ধর্ষণ মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ফিরোজুল ইসলাম ফিরোজ জামিনে মুক্ত হয়ে মামলার বাদীকে ‘বিচার’ করার হুমকি দিয়েছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে। তার একটি বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ফিরোজুল ইসলাম নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি। ১৫ বছর বয়সী এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে বিদ্যালয় থেকে তুলে নিয়ে আটকে রেখে ধর্ষণের মামলায় আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। একই মামলায় অপহরণের ধারায় তাকে আরও ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
জানা গেছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশে মঙ্গলবার রাতে রাজশাহী কারাগার থেকে জামিনে বের হন ফিরোজ। পরে সমর্থকদের নিয়ে নাজিরপুর এলাকায় একটি সভায় বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি দুর্নীতি ও নিজের বিরুদ্ধে করা মামলা নিয়ে কথা বলেন এবং ‘নাজিরপুরের মাটিতেই বিচার হবে’ বলে মন্তব্য করেন। তবে কাকে উদ্দেশ্য করে তিনি এমন বক্তব্য দিয়েছেন, তা স্পষ্ট করেননি।
এদিকে মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা অভিযোগ করেছেন, জামিনে বের হওয়ার পর ফিরোজ তাকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। তার দাবি, এ ঘটনায় তিনি থানায় বিষয়টি জানিয়েছেন এবং পরিবার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাজশাহী কারাগারের প্রধান ফটক থেকে দুই শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে সমর্থকেরা ফুলের মালা দিয়ে ফিরোজকে বরণ করেন। পরে রাতে নাজিরপুরে কয়েকশ মানুষের উপস্থিতিতে সমাবেশ করেন তিনি। ওই সমাবেশের বক্তব্যের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনা শুরু হয়।
মামলার সরকারি কৌঁসুলি মুন্সি আবুল কালাম আজাদ জানান, ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ফিরোজকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পাশাপাশি অপহরণের ধারায় দেওয়া হয় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। তবে আপিলের পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে জামিন পেয়ে কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন তিনি।
ভুক্তভোগীর বাবা বলেন, মামলা করার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে ফিরোজ ও তার লোকজন তাদের ভয়ভীতি দেখিয়েছেন এবং অর্থের বিনিময়ে আপস করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। তবে তারা মামলা চালিয়ে যান। আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট থাকলেও ফিরোজ জামিনে মুক্ত হওয়ার পর নতুন করে নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১ অক্টোবর এসএসসির ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে বিদ্যালয়ে গেলে ফটকের সামনে থেকে ওই ছাত্রীকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে প্রধান শিক্ষক ফিরোজের বিরুদ্ধে। পরে তাকে রাজশাহীর একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর ভুক্তভোগীর বাবা ফিরোজ ও তার দুই ভাইকে আসামি করে গুরুদাসপুর থানায় মামলা করেন। একই বছরের ১১ অক্টোবর রাতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের একটি আবাসিক হোটেল থেকে র্যাব-৫ তাকে গ্রেপ্তার করে।
সরকারি কৌঁসুলি জানান, পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং ঘটনার ভিডিও পর্যালোচনায় ফিরোজের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও অপহরণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মলহিদুজ্জামান মুহিত রায় ঘোষণা করেন। মামলার অপর দুই আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
এদিকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও বাদীকে হুমকির অভিযোগের বিষয়ে ফিরোজুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
গুরুদাসপুর থানার ওসি আব্দুল হান্নান বলেন, ধর্ষণ মামলার বাদীকে হুমকি দেওয়ার বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মতামত