মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা পরিষদ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও থানার মূল ফটকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে শুভেচ্ছা পোস্টার ও রঙিন বেলুন লাগানোর ঘটনায় এলাকায় আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ভোরে অল্প সময়ের ব্যবধানে এসব পোস্টার লাগানোর ঘটনায় প্রশাসনের নিরাপত্তা ও নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ ঘটনায় কালকিনি পৌরসভার সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা এনায়েত হোসেন হাওলাদারের বড় ভাই হেমায়েত হাওলাদারকে আটকের পর তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন ,পোস্টার লাগানোর ঘটনায় হেমায়েত হাওলাদারের সরাসরি ভূমিকা কী এবং তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী?
তবে প্রশাসন ও পুলিশের দাবি, পারিবারিক পরিচয়ের কারণে নয়, পোস্টার লাগানোর ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার পরই তাকে আটক করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্তে তিনি নিরপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ভোরে কালকিনি উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের আশপাশ, কালকিনি থানার ফটক ও সীমানা দেয়ালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শেখ হাসিনার ছবি ও জন্মদিনের শুভেচ্ছাবার্তা সংবলিত পোস্টার লাগানো হয়। বিভিন্ন স্থানে রঙিন বেলুনও লাগানো হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
পরে পোস্টার লাগানোর কিছু ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় সূত্র ও প্রকাশিত ভিডিওতে উপজেলা পরিষদ ও থানার সামনে একই ধরনের পোস্টার দেখা যায়।
কালকিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কিশোর কুমার দাস বলেন, ফজরের আজানের পর প্রায় ১০ মিনিটের একটি সময়ের ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি উপজেলা পরিষদ, থানা ও বিভিন্ন স্থানে পোস্টার লাগিয়েছেন বলে প্রশাসনের কাছে তথ্য এসেছে।
তিনি বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পোস্টারগুলো অপসারণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের শনাক্তে কাজ শুরু করে।
প্রকাশিত ছবি-ভিডিওসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে কারা ঘটনায় জড়িত ছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হেমায়েত হাওলাদারকে আটকের বিষয়ে ইউএনও বলেন, তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক পর্যায়ে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্তে তিনি নিরপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো নিরীহ ব্যক্তিকে হয়রানি করা প্রশাসনের উদ্দেশ্য নয়। ঘটনার সঙ্গে প্রকৃতভাবে যারা জড়িত, তাদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই প্রশাসনের লক্ষ্য।
কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল আলম বলেন, খুব ভোরে থানার একটি বন্ধ গেটের সামনে পোস্টার লাগানো হয়। জনবল সংকটের কারণে থানার প্রতিটি গেট বা প্রবেশপথে সার্বক্ষণিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন রাখা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে এনায়েত হোসেন হাওলাদারের নেতৃত্বে কয়েকজনের পোস্টার লাগানোর বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের সঙ্গে হেমায়েত হাওলাদারের যোগাযোগ বা সংশ্লিষ্টতারও প্রাথমিক তথ্য পাওয়ায় তাকে আটক করা হয়েছে।
তবে হেমায়েত হাওলাদারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশ জানায়, তদন্ত এখনো চলছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পোস্টার লাগানোর ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে এনায়েত হাওলাদারসহ চারজনকে আসামি করে এবং আরও অজ্ঞাত ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করে মামলা করেছে।
মামলায় রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপসংক্রান্ত আইন/ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
নির্দিষ্ট ধারা এবং এ মামলায় হেমায়েত হাওলাদার আসামি কি না এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ।
হেমায়েত হাওলাদারকে আটকের পর স্থানীয় পর্যায়ে তার পারিবারিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। স্বজন ও আটকের প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় পরিবারের অন্য সদস্যের ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বর্তায় না।
তাদের দাবি, হেমায়েত হাওলাদার যদি পোস্টার লাগানো বা সংশ্লিষ্ট কোনো ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকেন, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে তা প্রমাণ করা হোক। প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে শুধু আত্মীয়তার পরিচয়ের ভিত্তিতে যেন কাউকে হয়রানি করা না হয়।
থানা, উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ভোরে অল্প সময়ের মধ্যে পোস্টার লাগানোর ঘটনায় প্রশাসনের নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের কয়েকজনের প্রশ্ন, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার প্রবেশপথ ও আশপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার পরও কীভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যে এতগুলো পোস্টার লাগানো হলো। বিষয়টি নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
তবে পুলিশ বলছে, জনবল সীমাবদ্ধতার কারণে সব প্রবেশপথে সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়া সম্ভব হয় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও যাচাই
পোস্টার লাগানোর সময় ধারণ করা ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি দ্রুত আলোচনায় আসে। পুলিশ জানিয়েছে, এসব ভিডিও, ছবি ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ঘটনার সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।
ঘটনার বিষয়ে কালকিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন বিএনপি নেতার ভাষ্য, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রচারণামূলক পোস্টার লাগানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। তাদের কেউ কেউ প্রশাসনের নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে এ বিষয়ে কালকিনি উপজেলা বিএনপির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তেই নির্ধারিত হবে হেমায়েতের ভূমিকা ,ঘটনাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পোস্টার লাগানোর ঘটনায় হেমায়েত হাওলাদারের সরাসরি ভূমিকার বিষয়ে এখনো তদন্তের প্রক্রিয়াধীন।
পুলিশ ও প্রশাসন তার সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা বললেও অভিযোগের বিস্তারিত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
ফলে পোস্টার লাগানোর ঘটনায় হেমায়েত হাওলাদারের প্রকৃত ভূমিকা এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
একই সঙ্গে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে পোস্টার লাগানো হলো, কারা এতে অংশ নিয়েছেন এবং প্রত্যেকের ভূমিকা কী ছিল এসব বিষয়ও তদন্তে স্পষ্ট হওয়ার কথা।
স্থানীয়দের একাংশের প্রত্যাশা, যারা সরাসরি ঘটনায় জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করবে প্রশাসন।
মতামত