শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩
Bangla FM

বিদ্যুতের মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নিয়ে প্রশ্ন ও আপত্তি কেন?


ডেস্ক নিউজ
ডেস্ক নিউজ
| ফটো কার্ড

বিদ্যুতের মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নিয়ে প্রশ্ন ও আপত্তি কেন?
ছবি: সংগৃহীত

দেশে বিদ্যুতের বিল নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে অসন্তোষ বাড়ছে। জুনে বিদ্যুতের নতুন দাম নির্ধারণের পর শহর ও গ্রাম দুই এলাকাতেই প্রিপেইড এবং পোস্টপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের অনেকে বিল বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করছেন।

বিদ্যুৎ ব্যবহারের মূল খরচের পাশাপাশি মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও বিলম্ব মাশুল যুক্ত হওয়ায় প্রকৃত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভোক্তারা। প্রিপেইড মিটারে অগ্রিম টাকা জমা দেওয়ার পর বিভিন্ন চার্জ কেটে নেওয়ার বিষয়টিও অনেকের কাছে বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের সাতটি স্ল্যাব রয়েছে। নতুন দরে ৪০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম ১৫ টাকা ১ পয়সা। ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারে পরবর্তী প্রতি ইউনিটের জন্য দিতে হয় ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। এর সঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হয়।

পোস্টপেইড বিলের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ইউনিটের হিসাবের পাশাপাশি গ্রাহকের অনুমোদিত লোড অনুযায়ী প্রতি কিলোওয়াটে ৪২ টাকা করে ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হয়। মিটার কেনা না থাকলে যুক্ত হয় মিটার ভাড়াও। আগের কোনো বিল বকেয়া থাকলে তার সঙ্গে বিলম্ব মাশুলও যোগ হয়।

বিদ্যুৎ খাতে ডিমান্ড চার্জ মূলত অবকাঠামো, ট্রান্সফরমার, বিতরণ লাইন ও সংযোগ প্রস্তুত রাখার জন্য নেওয়া হয়। আর মিটার ভাড়া নেওয়া হয় মিটার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ হিসেবে।

বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি কিলোওয়াট লোডের জন্য ডিমান্ড চার্জ ৪২ টাকা। ফলে দুই কিলোওয়াট লোডের গ্রাহককে মাসে ৮৪ টাকা এবং ১০ কিলোওয়াট লোডের ক্ষেত্রে ৪২০ টাকা দিতে হয়।

গ্রাহকদের অভিযোগ, সংযোগ নেওয়ার সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি লোড অনুমোদন করা হলে পরবর্তী সময়ে ব্যবহার কম হলেও সেই অতিরিক্ত লোডের জন্য প্রতি মাসে ডিমান্ড চার্জ দিতে হয়।

একজন গ্রাহক জানান, কারিগরি বিষয়টি না বোঝার কারণে তিনি ১৫ কিলোওয়াট লোডের সংযোগ নিয়েছেন। ফলে প্রতি মাসে শুধু ডিমান্ড চার্জ বাবদ ৬৩০ টাকা দিতে হচ্ছে।

এর সঙ্গে থ্রি-ফেজ সংযোগের মিটার ভাড়া ২৫০ টাকা যুক্ত হলে মাসিক অতিরিক্ত খরচ দাঁড়ায় ৮৮০ টাকা পর্যন্ত।

বিদ্যুৎ বিল আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়ানো, বকেয়া কমানো এবং রাজস্ব সংগ্রহ সহজ করতে দেশে প্রিপেইড মিটার চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার। নতুন সংযোগ কিংবা পুরোনো মিটার নষ্ট হলে অনেক ক্ষেত্রে প্রিপেইড মিটার দেওয়ার নিয়ম চালু করা হয়েছে।

বিতরণ সংস্থার হিসাবে একটি সিঙ্গেল ফেজ প্রিপেইড মিটারের দাম ৬ হাজার টাকা। ১০ বছরের আয়ুষ্কাল ধরে ১২০ মাসে মাসে ৪০ টাকা করে এর ভাড়া আদায় করা হয়। থ্রি-ফেজ মিটারের দাম ২৫ হাজার টাকা এবং এর জন্য মাসে ২৫০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। ১০ বছরের মধ্যে মিটার নষ্ট হলে বিতরণ সংস্থার পক্ষ থেকে বিনা খরচে নতুন মিটার দেওয়ার কথা রয়েছে।

