ঘুমের মধ্যে অজান্তে দাঁত চেপে ধরা বা ঘষার অভ্যাসকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ব্রুক্সিজম’ (Bruxism) বলা হয়। মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং ঘুমের বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই সমস্যাটিকে দীর্ঘদিন অবহেলা করলে চোয়ালে তীব্র ব্যথা, মাথাব্যথা, দাঁতের মারাত্মক ক্ষয় এমনকি দাঁত ভেঙে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভ্যাসটি কেবল রাতের ঘুমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; অনেকেই জেগে থাকা অবস্থায়ও অজান্তে দাঁত চেপে রাখেন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রাহি পোপাট জানান, মানসিক চাপ বা ট্রমা শরীরকে ‘লড়াই করো অথবা পালাও’ (Fight or Flight) প্রতিক্রিয়ায় ঠেলে দেয়। ফলে হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায় এবং পেশিগুলো অস্বাভাবিকভাবে টানটান হয়ে ওঠে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে চোয়ালের পেশিতে, যা দাঁত চেপে ধরা বা ঘষার প্রবণতা তৈরি করে। অনেক রোগীই তাদের জীবনের কোনো চাপপূর্ণ সময়ের সঙ্গে এই অভ্যাসের শুরু বা তীব্রতা বৃদ্ধির মিল খুঁজে পান।
ব্রুক্সিজম শনাক্ত করার লক্ষণসমূহ:
যেহেতু বেশিরভাগ মানুষ গভীর ঘুমে থাকার কারণে নিজে এই অভ্যাস টের পান না, তাই কিছু শারীরিক সংকেত দেখে এটি চিহ্নিত করা সম্ভব—
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মাথা বা মুখে ব্যথা অনুভব করা।
চোয়াল শক্ত হয়ে থাকা।
দাঁত ক্ষয়ে যাওয়া বা চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া।
দাঁতে অস্বাভাবিক সংবেদনশীলতা তৈরি হওয়া।
কান বা কানের আশপাশে ব্যথা।
ঘুমের ব্যাঘাতজনিত কারণে দিনে অতিরিক্ত ক্লান্তি বা অবসাদ।
দন্তচিকিৎসক ড. সাইমন কোভ সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিন দাঁত ঘষার ফলে দাঁতের উপরিভাগ উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষয়ে যায় এবং গুরুতর ক্ষেত্রে দাঁত ভেঙেও যেতে পারে। অনেক রোগী নিজেরা এই অভ্যাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকলেও ডেন্টাল পরীক্ষায় ক্ষতির স্পষ্ট চিহ্ন ধরা পড়ে। তাছাড়া দাঁতের ব্যাপক ক্ষয়ের চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল হতে পারে।
মাউথগার্ড ব্যবহার: দন্ত বিশেষজ্ঞ ডা. আদিতি দেশাই জানান, রাতে মাউথগার্ড ব্যবহার করলে দাঁতকে যান্ত্রিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। তবে শুধু এটি পরলেই মূল সমস্যার সমাধান হয় না।
দাঁত কিড়মিড় করার পেছনের মূল কারণ—বিশেষ করে ‘অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’র (যে রোগে ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাসনালি বাধাগ্রস্ত হয়) মতো ঘুমজনিত রোগের উপস্থিতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রস্থোডন্টিকস বিশেষজ্ঞ ডা. রিয়াজ ইয়ারের মতে, ব্রুক্সিজমকে কেবল দাঁত বা চোয়ালের যান্ত্রিক সমস্যা হিসেবে না দেখে মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, মানসিক স্বাস্থ্য ও ঘুমের সার্বিক অবস্থার মূল্যায়ন করা উচিত।
সকালে নিয়মিত চোয়াল বা মাথাব্যথা, দাঁতের ক্ষয় বা ঘুমের সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত দন্তচিকিৎসক কিংবা প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বা স্লিপ স্পেশালিস্টের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। কেবল উপসর্গ না কমিয়ে সমস্যার মূল কারণ শনাক্ত করতে পারলে তবেই দীর্ঘমেয়াদী ও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।
মতামত