চীনে ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকটে পড়ছেন এমন এক শ্রেণির গ্রাহক, যাঁদের একসময় ব্যাংকগুলো সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করত। তাঁরা হলেন উচ্চশিক্ষিত, মধ্যবয়সী এবং সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চাকরিজীবী।
একসময় এসব গ্রাহককে কম ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে সহজেই ক্রেডিট কার্ড ও ঋণসুবিধা দিত চীনের ব্যাংকগুলো। তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে তাঁদের অনেকেই এখন ঋণ পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। এতে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনাদায়ি ঋণের বোঝা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির ব্যাংকগুলো।
চীনের সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ব্যাংকিং ক্রেডিট অ্যাসেটস রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড সার্কুলেশন সেন্টার’-এ গত অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে তালিকাভুক্ত অনাদায়ি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এই প্ল্যাটফর্মে দেশটির ব্যাংক ও ভোক্তা অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খেলাপি ঋণের পোর্টফোলিও কেনাবেচার জন্য তালিকাভুক্ত করে। ফলে ঋণখেলাপির এই ঊর্ধ্বগতি চীনের ব্যাংকিং খাতের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে প্ল্যাটফর্মটিতে নতুন তালিকাভুক্ত খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪৮.১ বিলিয়ন ইউয়ানে (প্রায় ২ হাজার ২২০ কোটি মার্কিন ডলার), যার মধ্যে আসল ও সুদ উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে একক খাত হিসেবে সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া—যা মোট খেলাপি ঋণের ৩৫.২ শতাংশ।
চলতি অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ের মধ্যেই আরও ৮২টি নতুন খেলাপি ঋণের পোর্টফোলিও ওই প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত হয়েছে। অধিকাংশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি হওয়া ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের গড় বয়স ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। পিং আন ব্যাংকের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান সংক্ষেপে এই গ্রহীতাদের ‘মধ্যবয়সী’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান একটি দীর্ঘমেয়াদি ও উদীয়মান সংকটকে স্পষ্ট করছে; যেখানে মধ্যবয়সী কার্ডধারীরাই এখন সবচেয়ে বেশি ক্রেডিট ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক উল্টো। যুক্তরাষ্ট্রে ঐতিহাসিকভাবে ক্রেডিট কার্ড খেলাপির শীর্ষে থাকেন তরুণ বা কম বয়সী গ্রাহকেরা। নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ ক্রেডিট ব্যবহার ও নগদ তহবিলের ঘাটতির কারণে বয়স্কদের তুলনায় ২০ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের খেলাপির হার বেশি।
চীনের ক্রেডিট কার্ড খাতের দীর্ঘদিনের স্বাধীন বিশ্লেষক ডং জেং জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এই পার্থক্যের বড় কারণ গ্রাহকদের বয়সগত জনসংখ্যা (ডিমোগ্রাফি)। চীনে মধ্যবয়সী মানুষই ক্রেডিট কার্ডের প্রধান গ্রাহক; অন্যদিকে তরুণেরা মূলত বিভিন্ন অনলাইন লেন্ডিং বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে বেশি ঝুঁকেছেন।
ডং জেং বলেন, যখন অর্থনীতির গতি কমে যায়, তখন ৪০-এর কোঠায় থাকা মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। সাধারণত এই বয়সে তাঁদের মাথার ওপর গৃহঋণের (মর্টগেজ) কিস্তি থাকে, পাশাপাশি পরিবার চালানো ও সন্তানদের বড় করার বড় দায়িত্ব থাকে।
চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সাংহাই শাখার ক্রেডিট কার্ড কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা এক ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঋণ আদায়ের সময় অধিকাংশ খেলাপিকারিই তীব্র বেতন কর্তন কিংবা চাকরি হারানোর কথা বলছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, চাকরি বা আয় সংকট তৈরি হলে মানুষ সবার আগে নিজের থাকার ঘরটি বাঁচাতে চায়। তাই তাঁরা ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া না দিয়ে গৃহঋণের কিস্তি এবং পারিবারিক খরচ মেটানোকে অগ্রাধিকার দেন। ক্রেডিট কার্ডের বিল বকেয়া রাখলে সাময়িকভাবে শুধু 'ক্রেডিট স্কোর' খারাপ হয়, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো বস্তুগত ক্ষতি হয় না।
তিনি আরও যোগ করেন, খেলাপিদের পরিচয় প্রায়ই ব্যাংকের জন্য চমকপ্রদ। বাইরে থেকে যাঁদের চাকরি বা ক্যারিয়ার অত্যন্ত স্থায়ী ও আকর্ষণীয় মনে হয়—যেমন সাংহাই পৌরসভার মালিকানাধীন কোনো উদ্যোগ বা সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা—তাদের মধ্যেও এখন ক্রেডিট কার্ড খেলাপির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
ব্যাংকগুলোর জমা দেওয়া খেলাপি ঋণের নথিপত্র থেকেও একই চিত্র পাওয়া যায়।
চলতি বছরের আগস্টে বেইজিংভিত্তিক ‘চায়না এভারব্রাইট ব্যাংক’ ১০ বিলিয়ন ইউয়ানেরও বেশি মূল্যের একটি অনাদায়ী ঋণের পোর্টফোলিও তালিকাভুক্ত করে। সেখানে ব্যাংকটি স্পষ্ট উল্লেখ করে যে, খেলাপিকারীদের একটি বড় অংশই ‘কলেজ ডিগ্রিধারী বা তার চেয়ে উচ্চশিক্ষিত’।
একইভাবে পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ চিয়াংসুর ‘লিশুই রুরাল কমার্শিয়াল ব্যাংক’ তাদের খেলাপিকারীদের ‘উচ্চ পেশাগত দক্ষতাসম্পন্ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার অর্থ ছিল তাঁদের ঋণ পরিশোধের সম্ভাব্য ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি।
বিশ্লেষক ডং জেং জানান, বর্তমান এই সংকটের বীজ রোপিত হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে—২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, যখন চীনে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ধুম পড়েছিল। তখন গ্রাহকসংখ্যা দ্রুত বাড়াতে ব্যাংকগুলো আবেদন মঞ্জুরের শর্ত অত্যন্ত শিথিল করেছিল; বিশেষ করে সরকারি সংস্থা বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ক্ষেত্রে।
ব্যাংকিং খাতের ওই সূত্রও একই মত দিয়ে বলেন, সরকারি বা স্থায়ী কর্মীদের প্রতি ব্যাংকগুলোর একধরনের জন্মগত আস্থা ছিল। তাঁদের উচ্চমানের গ্রাহক মনে করা হতো। ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই ছাড়াই সহজে কার্ড দেওয়ায় সেই ঝুঁকির ফল এখন ভুগতে হচ্ছে।
পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে চীনা ব্যাংকগুলো এখন খেলাপি ঋণ ঝেড়ে ফেলতে দ্রুত পা ফেলছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) প্ল্যাটফর্মটিতে মোট ৩২২.২ বিলিয়ন ইউয়ানের অনাদায়ী ঋণের পোর্টফোলিও নিবন্ধিত হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬.৪ শতাংশ বেশি।
আগামীর দিকে তাকালে পর্যবেক্ষকেরা ধারণা করছেন, ক্রেডিট কার্ডের অনাদায়ী ঋণের অনুপাত আরও কিছুদিন উচ্চপর্যায়েই থাকবে।
উহানভিত্তিক হুয়ায়ুয়ান সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক লিয়াও ঝিমিং উল্লেখ করেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর অবস্থানের কারণে ব্যাংকগুলো এখন নতুন ক্রেডিট কার্ড ইস্যুতে বেশ কড়াকড়ি আরোপ করছে।
তবে লিয়াও ঝিমিং সতর্ক করে বলেন, নতুন কার্ড দেওয়া কমালেও খেলাপির হার উচ্চই থাকবে, কারণ আগের বছরগুলোর শিথিল নীতি ইতিমধ্যেই ক্ষতি যা করার তা করে ফেলেছে। এটি এখন আর কেবল ব্যাংকিং খাতের বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক ইস্যুতে রূপ নিয়েছে।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
মতামত