বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। হাঁটতে কষ্ট হয়, তবু থেমে নেই জীবনসংগ্রাম। প্রতিদিন ভোর হলেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের কবিখালী গ্রামের আব্দুল বারী। সাইকেলে টুকলি-টুপলা বেঁধে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে কড়াই, হাঁড়ি-পাতিলের কান্দা লাগানোর কাজ করেন তিনি। এ কাজ করেই কোনোভাবে চলে তাঁর জীবন।
আব্দুল বারীর দাবি, তাঁর বয়স এখন ১১৬ বছর। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। এনআইডি অনুযায়ী, তাঁর জন্মতারিখ ২০ এপ্রিল ১৯২৭। সে হিসাবে ২০২৬ সালের আগস্টে তাঁর বয়স প্রায় ৯৯ বছর। ফলে তাঁর প্রকৃত বয়স নিয়ে তৈরি হয়েছে কিছুটা ভিন্নতা। স্থানীয়দের অনেকের ধারণা, এনআইডি তৈরির সময় বয়স সঠিকভাবে উল্লেখ না করায় এ পার্থক্য হয়ে থাকতে পারে।
সরেজমিনে কবিখালী গ্রামে গিয়ে কথা হয় আব্দুল বারীর সঙ্গে। টিনের একটি জরাজীর্ণ ঝুপড়ি ঘরেই একাকী বসবাস তাঁর। ঘরের বিভিন্ন জায়গা দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। সেই ঘরেই কষ্ট করে দিন কাটছে তাঁর।
আব্দুল বারী বলেন, “স্ত্রী মারা গেছে সেই কবে। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। তারা এখন খোঁজ রাখে না। ছেলে সন্তানও নেই। তাই এই বয়সেও নিজের কাজ নিজেকেই করতে হয়। দিন কাটে খেয়ে না খেয়ে। রান্নাবান্না, হাঁড়ি-পাতিল মাজা—সবই নিজের হাতে করতে হয়।”
তিনি জানান, তাঁর বাড়ি কুষ্টিয়ার হালসা কুসা মল্লিকপুরে। তিনি মৃত তাসের মল্লিকের ছেলে। বিয়ের পর ঘরজামাই হিসেবে চু্য়াডাঙ্গার কবিখালী গ্রামে বসবাস শুরু করেন। শ্বশুরের জমিতেই গড়ে উঠেছে তাঁর বর্তমান বসতি। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি একজন।
দীর্ঘ বয়সের রহস্য জানতে চাইলে আব্দুল বারী বলেন, “আমার শরীরে কোনো রোগ নেই। আল্লাহ তাআলা আমাকে এভাবেই বাঁচিয়ে রেখেছেন। এখনো নিজের কাজ নিজেই করে খাই। কষ্ট হয়, তবুও পেটে ক্ষুধা লাগলে কী করব? খাওয়া তো লাগবেই।”
স্থানীয় বাসিন্দা ফজর আলী, রাহেন ও এনামুল ঘটক বলেন, “আমরা জন্মের পর থেকেই তাঁকে এমন দেখছি। আব্দুল বারীর স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েছেন। প্রতিদিন ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে হাঁড়ি-পাতিলের কান্দা লাগিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।”
বয়সের হিসাব নিয়ে ভিন্নতা থাকলেও আব্দুল বারীর জীবনযুদ্ধের বাস্তবতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। শতবর্ষের কাছাকাছি বয়সেও ক্ষুধার তাড়নায় প্রতিদিন সাইকেল নিয়ে বের হতে হয় তাঁকে। সংসারে পাশে নেই স্ত্রী, নেই ছেলে সন্তান; দুই মেয়েও থাকেন নিজ নিজ সংসারে। তাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও নিজের খাবার জোগাড় করতে তাঁকেই প্যাডেল ঘোরাতে হয়।
বয়সের ভার যতই শরীরকে দুর্বল করে দিক, ক্ষুধার কাছে হার মানেননি আব্দুল বারী। প্রতিদিনের সাইকেলযাত্রাই যেন তাঁর বেঁচে থাকার অবিরাম লড়াই।


মতামত