স্বামী নেই। দুই সন্তান শারীরিক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ঘরে অসুস্থ শাশুড়ি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হয়ে প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে ছুটছেন নীলফামারীর ডোমার উপজেলার হাসিনা বেগম। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার সংগ্রামী জীবনের গল্প উঠে আসার পর এবার তার পাশে দাঁড়িয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শায়লা সাঈদ তন্বী।
রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুরে উপজেলার ভোগডাবুড়ি ইউনিয়নের গোসাইগঞ্জ ঝাক্কুয়াপাড়া গ্রামে হাসিনা বেগমের বাড়িতে গিয়ে তার শারীরিক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী দুই সন্তানের জন্য দুটি হুইলচেয়ার ও উপহারসামগ্রী তুলে দেন ইউএনও।
হাসিনা বেগম ওই গ্রামের বাসিন্দা। প্রায় চার বছর আগে তার স্বামী মুশিয়ারের রহমান মারা যাওয়ার পর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। তিন সন্তানের মধ্যে হাইউল হক (১৯) ও মনি আক্তার (১৪) শারীরিক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। তারা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না। অপর সন্তান হাবিব ইসলাম (১৯) এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।
সংসার চালাতে প্রতিদিন মানুষের বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ করেন হাসিনা। পাশাপাশি ধান, পাটসহ বিভিন্ন কৃষিজমিতে আগাছা পরিষ্কার এবং দিনমজুরের কাজও করেন। দিনভর পরিশ্রম শেষে পাওয়া সামান্য আয় দিয়েই খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও সন্তানদের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেন তিনি।
হাসিনা বেগম বলেন, “স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের সব দায়িত্ব আমার ওপর। কাজ করে যা আয় করি, তা দিয়েই কোনো রকমে সংসার চলে। কাজ শেষে বাড়িতে ফিরে প্রতিবন্ধী সন্তানদের খাওয়ানো, গোসল করানো ও দেখাশোনা করতে হয়। তারা নিজেরা চলাফেরা করতে পারে না। সন্তান অসুস্থ হলে ওষুধ কেনার টাকাও অনেক সময় থাকে না।”
তিনি আরও জানান, ২০২৩ সালে বিধবা ভাতার জন্য আবেদন করলেও এখনো তা চালু হয়নি। তার দুই প্রতিবন্ধী সন্তান অবশ্য প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে। তবে সরকারি উদ্যোগে প্রতিবন্ধীদের হুইলচেয়ার দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও এতদিন তারা কোনো হুইলচেয়ার পায়নি।
হাসিনা বেগমের অসহায়ত্ব ও সংগ্রামের বিষয়টি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তা উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রোববার তার বাড়িতে গিয়ে প্রতিবন্ধী দুই সন্তানের জন্য দুটি হুইলচেয়ার ও প্রয়োজনীয় উপহারসামগ্রী পৌঁছে দেন ইউএনও শায়লা সাঈদ তন্বী।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শায়লা সাঈদ তন্বী বলেন, “বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে হাসিনা বেগমের সংগ্রামের কথা জানতে পেরেছি। তার দুই সন্তানের জন্য দুটি হুইলচেয়ার এবং অন্যান্য সামগ্রী তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য এসেছি। তাদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারেও আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।”
হাসিনা বেগমের সংগ্রামী জীবনের গল্প সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরার জন্য সাংবাদিকদের বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান ইউএনও।
এদিকে স্থানীয়রা হাসিনা বেগমের বিধবা ভাতা দ্রুত চালু করা, তার প্রতিবন্ধী সন্তানদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা নিশ্চিত করা এবং সরকারি সব সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে জীবনসংগ্রামে থাকা হাসিনা বেগমের ঘরে দুটি হুইলচেয়ার পৌঁছে দেওয়া শুধু একটি সহায়তা নয়, বরং তার অসহায় পরিবারের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তাও হয়ে এসেছে।
মতামত