প্রিপেইড মিটারে টাকা রিচার্জ করার সময় মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ এবং এনার্জি বিলের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আগেই কেটে নেওয়া হয়। এরপর অবশিষ্ট টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারেন গ্রাহক। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেও টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে অনেকের মধ্যে।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার এক গ্রাহক প্রশ্ন তুলেছেন, মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ কোন ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে এবং কতদিন এভাবে নেওয়া হবে, সেটি তাদের কাছে পরিষ্কার নয়।

ফরাজিকান্দা গ্রামের এক নারী গ্রাহক বলেন, বিদ্যুৎ না পেলেও মিটারে টাকা দ্রুত কমে যাচ্ছে। তার অভিযোগ, ৫০০ টাকা রিচার্জ করলে প্রায় ১৫০ টাকা বিভিন্ন খাতে কেটে নেওয়া হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিতরণ সংস্থাগুলোর দাবি, প্রিপেইড মিটার চালু হলে বিলসংক্রান্ত ভোগান্তি কমবে। তবে নতুন মিটার স্থাপন নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বাধার মুখে পড়ছে বিতরণ সংস্থাগুলো।

অগ্রিম টাকা কেটে নেওয়া, বিল বেড়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন ধরনের জটিলতার আশঙ্কায় কয়েকটি জেলায় প্রিপেইড মিটারবিরোধী জনমত তৈরি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে এ নিয়ে গণঅনশন, সভা-সমাবেশ হয়েছে এবং নাগরিক অধিকার ফোরামও গঠিত হয়েছে। সেখানে মিটার ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

নাগরিক অধিকার ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, গ্রাহকরা অগ্রিম অর্থ দিতে আগ্রহী নন। প্রিপেইড মিটার চালুর আগে গণশুনানির মাধ্যমে বিষয়টি জনগণকে বোঝানোর প্রয়োজন ছিল। তার দাবি, দেশের প্রায় ৩০টি জেলায় এ নিয়ে আন্দোলন চলছে এবং গ্রাহক অধিকার রক্ষায় জাতীয় কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

ভোক্তা সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া নিয়ে ভোক্তাদের প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তার মতে, মিটারকে গ্রাহকের সুবিধা হিসেবে দেখার কথা থাকলেও অনেকের কাছে এটি এখন অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মাধ্যম হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।

তিনি ডিমান্ড চার্জ পর্যালোচনার পাশাপাশি মিটার ভাড়াকে বিতরণ চার্জের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিতরণ সংস্থাগুলো যখন গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না, তখন ডিমান্ড চার্জের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী বলেন, ডিমান্ড চার্জের বিনিময়ে গ্রাহক পুরো মাসে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু ব্যবহার কম হওয়ার পাশাপাশি সরবরাহে ঘাটতি থাকলে এই চার্জ নিয়ে গ্রাহকের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

তার মতে, গ্রাহকদের অভিযোগগুলো স্বাধীন কোনো সংস্থার মাধ্যমে অডিট ও যাচাই করা হলে আস্থা বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারের পরিকল্পনা হলো মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের ৮০ শতাংশকে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা।

ডিপিডিসির প্রকল্প পরিচালক মো. হানিফ উদ্দিন বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে জনগণকে ভুল ধারণা দেওয়া হচ্ছে। তার দাবি, পোস্টপেইডের মতো প্রিপেইড মিটারেও একই হারে ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হয় এবং অতিরিক্ত কোনো অর্থ কাটা হয় না।

তিনি জানান, গ্রাহক এককালীন মিটার কিনে না দিলে ভাড়া নেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা বর্তমানে বিদ্যুৎ বিলের ওপর ০ দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট বা ছাড় পান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মিটার ভাড়া ও বিভিন্ন চার্জের যৌক্তিকতা নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

তবে বিইআরসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যাচাই-বাছাই করেই ডিমান্ড চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও ডিমান্ড চার্জ বাড়ানো হয়নি। প্রিপেইড মিটার নিয়ে সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির পর্যালোচনাতেও কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে প্রিপেইড মিটারের ভাড়ার বিষয়টি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল বলে জানিয়েছে বিইআরসি।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বিদ্যুতের মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নিয়ে প্রশ্ন ও আপত্তি কেন?

