বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন কিছু ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের সমগ্র জীবনকথা যেকোনো উপন্যাস বা নাটকীয় রোমাঞ্চকেও হার মানায়। রাজনীতি ও সমাজসেবার কণ্টকাকীর্ণ পথে হেঁটে বহু নেতা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু নিশ্চিত কারাদণ্ড ও দীর্ঘ প্রবাস জীবনের ভয়াল অন্ধকারের সীমানা পেরিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। তেমনি এক অবিসংবাদিত ও সংগ্রামী রাজনৈতিক চরিত্র হলেন কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ—যিনি বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কুমিল্লা জেলার মুরাদনগরের মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন জননেতা নন, বরং তাদের সুখ-দুঃখের বিশ্বস্ত অভিভাবক। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বারবার অন্যায় ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হলেও তিনি জনতার ভালোবাসা থেকে বিচ্যুত হননি। কারাগারের দোরগোড়া ও ফাঁসির মঞ্চের ভয়াবহ আশঙ্কা থেকে যেভাবে তিনি রাজকীয় বেশে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পদে আসীন হলেন, তা আজকের যুগে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের জন্ম ১৯৫৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম কাজী পরিবারে। দ্বীনে এলেম প্রখ্যাত কাজী নোমান আহমেদ তার পিতা, এবং ছৈয়দা রশিদা বেগম তার মাতা। তাঁর পারিবারিক পটভূমি ছিল দ্বীনি শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা ও জনকল্যাণমুখী ভাবধারায় সমৃদ্ধ। শৈশব ও কৈশোর থেকেই তিনি ধার্মিক, সৎ এবং অতিসাধারণ মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতির অধিকারী ছিলেন।
স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার সময় থেকেই সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধান ও সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তাঁর নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে। মুরাদনগরের শিক্ষা বিস্তার, মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা এবং তৎকালীন অবহেলিত অবকাঠামোগত উন্নয়নে তরুণ কায়কোবাদ অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর এই নিঃস্বার্থ সমাজসেবা পরবর্তীতে তাঁকে প্রত্যক্ষ রাজনীতির দিকে ধাবিত করে।
কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের রাজনৈতিক সাফল্যের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো জনগণ। জাতীয় সংসদের আসন কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) থেকে তিনি পাঁচবার বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে, যেখানে কোনো বড় রাজনৈতিক দলের নামীয় প্রতীক না থাকা সত্ত্বেও কেবল ব্যক্তি জনপ্রিয়তা ও তৃণমূলের ভালোবাসার জোরে তিনি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেন।
পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন এবং দলের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে কেন্দ্র থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত শক্তিশালী নেতৃত্ব দান করেন। মুরাদনগরের প্রতিটি গ্রাম ও জনপদে রাস্তাঘাট নির্মাণ, সেতু স্থাপন, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, ধর্মীয় উপাসনালয় সংস্কার এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুব্যবস্থা করার মাধ্যমে তিনি মুরাদনগরকে আধুনিক রূপ দান করেন। জনগণের আস্থা ও ভালোবাসাই তাঁকে রাজনৈতিক জীবনের কঠোর ঝড়ঝাপটায় টিকিয়ে রেখেছিল।
“রাজনীতি আমার কাছে কেবল ক্ষমতা অর্জনের উপায় নয়, রাজনীতি হলো নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধাচরণ করার একটি পবিত্র ইবাদত।”
কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ
কায়কোবাদের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়ের সূচনা হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের জনসভায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ গ্রেনেড হামলাকে কেন্দ্র করে। পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর, বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের দমন করার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কায়কোবাদকে এই মামলায় অন্যতম আসামি করা হয়।
বিচারিক আদালতের রায়ে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর দণ্ডাদেশ প্রদান করা হয়, যার মধ্যে ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও নিশ্চিত জেল জীবন। এক সময়ের দাপুটে ও জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধিকে রাতারাতি ফেরারি ও অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। জীবন বাঁচানো, শারীরিক চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে তাঁকে দীর্ঘ সময় প্রবাসে একাকী নির্বাসিত ও আত্মগোপনে থাকতে হয়। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি নিজের প্রিয় মাতৃভূমি, মুরাদনগরের জনগণ এবং পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক দুঃসহ জীবন যাপন করেন। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ মায়ের মৃত্যুতেও জননীর মুখ দেখতে পারেননি তিনি। মায়ের জানাজায় তার বুক ভাঙ্গা কান্নার শব্দ সেদিন আল্লাহর আসমান আরশে পৌছেছিলো। কায়কোবাদ সবর ধরেছিলেন সেদিন।
সত্য ও ন্যায়বিচার চিরকাল চাপা থাকে না—কায়কোবাদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্ষমতার আমূল পরিবর্তন ঘটে এবং বিগত সরকারের রাজনৈতিক নিপীড়নের অবসান ঘটে। পুনর্গঠিত বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থার আওতায় উচ্চ আদালতে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
দীর্ঘ পর্যালোচনার পর মহামান্য হাইকোর্ট কায়কোবাদের বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে রায় দেন এবং তাঁকে সম্পূর্ণ খালাস ও নিরপরাধ বলে ঘোষণা করেন। আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পাপ প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি প্রবাসের নির্বাসিত জীবন শেষ করে স্বদেশে পা রাখেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুরু করে কুমিল্লা ও মুরাদনগরে লাখো জনতার উপচে পড়া ভিড় ও পুষ্পবৃষ্টির মাধ্যমে তাঁকে রাজকীয় সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
আইনি লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার পর এবং দেশের নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেন বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিশ্চিত কারাদণ্ডের ভয়াবহ পরিণতি কাটিয়ে উঠে সরাসরি ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদায় আসীন হওয়া তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সহনশীলতা ও ধৈর্যের এক অভাবনীয় স্বীকৃতি।
• হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনয়ন এবং হজযাত্রীদের ভোগান্তি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য সম্পূর্ণরূপে দূর করা।
• অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি সুদৃঢ় করা।
• ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নানামুখী সংস্কার, নৈতিক শিক্ষা প্রসার এবং ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সামাজিকভাবে মর্যাদা ও ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ।
• জাতীয় ওয়াকফ সম্পত্তি পুনরুদ্ধার, সঠিক পরিচালনা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের অবকাঠামোগত সুষম উন্নয়ন সুনিশ্চিত করা।
সত্যের জয় সার্বজনীন। রাজনৈতিক জীবনের তুঙ্গ থেকে নিশ্চিত কারাবাস ও আত্মগোপনের চরম অন্ধকার—এবং পরবর্তীতে সত্যের আলোয় মুক্ত হয়ে রাষ্ট্রীয় মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। কায়কোবাদের এই মহাকাব্যিক পথচলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেবল এক রাজনীতিবিদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নয়, বরং অন্যায়ের সামনে নতি স্বীকার না করার এক চিরন্তন প্রেরণা।
লেখকঃ
এ এইচ শুভ
সাংবাদিক, সিএনবিসি
মতামত