স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদনের বিষয়ে চলতি অক্টোবর মাসেই সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা করছে সরকার। পাশাপাশি ২০২৭ সালের মধ্যে ৮ থেকে ১০টি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা শেষ করা এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ঢাকায় আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।
মন্ত্রী বলেন, আগামী ২৪ নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার আগেই এলডিসি উত্তরণের সময় তিন বছর বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পাওয়ার ব্যাপারে সরকার আশাবাদী। অক্টোবরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।
বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) যৌথ উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের পথপরিক্রমা: গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত বিকল্প অনুসন্ধান’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি জানান, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের আরও সময় প্রয়োজন। এ কারণে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। বাড়তি সময় পেলে প্রস্তুতি জোরদারে একটি সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে, যার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও ইতোমধ্যে পরিচিত করা হয়েছে।
এলডিসি উত্তরণের পর বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়া বা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে ৮ থেকে ১০টি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। ওমান, সিঙ্গাপুর ও নিউজিল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম চলছে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এলডিসি উত্তরণের আগেই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে ইইউর ২৭টি সদস্যদেশের সঙ্গে আলোচনা পরিচালনার জন্য একজন প্রধান আলোচক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফার কারিগরি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি চললেও তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।
ইইউর কয়েকটি সদস্যদেশের মন্ত্রী, বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত এবং ইউরোপীয় বাণিজ্য কমিশনারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এফটিএর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের জেনারেলাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস প্লাস (জিএসপি প্লাস) সুবিধা পাওয়ার চেষ্টাও অব্যাহত থাকবে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তবে এ সুবিধার ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন হওয়ার আগেই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করতে চায় সরকার।
এদিকে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃহৎ বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) যোগদানের প্রক্রিয়া শুরুর নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে বাংলাদেশ। এ প্রক্রিয়া তদারকির জন্য বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও অন্য একটি দেশের অংশগ্রহণসংক্রান্ত কার্যক্রমে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
প্রস্তুতির ঘাটতিতে সময় বাড়ানোর উদ্যোগ
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ এখনো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারেনি। এ কারণে বাড়তি সময় চাওয়া হয়েছে।
তিনি জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কৌশলগত মজুতের অভাব এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখনো আমদানি করা গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। পর্যাপ্ত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বা দাম বেড়ে গেলে ঝুঁকিতে পড়তে হয় দেশকে।
এ ছাড়া সয়াবিন তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুত না থাকায় আকস্মিক সরবরাহ সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাও সীমিত বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রীর মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছায়। তাই ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।
সরকারের লক্ষ্য, এলডিসি উত্তরণের আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি জোরদার করা, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং রপ্তানি ও বিনিয়োগের গতি ধরে রাখা।
মতামত