শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM

যোগাযোগে বড় অগ্রগতি সত্ত্বেও স্থবির রংপুরের শিল্পায়ন


ডেস্ক নিউজ
ডেস্ক নিউজ
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

যোগাযোগে বড় অগ্রগতি সত্ত্বেও স্থবির রংপুরের শিল্পায়ন
অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও গডে উঠছেনা শিল্প কারখানা

রংপুরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত সম্প্রসারণে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কৃষি উৎপাদন, কুটিরশিল্প ও স্থানীয় বাজারকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বিস্তৃত হচ্ছে। তবে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, ঋণপ্রাপ্তির কঠিন শর্ত, জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় ধীরগতি এবং বিসিক শিল্পনগরের অব্যবস্থাপনায় সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে উত্তরণের গতি মন্থর রয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রংপুর অঞ্চলে সড়ক, যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হলেও অর্থায়নের সংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানি সমস্যায় স্থবির শিল্পায়ন। মাত্র ৫০–৫৫ শতাংশ কারখানা আংশিক সক্ষমতায় চলছে, বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় ১৫–২০ শতাংশ।

রংপুরের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান ভিত্তি কৃষি এবং কৃষিনির্ভর বিভিন্ন খাত। ধান, আলু, ভুট্টা, শাকসবজি ও তামাকের উৎপাদন, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি নার্সারি ও উদ্যানভিত্তিক ব্যবসারও প্রসার ঘটছে।

কৃষি অর্থনীতির গবেষক রায়ান আহমেদ রাজুর মতে, রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এর মধ্যে শতরঞ্জি উল্লেখযোগ্য, যার বাজার দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও বিস্তৃত। এ ছাড়া চাল, সার, কীটনাশক, পাট, ভোজ্যতেল, কৃষিযন্ত্র ও তামাকের পাইকারি-খুচরা বাণিজ্য স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন, পরিবহন ও আর্থিক সেবা খাতেও সম্প্রসারণ ঘটছে। তবে কৃষিপণ্য উৎপাদনের তুলনায় সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে মূল্য সংযোজনের সুযোগ এখনো সীমিত। ফলে বিপুল কৃষি উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও শিল্প খাতে এর সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামোর উন্নয়নের ফলে রংপুরে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়লেও উদ্যোক্তারা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন। মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, কঠিন শর্ত এবং ঋণ বিতরণে জটিলতা ব্যবসা সম্প্রসারণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গবেষক ও অধ্যাপক হারুন অর রশীদ চৌধুরীর মতে, উদ্যোক্তাদের প্রধান সমস্যাগুলোর একটি অর্থায়নের সংকট। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ ও কঠিন শর্তের কারণে অনেকেই প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে পারছেন না। পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে ধীরগতির কারণে বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনাও কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

অন্যদিকে জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক দাম ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থায়ন ও জ্বালানিসংকট একসঙ্গে দীর্ঘায়িত হলে নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রংপুরে শিল্পায়নের অন্যতম পুরোনো অবকাঠামো বিসিক শিল্পনগর। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত এ শিল্পনগরে দীর্ঘদিন ধরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থা, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, নিরাপত্তার ঘাটতি ও জায়গার সংকটের অভিযোগ রয়েছে।

উদ্যোক্তাদের মতে, এসব সমস্যা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করছে। দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় একটি বিসিক শিল্পনগর প্রতিষ্ঠার দাবিও জানিয়ে আসছেন তাঁরা। নতুন শিল্পনগর গড়ে তোলা এবং বিদ্যমান শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নত করা গেলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। হিসাব অনুযায়ী, ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ কারখানা আংশিক সক্ষমতায় উৎপাদন করছে, আর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কারখানা বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় রয়েছে। যার কারণে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অর্থায়ন সমস্যায় শিল্প খাত প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জানা গেছে, রংপুরে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কিছু শিল্প ইউনিটসহ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া অটো রাইস মিল, প্লাস্টিক ও কৃষিপণ্য প্যাকেজিং কারখানা এবং হিমাগার আছে। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের মধ্যে শতরঞ্জি, হস্তশিল্প, বেকারি, আটা-ময়দার মিল ও অ্যালুমিনিয়ামজাত পণ্য উৎপাদনের মতো শিল্প উল্লেখযোগ্য। খেলাপি ঋণ, লোকসান ও ব্যবসায়িক সংকটের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।

