বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩
Bangla FM

পিতৃপক্ষ:শিকড়ের কাছে ফেরার পবিত্র আহ্বান


সত্যজিৎ দাস
সত্যজিৎ দাস জেলা প্রতিনিধি
| ফটো কার্ড

পিতৃপক্ষ:শিকড়ের কাছে ফেরার পবিত্র আহ্বান
ছবি: সংগৃহীত

মানুষ যতই আধুনিক হোক,যতই প্রযুক্তির আলোয় নিজের চারপাশ বদলে ফেলুক, তার অস্তিত্বের শিকড় কিন্তু পড়ে থাকে অতীতের গভীরে। সেই শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাবা-মা,দাদা-দাদি, নানা-নানি,পিতামহ-প্রপিতামহসহ অসংখ্য পূর্বপুরুষের স্মৃতি,ত্যাগ ও উত্তরাধিকার।

সনাতন ধর্মের পিতৃপক্ষ সেই শিকড়ের কাছেই ফিরে যাওয়ার একটি পবিত্র সময়। এটি শুধু প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে জল ও অন্ন নিবেদনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং নিজের অস্তিত্বের উৎসকে স্মরণ করা, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব উপলব্ধি করার এক আধ্যাত্মিক অনুশীলন।

প্রতি বছর পিতৃপক্ষ এলে তাই প্রশ্নটি সামনে আসে-আমরা কি শুধু প্রয়াতদের স্মরণ করি,নাকি তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবোধও ধারণ করি?

সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে মানুষের জীবনে পিতৃঋণের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। যে জীবন আমরা পেয়েছি,যে পরিবার, সংস্কার ও ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করছি,তার পেছনে রয়েছে পূর্ববর্তী প্রজন্মের অবদান।

এই কারণেই পিতৃপক্ষে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ,শ্রাদ্ধ,পিণ্ডদান,অন্নদান ও প্রার্থনার বিধান প্রচলিত হয়েছে।

২০২৬ সালের পিতৃপক্ষ ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত পালিত হবে। বিভিন্ন পঞ্জিকা ও আঞ্চলিক রীতিতে তিথি নির্ধারণে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে। পিতৃপক্ষের শেষ তিথি সর্বপিতৃ অমাবস্যা, যা মহালয়া অমাবস্যা হিসেবেও পরিচিত।

যাঁদের পূর্বপুরুষের মৃত্যুতিথি জানা আছে, তাঁরা সংশ্লিষ্ট তিথিতে শ্রাদ্ধ ও তর্পণ করেন। আর মৃত্যুতিথি জানা না থাকলে সর্বপিতৃ অমাবস্যায় পিতৃকর্ম করার প্রচলন রয়েছে।

পিতৃপক্ষের তাৎপর্য বোঝাতে মহাভারতের কর্ণকে ঘিরে একটি বহুল প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি বলা হয়।

কাহিনি অনুযায়ী,দানবীর কর্ণ মৃত্যুর পর স্বর্গে গিয়ে অন্নের পরিবর্তে স্বর্ণ ও রত্ন লাভ করেন। কারণ জীবিত অবস্থায় তিনি বিপুল দান করলেও পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল নিবেদন করেননি।

বিষয়টি জানতে পেরে কর্ণ পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল দেওয়ার সুযোগ প্রার্থনা করেন। এই আখ্যানের মধ্য দিয়ে যে শিক্ষা সামনে আসে তা হলো,মানুষের কর্তব্য শুধু জীবিত মানুষের প্রতি দান বা কল্যাণে সীমাবদ্ধ নয়;নিজের পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও ধর্মীয় জীবনের একটি অংশ।

কর্ণের এই কাহিনি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, পৌরাণিক আখ্যান। কিন্তু এর নৈতিক শিক্ষা আজও সনাতন সমাজে পিতৃপক্ষের তাৎপর্য ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ।

পিতৃপক্ষের সবচেয়ে পরিচিত আচার হলো তর্পণ। কুশ,তিল ও পবিত্র জল ব্যবহার করে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করা হয়।

বাহ্যিকভাবে এটি অতি সাধারণ একটি আচার। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত ভাব অনেক গভীর। দুই হাতের অঞ্জলি থেকে যখন জল মাটিতে পড়ে,তখন একজন মানুষ যেন প্রতীকীভাবে বলে ওঠেন-‘যাঁদের কারণে আমি আজ পৃথিবীতে,তাঁদের আমি ভুলিনি।’