প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

দেশে বিদ্যুতের বিল নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে অসন্তোষ বাড়ছে। জুনে বিদ্যুতের নতুন দাম নির্ধারণের পর শহর ও গ্রাম দুই এলাকাতেই প্রিপেইড এবং পোস্টপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের অনেকে বিল বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করছেন।

বিদ্যুৎ ব্যবহারের মূল খরচের পাশাপাশি মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও বিলম্ব মাশুল যুক্ত হওয়ায় প্রকৃত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভোক্তারা। প্রিপেইড মিটারে অগ্রিম টাকা জমা দেওয়ার পর বিভিন্ন চার্জ কেটে নেওয়ার বিষয়টিও অনেকের কাছে বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের সাতটি স্ল্যাব রয়েছে। নতুন দরে ৪০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম ১৫ টাকা ১ পয়সা। ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারে পরবর্তী প্রতি ইউনিটের জন্য দিতে হয় ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। এর সঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হয়।

পোস্টপেইড বিলের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ইউনিটের হিসাবের পাশাপাশি গ্রাহকের অনুমোদিত লোড অনুযায়ী প্রতি কিলোওয়াটে ৪২ টাকা করে ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হয়। মিটার কেনা না থাকলে যুক্ত হয় মিটার ভাড়াও। আগের কোনো বিল বকেয়া থাকলে তার সঙ্গে বিলম্ব মাশুলও যোগ হয়।

বিদ্যুৎ খাতে ডিমান্ড চার্জ মূলত অবকাঠামো, ট্রান্সফরমার, বিতরণ লাইন ও সংযোগ প্রস্তুত রাখার জন্য নেওয়া হয়। আর মিটার ভাড়া নেওয়া হয় মিটার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ হিসেবে।

বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি কিলোওয়াট লোডের জন্য ডিমান্ড চার্জ ৪২ টাকা। ফলে দুই কিলোওয়াট লোডের গ্রাহককে মাসে ৮৪ টাকা এবং ১০ কিলোওয়াট লোডের ক্ষেত্রে ৪২০ টাকা দিতে হয়।

গ্রাহকদের অভিযোগ, সংযোগ নেওয়ার সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি লোড অনুমোদন করা হলে পরবর্তী সময়ে ব্যবহার কম হলেও সেই অতিরিক্ত লোডের জন্য প্রতি মাসে ডিমান্ড চার্জ দিতে হয়।

একজন গ্রাহক জানান, কারিগরি বিষয়টি না বোঝার কারণে তিনি ১৫ কিলোওয়াট লোডের সংযোগ নিয়েছেন। ফলে প্রতি মাসে শুধু ডিমান্ড চার্জ বাবদ ৬৩০ টাকা দিতে হচ্ছে।

এর সঙ্গে থ্রি-ফেজ সংযোগের মিটার ভাড়া ২৫০ টাকা যুক্ত হলে মাসিক অতিরিক্ত খরচ দাঁড়ায় ৮৮০ টাকা পর্যন্ত।

বিদ্যুৎ বিল আদায়ে স্বচ্ছতা বাড়ানো, বকেয়া কমানো এবং রাজস্ব সংগ্রহ সহজ করতে দেশে প্রিপেইড মিটার চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার। নতুন সংযোগ কিংবা পুরোনো মিটার নষ্ট হলে অনেক ক্ষেত্রে প্রিপেইড মিটার দেওয়ার নিয়ম চালু করা হয়েছে।

বিতরণ সংস্থার হিসাবে একটি সিঙ্গেল ফেজ প্রিপেইড মিটারের দাম ৬ হাজার টাকা। ১০ বছরের আয়ুষ্কাল ধরে ১২০ মাসে মাসে ৪০ টাকা করে এর ভাড়া আদায় করা হয়। থ্রি-ফেজ মিটারের দাম ২৫ হাজার টাকা এবং এর জন্য মাসে ২৫০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। ১০ বছরের মধ্যে মিটার নষ্ট হলে বিতরণ সংস্থার পক্ষ থেকে বিনা খরচে নতুন মিটার দেওয়ার কথা রয়েছে।