রংপুর অঞ্চলে আলু, ভুট্টা, ধান, আমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উল্লেখযোগ্য উৎপাদন হয়। এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্যশিল্প, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের তুলনায় প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। বর্তমানে চালকল, কিছু হিমাগার ও অল্পসংখ্যক পাটকল এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে একদিকে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের অপচয় কমানো সম্ভব, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান ও পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়তে পারে। তবে এ জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, সহজ শর্তে অর্থায়ন, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা এবং উন্নত পরিবহন ও বাজার অবকাঠামো প্রয়োজন।

রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এমদাদুল হক বলেন, রংপুর বিভাগে চারটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। এগুলোর বাস্তবায়নে উদ্যোক্তাদের দাবি ছিলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তত একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত প্রস্তুত করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত করা হোক। সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরিষেবা নিশ্চিত হলে বিনিয়োগকারীরা শিল্প স্থাপনে আগ্রহী হবেন। বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো কার্যকরভাবে চালু হলে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্যশিল্প, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক ও অন্যান্য উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে বিনিয়োগকারীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। এ কারণে উদ্যোক্তারা ১০ বছরের কর অবকাশ এবং শিল্প, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন।

যোগাযোগ ও কর্মসংস্থান বিশেষজ্ঞ রাতু রুমানা চৌধুরী স্নেহা মনে করেন, রংপুর অঞ্চলে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তারা মূলত হস্তশিল্প, শতরঞ্জি, বুটিকস, ই-কমার্স, ক্যাটারিং, রেস্তোরাঁ এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো খাতে কাজ করছেন। এসব উদ্যোগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন বাজার তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।

উল্লেখ্য, রংপুর বিভাগে কৃষি, কুটিরশিল্প ও সেবা খাতের পাশাপাশি সীমিত পরিসরে বৃহৎ শিল্পও রয়েছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের রংপুর ইউনিট অঞ্চলের বৃহত্তম শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি, যেখানে খাদ্যপণ্য ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া রংপুর চিনি কল, মিষ্টি, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান অঞ্চলের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে। রংপুর অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নের কাজ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও জমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের ধীরগতির কারণে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী অগ্রগতি হয়নি। স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগর, কর অবকাশ ও একক এক্সচেঞ্জের মতো সুবিধার দাবি জানিয়ে আসছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রংপুরের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী শিল্পভিত্তিতে রূপ দিতে হলে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, বিসিক শিল্পনগরের সমস্যা সমাধান এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুফল শিল্প, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬


যোগাযোগে বড় অগ্রগতি সত্ত্বেও স্থবির রংপুরের শিল্পায়ন

প্রকাশের তারিখ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

রংপুরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত সম্প্রসারণে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কৃষি উৎপাদন, কুটিরশিল্প ও স্থানীয় বাজারকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বিস্তৃত হচ্ছে। তবে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, ঋণপ্রাপ্তির কঠিন শর্ত, জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় ধীরগতি এবং বিসিক শিল্পনগরের অব্যবস্থাপনায় সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে উত্তরণের গতি মন্থর রয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রংপুর অঞ্চলে সড়ক, যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হলেও অর্থায়নের সংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানি সমস্যায় স্থবির শিল্পায়ন। মাত্র ৫০–৫৫ শতাংশ কারখানা আংশিক সক্ষমতায় চলছে, বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় ১৫–২০ শতাংশ।

রংপুরের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান ভিত্তি কৃষি এবং কৃষিনির্ভর বিভিন্ন খাত। ধান, আলু, ভুট্টা, শাকসবজি ও তামাকের উৎপাদন, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি নার্সারি ও উদ্যানভিত্তিক ব্যবসারও প্রসার ঘটছে।

কৃষি অর্থনীতির গবেষক রায়ান আহমেদ রাজুর মতে, রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এর মধ্যে শতরঞ্জি উল্লেখযোগ্য, যার বাজার দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও বিস্তৃত। এ ছাড়া চাল, সার, কীটনাশক, পাট, ভোজ্যতেল, কৃষিযন্ত্র ও তামাকের পাইকারি-খুচরা বাণিজ্য স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন, পরিবহন ও আর্থিক সেবা খাতেও সম্প্রসারণ ঘটছে। তবে কৃষিপণ্য উৎপাদনের তুলনায় সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে মূল্য সংযোজনের সুযোগ এখনো সীমিত। ফলে বিপুল কৃষি উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও শিল্প খাতে এর সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামোর উন্নয়নের ফলে রংপুরে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়লেও উদ্যোক্তারা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন। মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, কঠিন শর্ত এবং ঋণ বিতরণে জটিলতা ব্যবসা সম্প্রসারণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গবেষক ও অধ্যাপক হারুন অর রশীদ চৌধুরীর মতে, উদ্যোক্তাদের প্রধান সমস্যাগুলোর একটি অর্থায়নের সংকট। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ ও কঠিন শর্তের কারণে অনেকেই প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে পারছেন না। পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে ধীরগতির কারণে বড় বিনিয়োগের সম্ভাবনাও কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