শাস্ত্রীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে তিথি, সময় ও পদ্ধতি নিয়ে পঞ্জিকা ও পারিবারিক পরম্পরা অনুযায়ী পার্থক্য থাকতে পারে। তাই নির্দিষ্ট শ্রাদ্ধ বা তর্পণের ক্ষেত্রে স্থানীয় পুরোহিত বা আচারজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া শ্রেয়।

পূর্বপুরুষের নির্দিষ্ট তিথিতে শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানের প্রচলন সনাতন ধর্মীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গয়া, কাশী,হরিদ্বার,প্রয়াগরাজসহ বিভিন্ন তীর্থে পিতৃকর্ম করার ঐতিহ্যও রয়েছে।

তবে পিতৃকর্মের মূল উদ্দেশ্য জাঁকজমক নয়। সামর্থ্য অনুযায়ী আন্তরিকতার সঙ্গে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করাই এর প্রধান বিষয়।

অর্থের সামর্থ্য বেশি হলে বড় আয়োজন হতে পারে,কম হলে সামান্য জল ও তিল দিয়েও ভক্তিভরে স্মরণ করা যায়। ধর্মীয় আচারের সৌন্দর্য অনেক সময় আয়োজনের পরিমাণে নয়,অন্তরের শ্রদ্ধায় প্রকাশ পায়।

পিতৃপক্ষে অন্নদান বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। শ্রাদ্ধের সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলে দেবতা, মানুষ,গরু,কুকুর ও কাকের উদ্দেশ্যে খাদ্য নিবেদনের পঞ্চবলি প্রথাও প্রচলিত।

কাককে অন্ন দেওয়ার সঙ্গে পূর্বপুরুষদের নিয়ে নানা লোকবিশ্বাস রয়েছে। তবে এই আচারকে আরও বিস্তৃত মানবিক অর্থেও দেখা যায়। ক্ষুধার্ত মানুষকে অন্ন দেওয়া, অসহায়কে সাহায্য করা এবং প্রাণীর প্রতি মমতা দেখানো পিতৃপক্ষের করুণাবোধকে বাস্তব জীবনে প্রকাশ করার একটি পথ।

অর্থাৎ পিতৃপক্ষ শুধু ‘পূর্বপুরুষের জন্য’ কিছু করার সময় নয়;তাঁদের স্মরণে ‘অন্যের জন্য’ কিছু করারও সময়।

পিতৃপক্ষকে বহু পরিবার সংযমের সময় হিসেবে পালন করে। নিরামিষ আহার, নেশা পরিহার,পরিমিত জীবনযাপন, অপ্রয়োজনীয় ভোগ থেকে দূরে থাকা এবং প্রার্থনায় মনোনিবেশ করার রীতি রয়েছে।

তবে সব সনাতনী পরিবারে খাদ্যসংক্রান্ত বিধি এক নয়। কোথাও পেঁয়াজ-রসুন বা নির্দিষ্ট কিছু খাবার বর্জন করা হয়, কোথাও আবার ভিন্ন রীতি অনুসরণ করা হয়। তাই কোনো একটি পারিবারিক রীতিকে সর্বজনীন শাস্ত্রবিধি হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

পিতৃপক্ষের আসল সংযম শুধু খাদ্যে নয়। ক্রোধ সংযত করা,মিথ্যা থেকে দূরে থাকা, অন্যকে কষ্ট না দেওয়া এবং নিজের আচরণকে শুদ্ধ করার চেষ্টাও এই সময়ের সাধনার অংশ হতে পারে।

‘পিতৃদোষ’ শব্দটি মূলত জ্যোতিষশাস্ত্র ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। জ্যোতিষীয় মত অনুযায়ী,জন্মকুণ্ডলীতে পিতৃদোষ থাকলে জীবনে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে বলে মনে করা হয়।

তর্পণ,শ্রাদ্ধ,পিণ্ডদান,অন্নদান,পূর্বপুরুষের স্মরণ ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে পিতৃদোষের প্রতিকার করা যায় বলে জ্যোতিষীয় পরম্পরায় বলা হয়।

তবে এসব দাবিকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কারণ-ফল হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই। এগুলো ধর্মীয় ও জ্যোতিষীয় বিশ্বাসের পরিসরের বিষয়। একজন ধর্মবিশ্বাসী মানুষ চাইলে নিজস্ব বিশ্বাস ও পারিবারিক পরম্পরা অনুযায়ী এসব আচার পালন করতে পারেন।

