সিলেটি ভাষা ও সিলেটের মানুষকে নিয়ে টেলিভিশন টকশোতে এনসিপি নেত্রী হুমায়রা নূরের কথিত ‘সিলেটিরা শুদ্ধ বাংলা বলতে পারে না’ মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকে। সংগঠনটির নেতারা অবিলম্বে ওই বক্তব্য প্রত্যাহার করে সিলেটবাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানিয়েছেন।
গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকের নেতৃবৃন্দ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের কোনো অঞ্চলের ভাষা, উচ্চারণ বা সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে বিদ্রূপ করা অনুচিত। দেশের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সম্মান করা সবার দায়িত্ব।
বিবৃতিদাতাদের মধ্যে রয়েছেন সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. হাসনাত এম হোসেইন এমবিই,সিনিয়র সাংবাদিক কে এম আবু তাহের চৌধুরী,গ্রেটার সিলেটের সাবেক চেয়ারম্যান বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম মাহবুব,সাবেক সেক্রেটারি ও ১৯৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আব্দুল কাইয়ুম কয়সর, কেন্দ্রীয় কনভেনর কমিউনিটি লিডার ও সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ মকিস মনসুর,কো-কনভেনর আলহাজ মসুদ আহমদ, সদস্য সচিব ড. মুজিবুর রহমান, অর্থ সচিব এম আসরাফ মিয়া,সাউথ ইস্ট রিজিওনাল কনভেনর হারুনুর রশিদ,কো-কনভেনর জামাল হোসেন এবং সদস্য সচিব তাজুল ইসলামসহ কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক নেতারা।
গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকের কেন্দ্রীয় কনভেনর ও ইউকে বিডি টিভির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মকিস মনসুর বলেন, ভাষা মানুষের পরিচয়,সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পৃথিবীতে অসংখ্য ভাষা ও ভাষার বৈচিত্র্য রয়েছে। তাই কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষা বা উচ্চারণকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা সমীচীন নয়।
তিনি বলেন,সিলেটি ভাষার রয়েছে নিজস্ব শব্দভাণ্ডার,উচ্চারণরীতি ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সিলেট অঞ্চলের ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। বিশেষ করে ঐতিহাসিক সিলেটি নাগরি লিপি সিলেটের ভাষাগত ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মোহাম্মদ মকিস মনসুর আরও বলেন, সিলেটি ভাষা ও সংস্কৃতিকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য সিলেটবাসীর অনুভূতিতে আঘাত করে। রাজনৈতিক বা অন্য কোনো বক্তব্যকে জোরালো করার জন্য কোনো অঞ্চলের মানুষের ভাষাগত পরিচয়কে উপহাস করা উচিত নয়।
এদিকে,গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকের প্রেস অ্যান্ড পাবলিসিটি সেক্রেটারি শেখ নুরুল ইসলাম বলেন,বাংলাদেশের ভাষাগত বৈচিত্র্য দেশের সাংস্কৃতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি। বাংলা ভাষার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব ভাষাভঙ্গি, উচ্চারণ ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এসব বৈচিত্র্যকে দুর্বলতা হিসেবে নয়,বরং জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধি হিসেবে দেখতে হবে।
তিনি বলেন,সিলেটি ভাষা নিয়ে বিদ্রূপ বা কটাক্ষ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই অন্যের ভাষা,সংস্কৃতি বা আঞ্চলিক পরিচয়কে অপমান করার অধিকার দেয় না। তাই বিতর্কিত মন্তব্য প্রত্যাহার করে সংশ্লিষ্টদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা উচিত।
একই ঘটনায় একাত্মতা প্রকাশ করে প্রতিবাদ জানিয়েছে মানবিক,সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সিলেট-চট্টগ্রাম ফ্রেন্ডশিপ ফাউন্ডেশন।
সংগঠনটির স্থায়ী পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব মো. জামাল উদ্দিন আহমেদ, পৃষ্ঠপোষক পরিষদের চেয়ারম্যান কাউন্সিলর মো. আয়াছ মিয়া,উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ কাপ্তান হোসেন,উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন,সাবেক ব্যাংকার একরাম হোসেন,প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম,ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ফারহানা আফরোজ,সহসভাপতি এম এ সবুর, মো. মুছা আলম খান চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম জিয়াউর রহমান, মৌলভীবাজার জেলা শাখার আহ্বায়ক সদস্য সত্যজিৎ দাস,রিপন আহমেদ ও ছায়েদ আলীসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এ প্রতিবাদে সংহতি প্রকাশ করেন।
সিলেট-চট্টগ্রাম ফ্রেন্ডশিপ ফাউন্ডেশনের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ফারহানা আফরোজ বলেন,বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের ভাষা,সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র পরিচয়কে সম্মান করা জরুরি। কোনো অঞ্চলের উচ্চারণ বা ভাষাভঙ্গিকে নিয়ে উপহাস করা দেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি বলেন,সিলেটি ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কটাক্ষের ঘটনায় যে প্রতিবাদ তৈরি হয়েছে, তা কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রোশ নয়। এটি এমন একটি মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ,যেখানে কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষা,উচ্চারণ বা আঞ্চলিক পরিচয়কে ছোট করে দেখার প্রবণতা রয়েছে।
নেতৃবৃন্দ বলেন,সিলেটি ভাষা কারও করুণা বা স্বীকৃতির অপেক্ষায় নেই। সিলেটের রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস,ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। এই পরিচয়কে সম্মান করা সবার দায়িত্ব।
হুমায়রা নূরের ওই মন্তব্যের পর সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক মহলের অনেকে মন্তব্যটিকে আঞ্চলিক ভাষা ও উচ্চারণের প্রতি অবমাননাকর হিসেবে দেখছেন।
বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও লন্ডনে বসবাসরত সিলেটি প্রবাসীদের মধ্যেও এ নিয়ে অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রবাসী নেতারা বলেন,বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত সিলেটিরা তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে গর্বের সঙ্গে ধারণ করে চলেছেন। তাই সিলেটি ভাষা ও পরিচয় নিয়ে কোনো ধরনের অবমাননাকর মন্তব্য তারা মেনে নিতে পারেন না।
প্রতিবাদকারীরা অবিলম্বে বিতর্কিত মন্তব্য প্রত্যাহার করে সিলেটবাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানিয়েছেন।
মতামত