নওগাঁর বদলগাছীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শহীদ মিনার ভেঙে পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। স্থাপনাটি দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণতার কারণে ধসে পড়েছে, নাকি এটি পরিকল্পিতভাবে ভাঙচুর করা হয়েছে- তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত শুরু করেছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে বদলগাছী উপজেলার আধাইপুর ইউনিয়নের বৈকুণ্ঠপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শহীদ মিনারটি ভাঙা অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয়রা। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে। পরে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে থানায় খবর দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টার দিকে বৈকুণ্ঠপুর গ্রামের মুদি ব্যবসায়ী সেকেন্দার আলী বিদ্যালয় মাঠে পানি আনতে গিয়ে শহীদ মিনারটি ভাঙা অবস্থায় দেখতে পান। পরে বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। কেউ স্থাপনাটির দুর্বল নির্মাণকাঠামো ও দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণতাকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাঙচুর বলে সন্দেহ করছেন।
বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০১৬ সালে শহীদ মিনারটি নির্মাণ করা হয়। বিদ্যালয়ের জায়গায় নির্মিত রাস্তার পাশের আধাপাকা দোকানের এক ভাড়াটিয়া নিজ অর্থায়নে ইট ও সিমেন্ট দিয়ে শহীদ মিনারটি নির্মাণ করে দেন। এরপর থেকে বিভিন্ন জাতীয় দিবসে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় লোকজন সেখানে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছিলেন।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, বিদ্যালয় মাঠে নিয়মিত খেলাধুলা হওয়ায় শহীদ মিনারটি বিভিন্ন সময়ে ধাক্কা বা আঘাতের মুখে পড়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া নির্মাণকাজে রড ব্যবহার না করে শুধু ইট ও সিমেন্ট ব্যবহারের কারণে স্থাপনাটি তুলনামূলক দুর্বল ছিল বলে তাঁদের ধারণা। কিছুদিন আগে শহীদ মিনারের একটি স্তম্ভে ফাটল দেখা দেওয়ার পাশাপাশি সেটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছিল। এসব কারণে স্থাপনাটি ধসে পড়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা শুক্লা রানী বলেন, “শহীদ মিনারটির অবস্থা আগে থেকেই নড়বড়ে ছিল। এটি নিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কারও কোনো ধরনের দ্বন্দ্ব বা কোন্দল নেই। জাতীয় দিবসগুলোতে এলাকার সবাই একত্র হয়েই এখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন।”
রাতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পাহারার ব্যবস্থা না থাকার বিষয়ে তিনি জানান, নতুন সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী দপ্তরিদের রাতের দায়িত্ব পালনে শিথিলতা থাকায় রাতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কেউ পাহারায় ছিলেন না।
ঘটনার খবর পেয়ে বদলগাছী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কামরুলের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে। পরে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমানও সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
ওসি হাবিবুর রহমান বলেন, “পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।”
এ বিষয়ে বদলগাছী উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইদুর রহমান জানান, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। ঘটনার সঠিক তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
প্রাচীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে নির্মিত শহীদ মিনারটি কীভাবে ভেঙে পড়ল, তা নিয়ে এখনো কাটেনি অনিশ্চয়তা। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটিত হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
মতামত