প্রিপেইড মিটারে টাকা রিচার্জ করার সময় মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ এবং এনার্জি বিলের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আগেই কেটে নেওয়া হয়। এরপর অবশিষ্ট টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারেন গ্রাহক। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেও টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে অনেকের মধ্যে।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার এক গ্রাহক প্রশ্ন তুলেছেন, মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ কোন ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে এবং কতদিন এভাবে নেওয়া হবে, সেটি তাদের কাছে পরিষ্কার নয়।

ফরাজিকান্দা গ্রামের এক নারী গ্রাহক বলেন, বিদ্যুৎ না পেলেও মিটারে টাকা দ্রুত কমে যাচ্ছে। তার অভিযোগ, ৫০০ টাকা রিচার্জ করলে প্রায় ১৫০ টাকা বিভিন্ন খাতে কেটে নেওয়া হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিতরণ সংস্থাগুলোর দাবি, প্রিপেইড মিটার চালু হলে বিলসংক্রান্ত ভোগান্তি কমবে। তবে নতুন মিটার স্থাপন নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বাধার মুখে পড়ছে বিতরণ সংস্থাগুলো।

অগ্রিম টাকা কেটে নেওয়া, বিল বেড়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন ধরনের জটিলতার আশঙ্কায় কয়েকটি জেলায় প্রিপেইড মিটারবিরোধী জনমত তৈরি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে এ নিয়ে গণঅনশন, সভা-সমাবেশ হয়েছে এবং নাগরিক অধিকার ফোরামও গঠিত হয়েছে। সেখানে মিটার ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

নাগরিক অধিকার ফোরামের প্রধান উপদেষ্টা মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, গ্রাহকরা অগ্রিম অর্থ দিতে আগ্রহী নন। প্রিপেইড মিটার চালুর আগে গণশুনানির মাধ্যমে বিষয়টি জনগণকে বোঝানোর প্রয়োজন ছিল। তার দাবি, দেশের প্রায় ৩০টি জেলায় এ নিয়ে আন্দোলন চলছে এবং গ্রাহক অধিকার রক্ষায় জাতীয় কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

ভোক্তা সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া নিয়ে ভোক্তাদের প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তার মতে, মিটারকে গ্রাহকের সুবিধা হিসেবে দেখার কথা থাকলেও অনেকের কাছে এটি এখন অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মাধ্যম হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।

তিনি ডিমান্ড চার্জ পর্যালোচনার পাশাপাশি মিটার ভাড়াকে বিতরণ চার্জের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিতরণ সংস্থাগুলো যখন গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না, তখন ডিমান্ড চার্জের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী বলেন, ডিমান্ড চার্জের বিনিময়ে গ্রাহক পুরো মাসে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু ব্যবহার কম হওয়ার পাশাপাশি সরবরাহে ঘাটতি থাকলে এই চার্জ নিয়ে গ্রাহকের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

তার মতে, গ্রাহকদের অভিযোগগুলো স্বাধীন কোনো সংস্থার মাধ্যমে অডিট ও যাচাই করা হলে আস্থা বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারের পরিকল্পনা হলো মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের ৮০ শতাংশকে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা।

ডিপিডিসির প্রকল্প পরিচালক মো. হানিফ উদ্দিন বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে জনগণকে ভুল ধারণা দেওয়া হচ্ছে। তার দাবি, পোস্টপেইডের মতো প্রিপেইড মিটারেও একই হারে ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হয় এবং অতিরিক্ত কোনো অর্থ কাটা হয় না।

তিনি জানান, গ্রাহক এককালীন মিটার কিনে না দিলে ভাড়া নেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা বর্তমানে বিদ্যুৎ বিলের ওপর ০ দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট বা ছাড় পান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মিটার ভাড়া ও বিভিন্ন চার্জের যৌক্তিকতা নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

তবে বিইআরসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যাচাই-বাছাই করেই ডিমান্ড চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও ডিমান্ড চার্জ বাড়ানো হয়নি। প্রিপেইড মিটার নিয়ে সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির পর্যালোচনাতেও কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে প্রিপেইড মিটারের ভাড়ার বিষয়টি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল বলে জানিয়েছে বিইআরসি।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream