বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলায় তার বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশাকে ‘অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির’ বলে উল্লেখ করেছে মামলার তদন্ত সংস্থা। রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা দাবি করেছেন, জিজ্ঞাসাবাদে দিশা একাধিক প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়িয়ে গেছেন এবং নীরবতা পালন করেছেন। এ ছাড়া তাহসিফের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত এবং ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে আবেদনে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলামের আদালতে দিশার দ্বিতীয় দফা রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী এসব বিষয় তুলে ধরেন।
শুনানিতে তিনি বলেন, তাহসিফ সাউরি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার ভিডিও ধারণ করেছিলেন। সেই ভিডিও প্রকাশ না করলে শেখ হাসিনা কীভাবে দেশ ছেড়েছেন, তা জাতি জানতে পারতো না। ভিডিও প্রকাশের কারণে তাহসিফের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় বলে জানান তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত দিশার দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
দিশাকে গত ৩০ অক্টোবর রাতে রাজধানীর কাফরুল থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন আদালত তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে বুধবার তাকে আদালতে হাজির করা হয়। এদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইন্সপেক্টর ফিরোজ উদ্দিন পুনরায় সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।
রিমান্ড আবেদনে সাত কারণ
দিশার দ্বিতীয় দফা রিমান্ড চেয়ে করা আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা সাতটি কারণ উল্লেখ করেন। আবেদনে বলা হয়, চার দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় মামলার ঘটনার রহস্য উদঘাটনে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে দিশা জানান, ঘটনার আগে ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফ সাউরির সঙ্গে উত্তরা ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ গিয়েছিলেন তিনি। ওই দিন সন্ধ্যায় একাধিকবার ‘সিপি ফাইভ স্টার’ স্ন্যাকস খান তারা। পরে তাহসিফের সঙ্গে মোটরসাইকেল গ্যারেজেও যান দিশা।
আবেদনে আরও বলা হয়, দিশা ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন এবং বিভিন্ন জায়গায় তার মোটরসাইকেলে ঘুরেছেন বলে জানিয়েছেন। তদন্তে তিনি ঘটনা সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে সেসব তথ্য গোপন রেখে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘এ আসামি অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির হওয়ায় একাধিক প্রশ্নের জবাব কৌশলে এড়িয়ে যায় এবং নীরবতা পালন করে।’
মামলার আরেক আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের বক্তব্যের সঙ্গে দিশার বক্তব্য মিলিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথাও রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, দীপ বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে রয়েছেন। তাঁদের দুজনের বক্তব্য ক্রসচেক করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা করে দিশার সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রাথমিকভাবে মামলার ঘটনায় দিশার সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলেও দাবি তদন্ত কর্মকর্তার।
মামলার সুষ্ঠু তদন্ত, ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন এবং জড়িত অন্য আসামিদের গ্রেফতারের স্বার্থে দিশাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও সাত দিনের রিমান্ড প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তাহসিফের ভিডিও নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, কয়েক দিন আগে তুরাগ নদ থেকে তাহসিফ সাউরির লাশ উদ্ধার করা হয়। তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে মামলার দুই আসামি দিশা ও দীপের সঙ্গে ছিলেন তাহসিফ। লাশ উদ্ধারের আগের দিন রাতে দিশার সঙ্গে ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’ ও ‘সিপি ফাইভ স্টার’ রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলেন তিনি।
ফারুকী বলেন, সেখানে তারা সময় কাটান। হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে এবং রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় দেশ ও জাতি উদ্বিগ্ন। সবাই হত্যার প্রকৃত কারণ জানতে চান। দিশা রিমান্ডে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিচ্ছেন। তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময়কার ভিডিও করে তা সাহসের সঙ্গে পাবলিশড করে। সে ভিডিও না করলে জাতি জানতোই না, হাসিনা কীভাবে পালিয়ে গেছে। রহস্য থেকে যেত।’
তাহসিফের ভিডিও প্রকাশের কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র হয়েছিল কি না এবং প্রেমের কোনো বিষয় রয়েছে কি না, সেসব বিষয়েও তদন্ত চলছে বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী।
রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন
দিশার পক্ষে তার আইনজীবী ইমাম হোসেন জাবেদ রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন।
তিনি বলেন, ভিকটিম ও আসামি আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। ঘটনার দিন তারা রেস্টুরেন্টে যান। রাত ১২টার দিকে তাহসিফ দিশাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যান। তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি বা সম্পর্কের অবনতি হলে তাহসিফ তাকে বাসায় পৌঁছে দিতেন না।
আইনজীবী আরও বলেন, মামলার বাদী এজাহারে উল্লেখ করেছেন, রাত ১টার দিকে তাহসিফকে ফোন করা হয়। তিনি বাসায় ফিরছেন না কেন, জানতে চাইলে তাহসিফ জানান, ৩০ মিনিটের মধ্যে বাসায় পৌঁছাবেন।
তিনি বলেন, আসামিকে শুধু ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে। ঘটনার দিন রাত ১২টার পর থেকে তাহসিফের সঙ্গে তার আর যোগাযোগ ছিল না। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ কারণে রিমান্ড বাতিল করে তার জামিন মঞ্জুরের আবেদন জানান আইনজীবী।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত দিশার দ্বিতীয় দফায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মতামত