কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের উত্তর উপকূলে বড় তেলবাহী জাহাজ চলাচলের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন পার্লামেন্টের সদস্যরা।
গত ২৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেতৃত্বাধীন লিবারেল সরকার নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়।
নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে কনজারভেটিভ পার্টির পক্ষ থেকে একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছিল। তবে পার্লামেন্টে ভোটাভুটিতে বিলটি ১৩২-১৯১ ভোটে পরাজিত হয়।
বিলটির পক্ষে ভোট দেন কনজারভেটিভ পার্টির সদস্যরা। অন্যদিকে লিবারেল, ব্লক কেবেকোয়া, এনডিপি ও গ্রিন পার্টির সদস্যরা এর বিপক্ষে ভোট দেন।
ফলে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উত্তর উপকূলে বড় তেলবাহী ট্যাংকারের মাধ্যমে অপরিশোধিত তেল পরিবহন ও রপ্তানির ওপর আগের নিষেধাজ্ঞাই বহাল থাকছে।
উল্লেখ্য কানাডায় ২০১৯ সালে প্রণীত ‘অয়েল ট্যাংকার মোরাটোরিয়াম অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উত্তর উপকূলের নির্দিষ্ট সামুদ্রিক এলাকায় ১২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টনের বেশি অপরিশোধিত তেল বা নির্দিষ্ট ধরনের স্থায়ী তেলজাতীয় পণ্য বহনকারী ট্যাংকারের মাধ্যমে তেল ওঠানো-নামানো এবং সংশ্লিষ্ট বন্দরে নোঙর করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এই বিধিনিষেধের আওতায় রয়েছে হেকেট প্রণালি, ডিক্সন প্রবেশপথ এবং কুইন শার্লট সাউন্ডসহ উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক এলাকা। মূলত তেল ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো, সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা এবং উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থার ক্ষতি প্রতিরোধের লক্ষ্যেই আইনটি প্রণয়ন করা হয়।
তবে আইনটি সব ধরনের জ্বালানি পরিবহন নিষিদ্ধ করেনি। নির্ধারিত সীমার নিচে তেল পরিবহন এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও শিল্পের প্রয়োজনীয় কিছু জ্বালানি সরবরাহের সুযোগ রয়েছে।
কনজারভেটিভ পার্টির সংসদ সদস্যদের দাবি, এই নিষেধাজ্ঞা কানাডার জ্বালানি খাতের সম্ভাবনা সীমিত করছে। বিশেষ করে এশিয়ার বাজারে সরাসরি তেল রপ্তানির সুযোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কানাডাকে আন্তর্জাতিক বাজারে তার জ্বালানি সম্পদের ন্যায্য মূল্য পেতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
দলটির নেতা পিয়েরে পলিয়েভসহ বিরোধী সংসদ সদস্যরা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, এর ফলে কানাডার তেল রপ্তানির নতুন বাজার তৈরি হতে পারে এবং দেশটির অর্থনীতিতে অতিরিক্ত রাজস্ব আসতে পারে।
এ প্রসঙ্গে ক্যালগেরিভিত্তিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাথকোনা রিসোর্সেসের একটি প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যমান রেলপথ ব্যবহার করে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিন্স রুপার্ট হয়ে প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ আড়াই লাখ ব্যারেল কানাডীয় তেল পরিবহনের সম্ভাবনা তুলে ধরেছে। তবে এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বর্তমান নিষেধাজ্ঞা একটি বড় বাধা।
কনজারভেটিভদের মতে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো পরিবেশ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত অন্যান্য আইন মেনে অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ পাবে। তাদের দাবি, তেল রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারণ এবং পরিবেশ সুরক্ষা- দুটি লক্ষ্যই যথাযথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকার নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে তৎকালীন ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রধানমন্ত্রী ডেভিড এবির সঙ্গে এক সমঝোতায় উত্তর উপকূলে তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা অপরিবর্তিত রাখার অঙ্গীকার করে অটোয়া।
এর পরদিন আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথের সঙ্গে আলোচনার পর প্রস্তাবিত পাইপলাইনের জন্য একটি দক্ষিণমুখী পথের কথা সামনে আসে। পরিকল্পনাটি আলবার্টা থেকে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ডেল্টায় তেল রপ্তানির টার্মিনাল পর্যন্ত যাওয়ার কথা, যার বড় অংশ বিদ্যমান ট্রান্স মাউন্টেন পাইপলাইনের পথ অনুসরণ করতে পারে।
অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার সমর্থকেরা বলছেন, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উত্তর উপকূলের সামুদ্রিক পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। সেখানে বড় ধরনের তেল নিঃসরণ ঘটলে সামুদ্রিক প্রাণী, মৎস্যসম্পদ, উপকূলীয় জনগোষ্ঠী এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবন-জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে। তাই সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিল প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে কানাডার জ্বালানি রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। একদিকে কনজারভেটিভরা আন্তর্জাতিক বাজারে কানাডার তেল রপ্তানি বাড়ানো ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে কার্নি সরকার বিদ্যমান আইন এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সঙ্গে করা সমঝোতা অনুযায়ী উত্তর উপকূলে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সাম্প্রতিক ভোটের ফলে আপাতত উত্তর উপকূলের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। তবে কানাডার জ্বালানি রপ্তানি, নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এবং সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
মতামত