জমির মালিকানা আছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও প্রস্তুত; কিন্তু নামজারি কিংবা জমাভাগের কাজ শেষ করতে অপেক্ষার যেশেষ নেই। কারও প্রয়োজন পৈতৃক সম্পত্তি নিজের নামে রেকর্ড করা, কেউ জমি কিনে নামজারির অপেক্ষায়, আবার কারও প্রয়োজন জরুরি শুনানি। এমন পরিস্থিতিতে খুলনার পাইকগাছা উপজেলা ভূমি অফিসে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডের পদ শূন্য থাকায় সেবাপ্রত্যাশীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। গুরুত্বপূর্ণ এ পদে কর্মকর্তা না থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। ফলে উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি ভূমি প্রশাসনের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
ভূমি অফিসের সেবা মানুষের সম্পত্তির অধিকার ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। নামজারি, জমাভাগ, আপত্তির শুনানি ও ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হলে জমি কেনাবেচা, ব্যাংকঋণ গ্রহণ এবং উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি হস্তান্তরসহ নানা কাজে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ভূমি ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। নামজারি ও জমাভাগের আবেদন নিষ্পত্তি, শুনানি গ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন কর আদায় তদারকি, সরকারি খাসজমি সংরক্ষণ, অবৈধ দখল প্রতিরোধ এবং ভূমিসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ তাঁর দায়িত্বের অংশ।
পাইকগাছার মতো উপকূলীয় উপজেলায় সরকারি খাসজমি, জলাশয় ও কৃষিজমির দখল নিয়ে বিরোধের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে নিয়মিত তদারকি ও দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। এসিল্যান্ডের পদ শূন্য থাকায় মাঠপর্যায়ে নজরদারি, অভিযোগ যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় সেবাগ্রহীতা হাফিজুর রহমান জানান, জমির নামজারি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ নিয়ে ভূমি অফিসে এসে কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। সময়মতো নামজারি সম্পন্ন না হলে জমি নিয়ে পরবর্তী বিভিন্ন কাজে সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
আরেক সেবাগ্রহীতা জানান, প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ভূমি অফিসে আসতে যাতায়াত খরচ ও সময় দুটোই ব্যয় হয়। একদিনে কাজ শেষ না হলে আবার আসতে হয়। দ্রুত নতুন এসিল্যান্ড পদায়নের মাধ্যমে ভূমিসেবার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।
পাইকগাছা উপজেলা ভূমি অফিসের সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফজলে রাব্বী ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর যোগদান করেন। প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০২৬ সালের অক্টোবরে তাঁকে খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায় বদলি করা হয়। ১ অক্টোবর বদলির আদেশের পর ৫ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টায় তিনি সেখানে যোগদান করেন। এরপর থেকে পাইকগাছায় পদটি শূন্য রয়েছে। বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন ইউএনও ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী।
নতুন এসিল্যান্ড পদায়নের বিষয়ে ইউএনও ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী জানান, নতুন ব্যাচের ভূমি-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন কর্মকর্তা পদায়ন সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না।
অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনে চাপ অনুভব করছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২৪ ঘণ্টায় তো চাপ থাকে।’ উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক দায়িত্বের পাশাপাশি ভূমি প্রশাসনের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে তাঁকে।
সংশ্লিষ্ট পদ শূন্য থাকায় প্রশাসনিক চাপ তৈরি হলেও তার প্রভাব যেন সাধারণ মানুষের সেবাপ্রাপ্তিতে না পড়ে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে নামজারি, জমাভাগ ও জরুরি শুনানির কাজে দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। প্রশ্ন উঠেছে, নতুন কর্মকর্তা পদায়নের আগ পর্যন্ত ভূমিসেবার স্বাভাবিক গতি কীভাবে বজায় থাকবে? পাইকগাছার মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুত এসিল্যান্ড পদায়নের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সময়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে ভূমি অফিসের সেবা নিশ্চিত করবে প্রশাসন।
মতামত