তিন বছর পর আবারও আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য আলোচনায় বসছে বাংলাদেশ ও ভারত। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ও শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১৬তম বাংলাদেশ-ভারত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ট্রেডের (জেডব্লিউজি) বৈঠক।
দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েনের মধ্যেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সচল রাখা, আমদানি-রপ্তানির বাধা কমানো এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়গুলো এবারের বৈঠকে গুরুত্ব পেতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নিচ্ছে। এর আগে ২০২৩ সালের ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ১৫তম জেডব্লিউজি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই বৈঠকে বন্দর ব্যবহারের বিধিনিষেধ, পণ্য সরবরাহ, পণ্যের মান নির্ধারণ ও পারস্পরিক স্বীকৃতি, সড়ক-রেল যোগাযোগ এবং প্রস্তাবিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) নিয়ে আলোচনা হয়।
এবারের আলোচনায় বাংলাদেশের পাটপণ্যের ওপর ভারতের নতুন অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা জুট ইয়ার্ন বা টুইন, হেসিয়ান ফ্যাব্রিক এবং জুট স্যাকিং ব্যাগের ওপর শুল্ক কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করেছে ভারত।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশে ভারতীয় সুতা আমদানির ক্ষেত্রে থাকা বিধিনিষেধ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। দুই দেশই নিজ নিজ ব্যবসায়ীদের স্বার্থে বাজারসুবিধা বাড়ানো এবং বাণিজ্যিক বাধা কমানোর বিষয়টি তুলতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১০ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ব্যবধান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার।
এই ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করা এবং স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহন সহজ করার বিষয়ে জোর দিতে পারে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে ৩৩৫ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো, স্থলবন্দরগুলোর অবকাঠামো ও সক্ষমতা উন্নয়ন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়গুলোও আলোচনায় আসতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়েই বৈঠকে আলোচনা হবে। বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, আমদানি-রপ্তানির প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং পারস্পরিক বাণিজ্য বাড়ানোর পথ খুঁজে বের করাই বাংলাদেশের অন্যতম লক্ষ্য।
তিন বছর পর জেডব্লিউজি বৈঠক হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে স্থবির থাকা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা সেপা নিয়েও আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
২০২৩ সালের বৈঠকে সেপা চালুর প্রাথমিক প্রস্তুতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক সম্পর্কের ওঠানামা থাকলেও দুই দেশের অর্থনৈতিক নির্ভরতা রয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পের কাঁচামাল, তুলা, সুতা, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে ভারতের ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে বাংলাদেশের জন্য ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার।
তাই রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া উভয় দেশের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মতামত