আনোয়ার মুরাদ।
প্রকাশিত: ১ অক্টোবর ২০২৬, ০০:১১ BST সর্বশেষ আপডেট: ১২ মিনিট আগে
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ক্রিস্টা পাইককে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দুটি চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময়ই তা বন্ধ করার জন্য জরুরি আবেদন দাখিল করেন পাইকের আইনজীবীরা। আবেদনে তাঁরা বলেন, “মিস পাইক অচেতন হয়ে পড়েছেন, কিন্তু তাঁর হৃদস্পন্দন এখনও চলছে এবং তাঁর নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে।”
পাইকের একজন আইনজীবী বিবিসিকে জানান, ৫০ বছর বয়সী পাইককে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর জীবন রক্ষার জন্য চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর আগে তাঁকে পেন্টোবারবিটাল নামের ওষুধের দুটি সিরিঞ্জের ডোজ দেওয়া হয়েছিল।
১৯ বছর বয়সী কোলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে ১৯৯৬ সালে পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আইনি লড়াইয়ের মধ্যে ছিল।
শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমতি দেন।
১৯৯৫ সালে হত্যাকাণ্ডের সময় পাইকের বয়স ছিল ১৮ বছর। তিনি এবং তাঁর তৎকালীন প্রেমিক টাডারিল শিপ একটি সমস্যাগ্রস্ত কিশোর-কিশোরীদের প্রশিক্ষণ শিবিরে ১৯ বছর বয়সী স্লেমারের সঙ্গে পরিচিত হন। পরে তাঁরা স্লেমারকে মারধর ও নির্যাতনের পর হত্যা করেন।
স্লেমারের মা মে মার্টিনেজও পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পক্ষে ছিলেন। বুধবার সন্ধ্যার ঘটনার পর এনবিসি নিউজকে তিনি বলেন, “এটি ছিল একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।”
স্থানীয় সময় বুধবার রাত প্রায় ২০টার দিকে (বৃহস্পতিবার ০১:০০ GMT) ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয়।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাইককে পেন্টোবারবিটালের দুটি ডোজ দেওয়া হয় এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের কক্ষের পর্দা দুবার বন্ধ করা হয়।
একপর্যায়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সেখান থেকে চলে যেতে বলা হয় বলেও জানিয়েছে এপি।
এপি আরও জানায়, টেনেসির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নীতিমালায় বলা আছে, প্রথম দফার ওষুধ দেওয়ার পরও আসামির মৃত্যু না হলে ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত সিরিঞ্জের একটি সেট প্রস্তুত রাখতে হবে। তবে দ্বিতীয় দফার ওষুধ দেওয়ার পরও আসামি জীবিত থাকলে কী করতে হবে, তা নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই
টেনেসি গভর্নরের তদন্তের নির্দেশযুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে টেনেসির গভর্নর বিল লি বলেন, কী ঘটেছে তা নির্ধারণের জন্য তিনি একটি “ব্যাপক ও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত পর্যালোচনা” করার নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, চলতি বছরের সর্বশেষ নির্ধারিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কর্মসূচি আর এগিয়ে নেওয়া হবে না।
২০২৬ সালে টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা পরিকল্পনামতো না হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ১৯৯৪ সালে তিনজনকে অপহরণ ও হত্যার দায়ে দণ্ডিত টনি কারুথার্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা মে মাসে স্থগিত করা হয়েছিল। সে সময় প্রাণঘাতী ওষুধ দেওয়ার জন্য তাঁর শরীরে উপযুক্ত শিরা খুঁজে পেতে কর্মীরা ব্যর্থ হন।
টেনেসি সংশোধন বিভাগ জানিয়েছে, পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টায় তারা গৃহীত পদক্ষেপগুলোর পক্ষে রয়েছে।
টেনেসিয়ান সংবাদপত্রকে দেওয়া এক বক্তব্যে বিভাগের মুখপাত্র ডোরিন্ডা কার্টার বলেন, “টেনেসি সংশোধন বিভাগ অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় অনুমোদিত অঙ্গরাজ্যের আইনসম্মত ও প্রতিষ্ঠিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নীতিমালার প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “নীতিমালায় ব্যবহৃত প্রাণঘাতী রাসায়নিকটি ধারাবাহিকভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এই নীতিমালায় আজ সন্ধ্যায় যা করা হয়েছে, তার বাইরে অতিরিক্ত কোনো প্রক্রিয়ার অনুমতি নেই। ক্রিস্টা পাইককে অঙ্গরাজ্যের বাইরে একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।”
ছবির ক্যাপশন: ১৯৯৫ সালের হত্যাকাণ্ডে নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত কোলিন স্লেমার। ছবি: পরিবারের দেওয়া।
পাইকের আইনজীবীদের অভিযোগ
পাইকের আইনজীবীরা টেনেসিয়ান সংবাদপত্রকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, “আজ রাতে টেনেসি অঙ্গরাজ্য আবারও আইনসম্মতভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে।”
তাঁরা আরও বলেন, “আমাদের আশঙ্কা যে সত্যি প্রমাণিত হয়েছে, তাতে আমরা আনন্দিত নই। আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলাম, সেগুলো বাস্তবেই ঘটেছে—শিরায় ওষুধ প্রবেশ করানোর ক্ষেত্রে সমস্যা, শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, মেয়াদ বা কার্যকারিতা কমে যাওয়া পেন্টোবারবিটাল এবং পরিস্থিতি খারাপ হলে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকা। এসবই ঘটেছে এমন একটি নীতিমালার অধীনে, যা এখনও গোপনীয়তার আড়ালে রয়েছে।”
প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দিলে পাইকের আইনজীবীরা তা স্থগিত করা এবং তাঁকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য জরুরি আবেদন করেন।
জেলা বিচারক ক্লিফটন এল. কর্কার এক আদেশে উল্লেখ করেন, “আবেদনে অনুরোধ করা অনুযায়ী চিকিৎসাকর্মীরা চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেছেন।”
এমরি ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক ডা. জোয়েল জিভট পাইকের আইনজীবীদের নিয়োগ করা একজন চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ। তিনি বিবিসিকে বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টার সময় পাইকের রক্তে পেন্টোবারবিটালের মাত্রা সম্ভবত এতটা বাড়েনি, যাতে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
একটি ইমেইলে জিভট বলেন, “পুনরুজ্জীবিত করার প্রক্রিয়া শুরু করতে দেরি হওয়ার ফলে তাঁর মস্তিষ্কে ক্ষতি হয়ে যাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।”
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আইনি লড়াই
পাইকের আইনজীবীদের একাধিক শেষ মুহূর্তের আইনি চ্যালেঞ্জ ব্যর্থ হওয়ার পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার দুটি পৃথক আবেদন নাকচ করেছিলেন।
বুধবার রাতে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের দেওয়া স্থগিতাদেশ বাতিল করেন। নিম্ন আদালত এর আগে পাইকের মামলার যুক্তিগুলো বিবেচনা করার জন্য আরও সময় প্রয়োজন বলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়েছিলেন।
এর আগে পাইকের আইনজীবীদের করা আরেকটি আবেদনও সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, ১৯৯৬ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সময় বিচারকদের প্যানেল পাইকের শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার নথিভুক্ত ইতিহাসের মতো সাজা কমানোর পক্ষে প্রাসঙ্গিক তথ্য বিবেচনা করার সুযোগ পায়নি।
প্রতিরক্ষা আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বহু বছর ধরে টেনেসি অঙ্গরাজ্য আদালতে দাবি করে এসেছে যে পাইক শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়ে মিথ্যা বলেছিলেন।
কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে সাম্প্রতিক এক শুনানিতে অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, পাইক যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন—এ বিষয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
এ সপ্তাহে টেনেসির গভর্নর পাইকের ক্ষমার আবেদনও নাকচ করেন। অঙ্গরাজ্যটির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের মধ্যে পাইকই একমাত্র নারী।
ছবির ক্যাপশন: ২০০৬ সালে সাজা-পরবর্তী শুনানির সময় আদালতের বাইরে কোলিন স্লেমারের মা মে মার্টিনেজ এবং নক্সভিল পুলিশ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এক গোয়েন্দা। ছবি: জে. মাইলস ক্যারি/ইউএসএ টুডে/ইম্যাগন ইমেজেস, রয়টার্সের মাধ্যমে।
পাইকের ক্ষমার আবেদনে কী বলা হয়েছিল?
ক্ষমার আবেদনে পাইক বলেন, তিনি স্লেমারকে মারধর করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁকে হত্যা করার উদ্দেশ্য ছিল না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন।
নিজের এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমি তখন মানসিকভাবে অসুস্থ ১৮ বছর বয়সী একজন কিশোরী ছিলাম। আমি যা করেছিলাম, তার ভয়াবহতা বুঝতে আমার বহু বছর লেগেছে। আমার কাজের ফলে কত মানুষের জীবন প্রভাবিত হয়েছে, তা মেনে নিতেও আরও বেশি সময় লেগেছে। আমি কারও সন্তান, বোন ও বন্ধুর জীবন কেড়ে নিয়েছি। এখন ভাবলেও অসুস্থ বোধ করি যে আমি এমন অপরাধ করতে পেরেছিলাম।”
১৯৯৫ সালের এই হত্যাকাণ্ডের পর টেনেসির নক্সভিলে ব্যাপক সংবাদমাধ্যমের আগ্রহ তৈরি হয়। হত্যার পর স্লেমারের বুকে উল্টো পেন্টাগ্রাম—যে প্রতীকটি শয়তানপূজার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে পরিচিত—খোদাই করা অবস্থায় তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। পাইক নিজে ওই প্রতীকটি খোদাই করার কথা অস্বীকার করেছেন।
হত্যাকাণ্ডের আগে পাইক অভিযোগ করেছিলেন, স্লেমার তাঁকে অপমান করেছেন এবং তাঁর তৎকালীন প্রেমিককে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছেন।
প্রশিক্ষণ শিবিরের আরও দুই বাসিন্দা পরে আদালতে সাক্ষ্য দেন যে পাইক হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে এ বিষয়ে বড়াই করেছিলেন এবং তাঁদের স্লেমারের মাথার খুলির একটি অংশ দেখিয়েছিলেন।
পাইকের প্রেমিক ও সহ-আসামি শিপের বয়স তখন ছিল ১৭ বছর। অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী, ওই বয়সে সংঘটিত অপরাধের জন্য তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়নি। তিনি এখনও কারাগারে রয়েছেন।
স্লেমারের মা মে মার্টিনেজ সপ্তাহান্তে বলেছিলেন, পাইকের সাজা কার্যকর হতে দেখার জন্য তিনি কয়েক দশক ধরে অপেক্ষা করেছেন।
তিনি এপিকে জানান, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সাক্ষী হতে ফ্লোরিডা থেকে টেনেসি যাওয়ার জন্য একটি দল তাঁকে ও তাঁর স্বামীকে অর্থ সংগ্রহ করে দিয়েছিল।
মার্টিনেজ বলেন, “এমন কোনো দিন যায় না, এমনকি এমন কোনো মিনিটও যায় না, যখন আমি কোলিনের কথা ভাবি না। ছুটির দিনগুলো সবচেয়ে কষ্টের।”
১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড পুনরায় চালু করার পর থেকে দেশটিতে মাত্র ১৮ জন নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। একই সময়ে পুরুষদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে ১ হাজার ৬৬৩ জনের। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর হওয়া মোট মৃত্যুদণ্ডের প্রায় ১ শতাংশই নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
মতামত