ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলায় তীব্র জনবল সংকটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। উপজেলার ৩৩টি সরকারি দপ্তরের মধ্যে অন্তত ১১টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে নিয়মিত কর্মকর্তা না থাকায় অন্য কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে একদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ওপর বাড়ছে অতিরিক্ত কাজের চাপ, অন্যদিকে ধীরগতি তৈরি হচ্ছে সরকারি সেবায়। ফলে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দপ্তর বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এসব দপ্তরের মধ্যে রয়েছে উপজেলা ভূমি অফিস, সমাজসেবা অধিদপ্তর, উপজেলা মৎস্য অফিস, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস, সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়, উপজেলা শিক্ষা অফিস, উপজেলা সহকারী প্রোগ্রামারের কার্যালয়, উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস, উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিস, উপজেলা পল্লী উন্নয়ন অফিস, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, সহকারী প্রকৌশলী (বিএডিসি), বিআরডিবি ও ফায়ার সার্ভিস স্টেশন।
শুধু প্রশাসনিক দপ্তর নয়, জনবল সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে উপজেলার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও। বিজয়নগরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অনুমোদিত ১০০টি প্রধান শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৫২ জন। শূন্য রয়েছে ৪৮টি পদ। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে পাঠদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের হিসাব-নিকাশ, দাপ্তরিক চিঠিপত্র, অনলাইন কার্যক্রম, প্রশাসনিক কাজ এবং উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সভায় অংশগ্রহণ করতে হচ্ছে শিক্ষকদের। এতে স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি শিক্ষকদের ওপরও বাড়ছে প্রশাসনিক চাপ।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে অনুমোদিত ১২৮টি পদের বিপরীতে ৫৮টি পদ শূন্য রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় কর্মরতদের বাড়তি চাপ নিয়ে সেবা দিতে হচ্ছে। এতে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা পেতে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এদিকে জনবল সংকটের পাশাপাশি উপজেলার উন্নয়ন ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সড়কের টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত কাজ শুরু হচ্ছে না। আবার কোনো কোনো উন্নয়নকাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না হওয়ায় জনভোগান্তি বাড়ছে।
সীমান্তবর্তী উপজেলা হওয়ায় বিজয়নগরে মাদক ও চোরাচালান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাঁদের অভিযোগ, সীমান্ত দিয়ে মাদকদ্রব্য ও বিভিন্ন চোরাচালানি পণ্য প্রবেশ করছে। একই সঙ্গে এলাকায় অনলাইন জুয়ার প্রবণতাও বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাতের আঁধারে পুকুর ও কৃষিজমি ভরাটের ঘটনাও ঘটছে। পাশাপাশি নৌ ও সড়কপথে বিভিন্ন ইটভাটায় কৃষিজমির মাটি পরিবহনের কারণে আবাদি জমি ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের মতে, জনবল সংকটের কারণে একাধিক দপ্তরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ বাড়ছে। ফলে সরকারি সেবার গতি স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত শূন্য পদগুলোতে জনবল নিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে উন্নয়নকাজে গতি আনা, মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন জুয়া বন্ধ এবং কৃষিজমি ও জলাশয় রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বিজয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, “আমরা জেলা প্রশাসক মহোদয় ও এমপি মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছি এবং বিষয়টি অবগত করেছি। আশা করি খুব শিগগিরই সমাধান হবে।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সুমন ভূঁইয়া বলেন, “স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। দ্রুত জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে বলে আমরা আশাবাদী।”
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামসুর রহমান বলেন, “শূন্য পদগুলো পূরণে পর্যায়ক্রমে পদোন্নতি ও নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে প্রধান শিক্ষক সংকট কমে যাবে।”
উপজেলাবাসীর দাবি, জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের চাপ কমাতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে শূন্য পদ পূরণ, উন্নয়নকাজে গতি এবং মাদক-চোরাচালান, অনলাইন জুয়া ও কৃষিজমি-জলাশয় রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। জনসেবার স্বার্থে দীর্ঘদিনের এসব সংকটের দ্রুত সমাধান এখন সময়ের দাবি।
মতামত