মাদরাসা আর মন্দির ব্যবধান মাত্র এক দেয়াল। এক পাশে দেওয়া হচ্ছে ইসলামী শিক্ষা, অপর পাশে মন্দিরে চলছে পুজা অর্চনা আর উলুধ্বনি। এভাবে শত বছর ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলছে পৃথক দুটি ধর্মের কাজ। এমন এক দৃষ্টান্ত চোখে পড়ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর শহরের রাধানগর এলাকায়।
এখানে মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রেখে শত বছর ধরে তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকান্ড পালনসহ এক সাথে বসবাস করে আসছে।
এক দেয়ালে থাকা ওই দুটি প্রতিষ্ঠান হলো আখাউড়া টেকনিক্যাল ইসলামীয়া আলিম মাদরাসা ও সনাতন ধর্মাম্বলীদের কেন্দ্রীয় শ্রীশ্রী রাধামাধব আখড়া। তাছাড়া ওই এলাকায় ছোটবড় ৫টি মসজিদ ও ৪টি মন্দির রয়েছে। তবে এক দেয়ালে এদুটি প্রতিষ্ঠান থাকলে ও মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মাঝে কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা তৈরী হয়নি।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসবে ডাক ঢোল শঙ্খ বাজিয়ে উলুধ্বনী দিয়ে পূজা অর্চনা করা হলে ও মুসলমানদের নামাজের ওয়াক্ত হওয়ার পূর্বেই মন্দিরে যেন পুজা অর্চনাসহ অন্যান্য কাজ সাময়ীকের জন্য বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে পুনরায় শুরু হয় মন্দিরের কার্যক্রম। এভাবেই উভয় ধর্মের লোকজন দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করছেন। পাশাপাশি নিয়মিত মাদরাসায় পাঠদানে ও কোন প্রকার সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। সম্প্রীতি বজায় রেখেই দুই সম্প্রদায়ের লোকজন যার যার কাজ করে উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আখাউড়া টেকনিক্যাল ইসলামীয়া আলিম মাদরাসাটি স্থানীয় লোকদের প্রচেষ্টায় ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন মাদরাসা। অপরদিকে রাধামাধব আখড়া কেন্দ্রীয় মন্দিরটি রয়েছে প্রায় ৮শ বছরের পুরনো। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবধান হলো মাত্র এক দেয়াল।
এই মাদরাসাটিতে স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গা থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী এসে পড়াশুনা করছেন। তাছাড়া মাদরাসা আশপাশে যে কয়টি মসজিদ রয়েছে মুসলমানগন নিয়মিত নামাজ পড়ছেন। এ পযর্ন্ত কোনো অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালুঘুদের উপর হামলা নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে ও এখানে থাকে ব্যতিক্রমী চিত্র। তারা সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির এক উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যার যার অবস্থান থেকে শান্তিপূর্ণ ভাবে ধর্মীয় কর্মকান্ড পালন করেন।
মো: আফজাল হোসেন ভূইয়া বলেন, এখানে এক দেয়ালে ফারাকে মাদরাসা-মন্দির থাকলেও এত কোন প্রকার সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। উভয় ধর্মের লোকজন একে অপরের সাথে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। যে কোন সমস্যা তৈরী হলে মাদরাসা-মন্দির কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে তা সমাধান করা হয়।
মাদরাসার শিক্ষার্থী মো. আবু ইউসুফ বলেন, এক দেয়ালে মাদরাসা আর মন্দির থাকলে ও আমাদের পাঠদানে কোন প্রকার সমস্যা হয় না।
রাধানগর এলাকার বাসিন্দা মো: আশরাফুল আলম, এক দেয়ালে মাদরাসা মন্দির থাকলেও আমাদের সম্পর্কের ঘাটতি হয়নি। বরং দু’ধর্মের লোকজন সব সময় ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এখানে বসবাস করছে। মাদরাসা মন্দির পাশাপাশি থাকাটা সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
রাধামাধব আখড়া কমিটির সাধারণ সম্পাদক অলক কুমার চক্রবর্তী বলেন, শ্রী শ্রী রাধামাধব আখড়া (মন্দির) প্রায় ৮শ বছর পূর্বে বীরবিক্রম রাধা কিশোর মানিক্য বাহাদুর প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে দু’ধর্মের লোকদের সম্পর্ক হলো সুদীর্ঘ বছরের। ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ সকল সমাজিক অনুষ্ঠানে একে অপরকে দাওয়াত দেওয়া হয়। দীর্ঘ বছরের সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির এক উজ্জল দৃষ্টান্ত স্বাক্ষী হয়ে আছে।
আখাউড়া টেকনিকেল ইসলামিয়া আলিম মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাও: নাসির উদ্দিন বলেন মুসলমানরা সব সময় অন্য ধর্মের প্রতি খুবই সহানুভূতিশীল রয়েছে। এখানে যার যার ধর্ম সে পালন করছেন কোন প্রকার বিপত্তি ঘটছে না। তার বাস্তব প্রমাণ এক দেয়ালে মাদরাসা ও মন্দিরের অবস্থান। এখানে উভয় ধর্মের লোকজন সমাজিক সম্প্রীতি বজায় রেখে দীর্ঘ বছর ধরে চলাচল করছে। উভয় ধর্মের লোকজন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একে অপরকে দাওয়াত দিয়ে আসছে। আমাদের সম্পর্কের কোন ঘাটতি নেই।
মতামত