সনাতন আধ্যাত্মিকতায় ভগবান শিব মুক্তি, সংযম ও চেতনার প্রতীক। তাই পিতৃপক্ষে অনেক ভক্ত মহাদেবের আরাধনা করেন।

শিবলিঙ্গে জল বা গঙ্গাজল নিবেদন,‘ওঁ নমঃ শিবায়’ জপ,মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র পাঠ কিংবা নীরবে প্রয়াত স্বজনদের জন্য প্রার্থনা করা যেতে পারে।

পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে মহাদেবের কাছে প্রার্থনা হতে পারে খুব সহজ-

‘হে মহাদেব,আমাদের পূর্বপুরুষদের শান্তি দাও। তাঁদের অসম্পূর্ণতা ক্ষমা করো। তাঁদের আশীর্বাদে আমাদের পরিবারকে সত্য,ধর্ম ও মানবিকতার পথে চলার শক্তি দাও।’

এই প্রার্থনার জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও নির্মল মন।

পিতৃপক্ষের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়। আমরা প্রয়াত পূর্বপুরুষদের জন্য তর্পণ করি,শ্রাদ্ধ করি,অন্নদান করি; কিন্তু জীবিত বাবা-মায়ের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কতটা পালন করছি?

একজন বৃদ্ধ বাবা হয়তো একাকী বসে আছেন। একজন মা হয়তো অসুস্থ শরীর নিয়ে সন্তানের অপেক্ষায় আছেন। তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর সময় যদি আমরা না পাই, তাহলে মৃত্যুর পর বিশাল আয়োজন করে শ্রাদ্ধ করাই কি আমাদের দায়িত্বকে সম্পূর্ণ করে?

পিতৃপক্ষ যেন এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা দেয়-জীবিত পিতা-মাতার সেবা এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মানই পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধার সবচেয়ে জীবন্ত প্রকাশ।

তাঁদের সঙ্গে একটু সময় কাটানো, প্রয়োজনের সময় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, তাঁদের কথা মন দিয়ে শোনা কিংবা শুধু পাশে বসে থাকা-এসবও এক ধরনের পিতৃসেবা।

আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে মানুষ অনেক সময় নিজের শিকড় ভুলে যায়। ব্যস্ততার ভিড়ে বাবা-মায়ের জন্য সময় থাকে না,প্রয়াত স্বজনদের স্মৃতি ধীরে ধীরে মুছে যায়,পারিবারিক ইতিহাস হারিয়ে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্মে।পিতৃপক্ষ সেই বিস্মৃতির বিরুদ্ধে একটি নীরব আহ্বান।

এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়-আমরা একা নই। আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে বহু প্রজন্মের জীবন,শ্রম,ত্যাগ ও ভালোবাসা জড়িয়ে আছে। তর্পণের জল তাই শুধু জল নয়। এটি কৃতজ্ঞতার অঞ্জলি।

শ্রাদ্ধের অন্ন শুধু একটি ধর্মীয় নিবেদন নয়। এটি ভাগ করে নেওয়ার শিক্ষা। প্রদীপের আলো শুধু একটি আচার নয়। এটি অন্ধকারের মধ্যে আলোর সন্ধান।

আর পূর্বপুরুষের স্মরণ শুধু অতীতের দিকে তাকানো নয়। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া ভালো মূল্যবোধকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার।

এই পিতৃপক্ষে তাই আসুন,শুধু প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ নয়,জীবিত বাবা-মা ও গুরুজনদের প্রতিও দায়িত্বশীল হই। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই। ক্ষুধার্তকে অন্ন দিই। প্রাণীর প্রতি মমতা দেখাই। নিজের জীবন থেকে অহংকার,হিংসা ও অন্যায়কে যতটা সম্ভব দূরে রাখি।

কারণ পূর্বপুরুষদের শান্তির জন্য করা প্রার্থনা তখনই সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সেই প্রার্থনার আলো আমাদের নিজেদের জীবনেও প্রতিফলিত হয়।

পিতৃপক্ষে সকল প্রয়াত পিতৃপুরুষের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। জীবিত পিতা-মাতা ও গুরুজনদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা।