অন্যদিকে জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক দাম ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থায়ন ও জ্বালানিসংকট একসঙ্গে দীর্ঘায়িত হলে নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রংপুরে শিল্পায়নের অন্যতম পুরোনো অবকাঠামো বিসিক শিল্পনগর। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত এ শিল্পনগরে দীর্ঘদিন ধরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থা, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, নিরাপত্তার ঘাটতি ও জায়গার সংকটের অভিযোগ রয়েছে।

উদ্যোক্তাদের মতে, এসব সমস্যা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করছে। দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় একটি বিসিক শিল্পনগর প্রতিষ্ঠার দাবিও জানিয়ে আসছেন তাঁরা। নতুন শিল্পনগর গড়ে তোলা এবং বিদ্যমান শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নত করা গেলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। হিসাব অনুযায়ী, ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ কারখানা আংশিক সক্ষমতায় উৎপাদন করছে, আর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কারখানা বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় রয়েছে। যার কারণে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অর্থায়ন সমস্যায় শিল্প খাত প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জানা গেছে, রংপুরে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কিছু শিল্প ইউনিটসহ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া অটো রাইস মিল, প্লাস্টিক ও কৃষিপণ্য প্যাকেজিং কারখানা এবং হিমাগার আছে। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের মধ্যে শতরঞ্জি, হস্তশিল্প, বেকারি, আটা-ময়দার মিল ও অ্যালুমিনিয়ামজাত পণ্য উৎপাদনের মতো শিল্প উল্লেখযোগ্য। খেলাপি ঋণ, লোকসান ও ব্যবসায়িক সংকটের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।

রংপুর অঞ্চলে আলু, ভুট্টা, ধান, আমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উল্লেখযোগ্য উৎপাদন হয়। এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্যশিল্প, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ ও রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের তুলনায় প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। বর্তমানে চালকল, কিছু হিমাগার ও অল্পসংখ্যক পাটকল এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে একদিকে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের অপচয় কমানো সম্ভব, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান ও পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়তে পারে। তবে এ জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, সহজ শর্তে অর্থায়ন, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা এবং উন্নত পরিবহন ও বাজার অবকাঠামো প্রয়োজন।

রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এমদাদুল হক বলেন, রংপুর বিভাগে চারটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। এগুলোর বাস্তবায়নে উদ্যোক্তাদের দাবি ছিলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তত একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত প্রস্তুত করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত করা হোক। সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরিষেবা নিশ্চিত হলে বিনিয়োগকারীরা শিল্প স্থাপনে আগ্রহী হবেন। বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো কার্যকরভাবে চালু হলে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্যশিল্প, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক ও অন্যান্য উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে বিনিয়োগকারীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন। এ কারণে উদ্যোক্তারা ১০ বছরের কর অবকাশ এবং শিল্প, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন।

যোগাযোগ ও কর্মসংস্থান বিশেষজ্ঞ রাতু রুমানা চৌধুরী স্নেহা মনে করেন, রংপুর অঞ্চলে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তারা মূলত হস্তশিল্প, শতরঞ্জি, বুটিকস, ই-কমার্স, ক্যাটারিং, রেস্তোরাঁ এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো খাতে কাজ করছেন। এসব উদ্যোগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন বাজার তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।

উল্লেখ্য, রংপুর বিভাগে কৃষি, কুটিরশিল্প ও সেবা খাতের পাশাপাশি সীমিত পরিসরে বৃহৎ শিল্পও রয়েছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের রংপুর ইউনিট অঞ্চলের বৃহত্তম শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি, যেখানে খাদ্যপণ্য ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া রংপুর চিনি কল, মিষ্টি, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান অঞ্চলের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখে। রংপুর অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নের কাজ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও জমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের ধীরগতির কারণে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী অগ্রগতি হয়নি। স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগর, কর অবকাশ ও একক এক্সচেঞ্জের মতো সুবিধার দাবি জানিয়ে আসছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রংপুরের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী শিল্পভিত্তিতে রূপ দিতে হলে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, বিসিক শিল্পনগরের সমস্যা সমাধান এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুফল শিল্প, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।



Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream