবনকে মেলানোর পরিবর্তে নিজের প্রাপ্তিগুলোর মূল্য বুঝতে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করা, বই পড়া কিংবা বিকেলে হাঁটতে বের হওয়ার মতো সাধারণ কাজেও আনন্দ পাওয়া যায়।
তবে এই দর্শনের অর্থ উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করা নয়। নতুন দক্ষতা অর্জন, পেশাগত উন্নতি কিংবা আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করাও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রয়োজন হলো, এগিয়ে যাওয়ার পথে নিজের স্বাস্থ্য, সম্পর্ক ও মানসিক প্রশান্তিকে অবহেলা না করা।
দৈনন্দিন জীবনে যেভাবে চর্চা করবেন লাগোম
লাগোমের অভ্যাস গড়ে তুলতে জীবনযাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের কিছু সিদ্ধান্তেই এর চর্চা করা সম্ভব।
কেনাকাটায় সচেতনতা: নতুন কিছু কেনার আগে ভাবুন, জিনিসটি সত্যিই প্রয়োজন কি না। পুরোনো জিনিসটি ভালো থাকলে সেটি আরও কিছুদিন ব্যবহার করুন। এতে খরচ কমবে এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিস জমে থাকবে না।
কাজ ও বিশ্রামের ভারসাম্য: সারাক্ষণ কাজ করলেই যে ভালো ফল পাওয়া যাবে, তা নয়। আবার দায়িত্ব এড়িয়ে চলাও সমাধান নয়। কাজের পাশাপাশি বিরতি, পর্যাপ্ত ঘুম এবং পরিবারের জন্য সময় রাখুন।
সামর্থ্য অনুযায়ী জীবনযাপন: অন্যের জীবনযাত্রা দেখে নিজের সামর্থ্যের বাইরে খরচ করার প্রয়োজন নেই। আয় ও প্রয়োজনের সঙ্গে মিল রেখে খরচের পরিকল্পনা করলে আর্থিক চাপ কমানো সহজ হয়।
ছোট আনন্দকে গুরুত্ব দেওয়া: জীবনের আনন্দ কেবল বড় অর্জনের জন্য জমিয়ে না রেখে প্রতিদিনের ছোট ছোট মুহূর্ত উপভোগ করুন। প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা পছন্দের কাজ করার মধ্যেও প্রশান্তি পাওয়া সম্ভব।
নিজের সঙ্গে অন্যের তুলনা কমানো: প্রত্যেক মানুষের সুযোগ, সামর্থ্য ও পরিস্থিতি আলাদা। অন্যের সাফল্য থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া ভালো, কিন্তু তার সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করে নিজের অর্জনকে ছোট করে দেখা উচিত নয়।
সবকিছু পাওয়াই জীবনের লক্ষ্য নয়
লাগোমের মূল কথা হলো, জীবনে কত বেশি অর্জন করা গেল, শুধু তা দিয়ে সাফল্য নির্ধারণ করা যায় না। কখন নিজের চাহিদায় সীমা টানতে হবে, কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে এবং প্রাপ্ত সম্পদের সঠিক ব্যবহার কীভাবে করতে হবে—এসব বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের প্রয়োজন পূরণ করা, অন্যের কথা বিবেচনায় রাখা, অপচয় কমানো এবং জীবনের সাধারণ মুহূর্তগুলো উপভোগ করার মধ্য দিয়ে এই দর্শন চর্চা করা যায়।
সব ইচ্ছা পূরণ না হলেও জীবন সুন্দর হতে পারে। কারণ সুখের জন্য সবকিছু থাকা জরুরি নয়; বরং যা আছে, তার মূল্য বুঝতে পারা এবং প্রয়োজন ও প্রাপ্তির মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নেওয়াই হতে পারে সন্তুষ্ট জীবনের অন্যতম চাবিকাঠি।
সূত্র: ভোগ ম্যাগাজিন, বিগ থিঙ্ক ও ভিজিট সুইডেন।


মতামত