মহাদেবের চরণে প্রার্থনা-সকলের জীবনে শান্তি,সত্য,মঙ্গল ও মানবিকতার আলো জ্বলে উঠুক। ওঁ পিতৃভ্যঃ স্বধা নমঃ। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পিতৃপক্ষ:শিকড়ের কাছে ফেরার পবিত্র আহ্বান

প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

মানুষ যতই আধুনিক হোক,যতই প্রযুক্তির আলোয় নিজের চারপাশ বদলে ফেলুক, তার অস্তিত্বের শিকড় কিন্তু পড়ে থাকে অতীতের গভীরে। সেই শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাবা-মা,দাদা-দাদি, নানা-নানি,পিতামহ-প্রপিতামহসহ অসংখ্য পূর্বপুরুষের স্মৃতি,ত্যাগ ও উত্তরাধিকার।

সনাতন ধর্মের পিতৃপক্ষ সেই শিকড়ের কাছেই ফিরে যাওয়ার একটি পবিত্র সময়। এটি শুধু প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে জল ও অন্ন নিবেদনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং নিজের অস্তিত্বের উৎসকে স্মরণ করা, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব উপলব্ধি করার এক আধ্যাত্মিক অনুশীলন।

প্রতি বছর পিতৃপক্ষ এলে তাই প্রশ্নটি সামনে আসে-আমরা কি শুধু প্রয়াতদের স্মরণ করি,নাকি তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবোধও ধারণ করি?

সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসে মানুষের জীবনে পিতৃঋণের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। যে জীবন আমরা পেয়েছি,যে পরিবার, সংস্কার ও ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বহন করছি,তার পেছনে রয়েছে পূর্ববর্তী প্রজন্মের অবদান।

এই কারণেই পিতৃপক্ষে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ,শ্রাদ্ধ,পিণ্ডদান,অন্নদান ও প্রার্থনার বিধান প্রচলিত হয়েছে।

২০২৬ সালের পিতৃপক্ষ ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত পালিত হবে। বিভিন্ন পঞ্জিকা ও আঞ্চলিক রীতিতে তিথি নির্ধারণে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে। পিতৃপক্ষের শেষ তিথি সর্বপিতৃ অমাবস্যা, যা মহালয়া অমাবস্যা হিসেবেও পরিচিত।

যাঁদের পূর্বপুরুষের মৃত্যুতিথি জানা আছে, তাঁরা সংশ্লিষ্ট তিথিতে শ্রাদ্ধ ও তর্পণ করেন। আর মৃত্যুতিথি জানা না থাকলে সর্বপিতৃ অমাবস্যায় পিতৃকর্ম করার প্রচলন রয়েছে।

পিতৃপক্ষের তাৎপর্য বোঝাতে মহাভারতের কর্ণকে ঘিরে একটি বহুল প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি বলা হয়।

কাহিনি অনুযায়ী,দানবীর কর্ণ মৃত্যুর পর স্বর্গে গিয়ে অন্নের পরিবর্তে স্বর্ণ ও রত্ন লাভ করেন। কারণ জীবিত অবস্থায় তিনি বিপুল দান করলেও পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল নিবেদন করেননি।

বিষয়টি জানতে পেরে কর্ণ পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল দেওয়ার সুযোগ প্রার্থনা করেন। এই আখ্যানের মধ্য দিয়ে যে শিক্ষা সামনে আসে তা হলো,মানুষের কর্তব্য শুধু জীবিত মানুষের প্রতি দান বা কল্যাণে সীমাবদ্ধ নয়;নিজের পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও ধর্মীয় জীবনের একটি অংশ।

কর্ণের এই কাহিনি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, পৌরাণিক আখ্যান। কিন্তু এর নৈতিক শিক্ষা আজও সনাতন সমাজে পিতৃপক্ষের তাৎপর্য ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ।

পিতৃপক্ষের সবচেয়ে পরিচিত আচার হলো তর্পণ। কুশ,তিল ও পবিত্র জল ব্যবহার করে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করা হয়।

বাহ্যিকভাবে এটি অতি সাধারণ একটি আচার। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত ভাব অনেক গভীর। দুই হাতের অঞ্জলি থেকে যখন জল মাটিতে পড়ে,তখন একজন মানুষ যেন প্রতীকীভাবে বলে ওঠেন-‘যাঁদের কারণে আমি আজ পৃথিবীতে,তাঁদের আমি ভুলিনি।’

শাস্ত্রীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে তিথি, সময় ও পদ্ধতি নিয়ে পঞ্জিকা ও পারিবারিক পরম্পরা অনুযায়ী পার্থক্য থাকতে পারে। তাই নির্দিষ্ট শ্রাদ্ধ বা তর্পণের ক্ষেত্রে স্থানীয় পুরোহিত বা আচারজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া শ্রেয়।

পূর্বপুরুষের নির্দিষ্ট তিথিতে শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানের প্রচলন সনাতন ধর্মীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গয়া, কাশী,হরিদ্বার,প্রয়াগরাজসহ বিভিন্ন তীর্থে পিতৃকর্ম করার ঐতিহ্যও রয়েছে।

তবে পিতৃকর্মের মূল উদ্দেশ্য জাঁকজমক নয়। সামর্থ্য অনুযায়ী আন্তরিকতার সঙ্গে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করাই এর প্রধান বিষয়।

অর্থের সামর্থ্য বেশি হলে বড় আয়োজন হতে পারে,কম হলে সামান্য জল ও তিল দিয়েও ভক্তিভরে স্মরণ করা যায়। ধর্মীয় আচারের সৌন্দর্য অনেক সময় আয়োজনের পরিমাণে নয়,অন্তরের শ্রদ্ধায় প্রকাশ পায়।

পিতৃপক্ষে অন্নদান বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। শ্রাদ্ধের সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলে দেবতা, মানুষ,গরু,কুকুর ও কাকের উদ্দেশ্যে খাদ্য নিবেদনের পঞ্চবলি প্রথাও প্রচলিত।

কাককে অন্ন দেওয়ার সঙ্গে পূর্বপুরুষদের নিয়ে নানা লোকবিশ্বাস রয়েছে। তবে এই আচারকে আরও বিস্তৃত মানবিক অর্থেও দেখা যায়। ক্ষুধার্ত মানুষকে অন্ন দেওয়া, অসহায়কে সাহায্য করা এবং প্রাণীর প্রতি মমতা দেখানো পিতৃপক্ষের করুণাবোধকে বাস্তব জীবনে প্রকাশ করার একটি পথ।

অর্থাৎ পিতৃপক্ষ শুধু ‘পূর্বপুরুষের জন্য’ কিছু করার সময় নয়;তাঁদের স্মরণে ‘অন্যের জন্য’ কিছু করারও সময়।

পিতৃপক্ষকে বহু পরিবার সংযমের সময় হিসেবে পালন করে। নিরামিষ আহার, নেশা পরিহার,পরিমিত জীবনযাপন, অপ্রয়োজনীয় ভোগ থেকে দূরে থাকা এবং প্রার্থনায় মনোনিবেশ করার রীতি রয়েছে।

তবে সব সনাতনী পরিবারে খাদ্যসংক্রান্ত বিধি এক নয়। কোথাও পেঁয়াজ-রসুন বা নির্দিষ্ট কিছু খাবার বর্জন করা হয়, কোথাও আবার ভিন্ন রীতি অনুসরণ করা হয়। তাই কোনো একটি পারিবারিক রীতিকে সর্বজনীন শাস্ত্রবিধি হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

পিতৃপক্ষের আসল সংযম শুধু খাদ্যে নয়। ক্রোধ সংযত করা,মিথ্যা থেকে দূরে থাকা, অন্যকে কষ্ট না দেওয়া এবং নিজের আচরণকে শুদ্ধ করার চেষ্টাও এই সময়ের সাধনার অংশ হতে পারে।

‘পিতৃদোষ’ শব্দটি মূলত জ্যোতিষশাস্ত্র ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। জ্যোতিষীয় মত অনুযায়ী,জন্মকুণ্ডলীতে পিতৃদোষ থাকলে জীবনে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে বলে মনে করা হয়।

তর্পণ,শ্রাদ্ধ,পিণ্ডদান,অন্নদান,পূর্বপুরুষের স্মরণ ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে পিতৃদোষের প্রতিকার করা যায় বলে জ্যোতিষীয় পরম্পরায় বলা হয়।

তবে এসব দাবিকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কারণ-ফল হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই। এগুলো ধর্মীয় ও জ্যোতিষীয় বিশ্বাসের পরিসরের বিষয়। একজন ধর্মবিশ্বাসী মানুষ চাইলে নিজস্ব বিশ্বাস ও পারিবারিক পরম্পরা অনুযায়ী এসব আচার পালন করতে পারেন।

সনাতন আধ্যাত্মিকতায় ভগবান শিব মুক্তি, সংযম ও চেতনার প্রতীক। তাই পিতৃপক্ষে অনেক ভক্ত মহাদেবের আরাধনা করেন।

শিবলিঙ্গে জল বা গঙ্গাজল নিবেদন,‘ওঁ নমঃ শিবায়’ জপ,মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র পাঠ কিংবা নীরবে প্রয়াত স্বজনদের জন্য প্রার্থনা করা যেতে পারে।

পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে মহাদেবের কাছে প্রার্থনা হতে পারে খুব সহজ-

‘হে মহাদেব,আমাদের পূর্বপুরুষদের শান্তি দাও। তাঁদের অসম্পূর্ণতা ক্ষমা করো। তাঁদের আশীর্বাদে আমাদের পরিবারকে সত্য,ধর্ম ও মানবিকতার পথে চলার শক্তি দাও।’

এই প্রার্থনার জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও নির্মল মন।

পিতৃপক্ষের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়। আমরা প্রয়াত পূর্বপুরুষদের জন্য তর্পণ করি,শ্রাদ্ধ করি,অন্নদান করি; কিন্তু জীবিত বাবা-মায়ের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কতটা পালন করছি?

একজন বৃদ্ধ বাবা হয়তো একাকী বসে আছেন। একজন মা হয়তো অসুস্থ শরীর নিয়ে সন্তানের অপেক্ষায় আছেন। তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর সময় যদি আমরা না পাই, তাহলে মৃত্যুর পর বিশাল আয়োজন করে শ্রাদ্ধ করাই কি আমাদের দায়িত্বকে সম্পূর্ণ করে?

পিতৃপক্ষ যেন এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা দেয়-জীবিত পিতা-মাতার সেবা এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মানই পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধার সবচেয়ে জীবন্ত প্রকাশ।

তাঁদের সঙ্গে একটু সময় কাটানো, প্রয়োজনের সময় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, তাঁদের কথা মন দিয়ে শোনা কিংবা শুধু পাশে বসে থাকা-এসবও এক ধরনের পিতৃসেবা।

আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে মানুষ অনেক সময় নিজের শিকড় ভুলে যায়। ব্যস্ততার ভিড়ে বাবা-মায়ের জন্য সময় থাকে না,প্রয়াত স্বজনদের স্মৃতি ধীরে ধীরে মুছে যায়,পারিবারিক ইতিহাস হারিয়ে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্মে।পিতৃপক্ষ সেই বিস্মৃতির বিরুদ্ধে একটি নীরব আহ্বান।

এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়-আমরা একা নই। আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে বহু প্রজন্মের জীবন,শ্রম,ত্যাগ ও ভালোবাসা জড়িয়ে আছে। তর্পণের জল তাই শুধু জল নয়। এটি কৃতজ্ঞতার অঞ্জলি।

শ্রাদ্ধের অন্ন শুধু একটি ধর্মীয় নিবেদন নয়। এটি ভাগ করে নেওয়ার শিক্ষা। প্রদীপের আলো শুধু একটি আচার নয়। এটি অন্ধকারের মধ্যে আলোর সন্ধান।

আর পূর্বপুরুষের স্মরণ শুধু অতীতের দিকে তাকানো নয়। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া ভালো মূল্যবোধকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার।

এই পিতৃপক্ষে তাই আসুন,শুধু প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ নয়,জীবিত বাবা-মা ও গুরুজনদের প্রতিও দায়িত্বশীল হই। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই। ক্ষুধার্তকে অন্ন দিই। প্রাণীর প্রতি মমতা দেখাই। নিজের জীবন থেকে অহংকার,হিংসা ও অন্যায়কে যতটা সম্ভব দূরে রাখি।

কারণ পূর্বপুরুষদের শান্তির জন্য করা প্রার্থনা তখনই সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন সেই প্রার্থনার আলো আমাদের নিজেদের জীবনেও প্রতিফলিত হয়।

পিতৃপক্ষে সকল প্রয়াত পিতৃপুরুষের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। জীবিত পিতা-মাতা ও গুরুজনদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা।

মহাদেবের চরণে প্রার্থনা-সকলের জীবনে শান্তি,সত্য,মঙ্গল ও মানবিকতার আলো জ্বলে উঠুক। ওঁ পিতৃভ্যঃ স্বধা নমঃ। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream