আওয়ামী লীগের বান্দরবান পার্বত্য জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য লক্ষ্মীপদ দাস এবং তার স্ত্রী সীমা দাসের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ব্যাপক অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তোলার প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর থেকেই লক্ষ্মীপদ দাস ও সীমা দাসের মোবাইল নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে দুদকের কক্সবাজার সমন্বিত জেলা কার্যালয় থেকে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংকে নথি চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে লক্ষ্মীপদ দাসের আর্থিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের তথ্য চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানের বিষয়টি নিশ্চিত করে দুদকের কক্সবাজার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হুমায়ুন বিন আহমদ জানান, লক্ষ্মীপদ দাস ও তার স্ত্রীর সম্পদের বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে জোর অনুসন্ধান চলছে। আইনি প্রক্রিয়া ও প্রমাণের স্বার্থে অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।দুদক সূত্রে জানা গেছে, টানা দুবার বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগে লক্ষ্মীপদ দাস পুরো জেলার সরকারি দপ্তরগুলোতে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেন। তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রধান অভিযোগগুলো হলো:
সরকারি দপ্তরের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ: পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, বান্দরবান জেলা পরিষদ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং বিএডিসি-সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উন্নয়ন কাজের টেন্ডার ভাগিয়ে নিয়ে ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া।
স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করার দোহাই দিয়ে বান্দরবানের বিভিন্ন অবৈধ ইটভাটা মালিকদের কাছ থেকে নিয়মিত লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায়। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বান্দরবানের সুয়ালকে নিজস্ব একটি অবৈধ ইটভাটা পরিচালনা করা।
কয়েক বছরের ব্যবধানে লক্ষ্মীপদ দাস ও তার স্ত্রী সীমা দাস (যিনি বান্দরবানের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক) নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। তাদের উল্লেখযোগ্য সম্পদগুলোর মধ্যে রয়েছে: বান্দরবান সদরের প্রাণকেন্দ্র রাজারমাঠের পাশে বিলাসবহুল বহুতল আবাসিক ভবন। পাসপোর্ট অফিসের পাশে আনুমানিক ১ কোটি টাকা মূল্যের ১৬ শতক জমি। কালাঘাটায় প্রায় ১.৫ কোটি টাকা মূল্যের ১ একর জমি। রেইচা চিনিপাড়ায় কোটি টাকা মূল্যের জমি এবং লেমুঝিরি এলাকায় নামে-বেনামে প্রায় অর্ধকোটি টাকার জায়গা।
বান্দরবান শহরের ভেতরের বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় প্রধান শিক্ষক সীমা দাসের নামে কোটি টাকা মূল্যের দুটি পৃথক প্লট।
রাজধানী ঢাকা এবং ভারতের কলকাতা শহরে তাদের একাধিক অভিজাত ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপদ দাস মোট ১৩ বার এবং তার স্ত্রী সীমা দাস ৭ বার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। সরকারি চাকরি ও রাজনৈতিক পদের আড়ালে তাদের এই ঘনঘন বিদেশ ভ্রমণ মূলত হুন্ডি বা অবৈধ উপায়ে বিদেশে টাকা পাচারের অংশ কি না, তা-ও দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর থেকেই লক্ষ্মীপদ দাস ও সীমা দাসের মোবাইল নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এর ফলে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য পদ ও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে তারা বান্দরবানের পুরো ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
মতামত