শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM

মতামত

নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ -  সবার আগে বাংলাদেশ

নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ - সবার আগে বাংলাদেশ

সড়ক যোগাযোগ একটি দেশের অর্থনীতি, উন্নয়ন ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই সড়কই যখন মানুষের অকালমৃত্যু, পঙ্গুত্ব ও পরিবারে স্থায়ী শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন উন্নয়নের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একটি দেশের সড়ক কত প্রশস্ত, কতটি সেতু নির্মিত হয়েছে কিংবা যানবাহনের গতি কত বেড়েছে, শুধু তা দিয়ে উন্নয়ন পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়নের অন্যতম মানদণ্ড হলো, মানুষ কতটা নিরাপদে চলাচল করতে পারছে এবং তার জীবন কতটা সুরক্ষিত। ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ আমাদের সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এখন প্রয়োজন প্রতিপাদ্যের বক্তব্যকে বাস্তব জীবনের নিরাপত্তায় রূপান্তর করা। এ জন্য চাই কার্যকর আইন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, নিয়মিত মনিটরিং এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জবাবদিহি।জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বেদনাবিধুর ইতিহাস। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন নিহত হন। ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে ইলিয়াস কাঞ্চন নিরাপদ সড়কের দাবিতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) আন্দোলন দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা, জনসম্পৃক্ততা ও গণমাধ্যমের সহযোগিতার মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তার দাবি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৭ সালে ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে দিবসটির দশমবারের মতো পালন করা হচ্ছে।  এই দিবস আমাদেরকে নিরাপদ সড়ক  আন্দোলনের ইতিহাস স্মরণ করার পাশাপাশি অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ করণীয় মূল্যায়নের সুযোগ করে দিয়েছে।জাতীয় নিরাপদ দিবস পালন, আলোচনা সভা, র‌্যালি, ব্যানার ও স্লোগানের পরও সড়কে মানুষের মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের ঝুঁকি কেন যথেষ্ট কমছে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সড়ক দুর্ঘটনাকে কেবল চালকের ভুল কিংবা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া চালনা, অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, আইন অমান্য, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক নকশা, অনিরাপদ ওভারটেকিং, চালকের ক্লান্তি, পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা না পাওয়ার মতো একাধিক কারণ কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকি একসঙ্গে উপস্থিত থাকে। ফলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে শুধু একজন চালককে দায়ী করা, জরিমানা বাড়ানো কিংবা বিশেষ দিবসকেন্দ্রিক প্রচার চালানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত, ধারাবাহিক ও প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশবিষয়ক একই বছরের প্রতিবেদনে দেশে সরকারি হিসাবে ৫ হাজার ৮৪ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মডেলভিত্তিক অনুমান ছিল প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন। সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক অনুমানের এই বড় ব্যবধান দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, সংজ্ঞা, মৃত্যুর হিসাব এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। তবে এসব সংখ্যা ২০২১ সালের তথ্য, ২০২৬ সালের বর্তমান মৃত্যুসংখ্যা নয়। এই পার্থক্য আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: সড়ক নিরাপত্তার কার্যকর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য, সমন্বিত ও নিয়মিত হালনাগাদ তথ্যব্যবস্থা অপরিহার্য। প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা ছাড়া দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং গৃহীত পদক্ষেপের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা কঠিন।সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিরাপদ সড়ক শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, নাগরিক অধিকার, পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রীয় সুশাসনের অংশ। সরকার সড়ক নির্মাণ করবে, যানবাহন চলাচলের নিয়ম নির্ধারণ করবে, চালকের যোগ্যতা যাচাই করবে, পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণ করবে এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে যাত্রী, পথচারী, সাইকেলচালক ও মোটরসাইকেল আরোহীদের নিরাপত্তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সড়ক নির্মাণের পর সেটি কতটা নিরাপদ থাকছে, পরিবহন আইন কতটা মানা হচ্ছে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো কত দ্রুত সংশোধন করা হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিরা সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, এসব বিষয়ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কাজের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে এবং তাদের কার্যক্রমের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেবে না।সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর কার্যকর ও ধারাবাহিক প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, অতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য বহন এবং ট্রাফিক সংকেত অমান্যের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু আইন থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। আইন প্রয়োগে শিথিলতা, অনিয়ম, পক্ষপাত কিংবা দায়িত্বহীনতা থাকলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। কোনো বিশেষ দুর্ঘটনার পর কয়েক দিন অভিযান জোরদার করে পরে তৎপরতা কমিয়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। আইন প্রয়োগ হতে হবে নিয়মিত, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সব শ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর। পরিবহন মালিক, চালক, শ্রমিক, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি, কেউই যেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ না পান। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা, অযৌক্তিক জরিমানা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগও বন্ধ করতে হবে।শুধু বিদ্যমান আইন প্রয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বর্তমান বাস্তবতার আলোকে একটি সমন্বিত ও কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এমন আইনে সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের নিরাপত্তামান, যানবাহনের কারিগরি নিরাপত্তা, চালকের প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতা, গতিসীমা, পথচারীর অধিকার, জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসা, দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ, তদন্ত, মনিটরিং এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। আইন প্রণয়নের আগে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ, বিশেষজ্ঞদের মতামত, গবেষণালব্ধ ফলাফল এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক, নাগরিক সমাজ ও সড়ক নিরাপত্তা সংগঠনগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। আইনটি যেন শুধু অপরাধের শাস্তি নির্ধারণের দলিল না হয়, বরং দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা গঠন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্ব নিশ্চিত করার কার্যকর কাঠামো হয়ে ওঠে।নতুন আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ পরস্পরের বিকল্প নয়। নতুন আইন তৈরি করতে সময় লাগলেও বর্তমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ থেমে থাকতে পারে না। আবার বিদ্যমান আইনে কোনো ঘাটতি থাকলে সেটি চিহ্নিত করে সংশোধন বা নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগও পিছিয়ে দেওয়া উচিত নয়। আইন প্রণয়নের পর বিধিমালা, দায়িত্ব বণ্টন, প্রয়োজনীয় জনবল, প্রযুক্তি, বাজেট এবং বাস্তবায়ন নির্দেশনা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ভালো আইনও কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে। আইনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান বাস্তবায়নের জন্য কে দায়িত্ব পালন করবে, কীভাবে তা পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট থাকতে হবে। আইন প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে।সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কার্যকর মনিটরিং এবং স্থায়ী জবাবদিহি। আমাদের দেশে অনেক সময় কোনো বড় দুর্ঘটনা বা জনদাবির পর তৎপরতা বাড়ে, অভিযান চলে, সভা হয়, নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পর সেই তৎপরতা কমে গেলে আগের অনিয়ম আবার ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়। এভাবে চলতে থাকলে কোনো আইন, নির্দেশনা কিংবা কর্মসূচিই স্থায়ী ফল দিতে পারবে না। তাই সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে সাময়িক অভিযাননির্ভর না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে প্রতিটি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাজ, সময়সীমা, লক্ষ্যমাত্রা ও অগ্রগতি মূল্যায়নের পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। নিয়মিত পর্যালোচনা সভা, মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন, ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রকাশ্য অগ্রগতি প্রতিবেদনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের অবস্থা যাচাই করা যেতে পারে।বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে সমন্বিত দায়িত্ব বণ্টন থাকা প্রয়োজন। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিত হওয়ার পর সেটি নিরাপদ করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কোনো যানবাহন বারবার আইন লঙ্ঘন করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসা পৌঁছাতে কত সময় লাগছে এবং গৃহীত পদক্ষেপে দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির ঝুঁকি কমেছে কি না, এসব বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। শুধু কতটি অভিযান পরিচালিত হলো কিংবা কত টাকা জরিমানা আদায় হলো, সেটিই সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। প্রকৃত সাফল্য হলো দুর্ঘটনা ও গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি কমানো এবং মানুষের জীবন রক্ষা করা।সড়ক দুর্ঘটনারোধে  মনিটরিং ব্যবস্থা যেন ব্যক্তিনির্ভর না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো কর্মকর্তা বদলি হলে, প্রশাসনিক অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হলে কিংবা কোনো বড় দুর্ঘটনা সংবাদমাধ্যমের আলোচনার বাইরে চলে গেলে সড়ক নিরাপত্তার কার্যক্রম যেন থেমে না যায়। এ জন্য আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে স্থায়ী দায়িত্ব নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থা থাকতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কোথাও নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন না হলে তার কারণ জানতে হবে এবং সংশোধনী পদক্ষেপ নিতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে সড়ক নিরাপত্তা দিবসের কর্মসূচি শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সারা বছর ধরে বাস্তবায়িত হবে।চালকদের দক্ষতা ও কর্মপরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। পেশাদার চালকের হাতে বহু মানুষের জীবন নির্ভর করে। তাই লাইসেন্স দেওয়ার আগে যথাযথ প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যগত যোগ্যতা যাচাই করা জরুরি। চালকের কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম, ঘুমের সুযোগ এবং দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘ সময় একটানা গাড়ি চালানো, ক্লান্ত অবস্থায় স্টিয়ারিং ধরা কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর অযৌক্তিক চাপ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শুধু চালকের ওপর সব দায় চাপিয়ে পরিবহন মালিক ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। চালক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত দক্ষতা যাচাই, পেশাগত আচরণ উন্নয়ন এবং পরিবহন পরিচালনায় নিরাপত্তানীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। চালকের ভুলের জন্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনায় ভূমিকা রাখা অন্যান্য কারণও তদন্ত করতে হবে।সড়কের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সড়কে পর্যাপ্ত ফুটপাত নেই, কোথাও ফুটপাত দখল হয়ে আছে, কোথাও নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, শিল্পাঞ্চল এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকায় পথচারীর ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সড়ক পরিকল্পনা করতে হবে। বিপজ্জনক বাঁক, দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হওয়া স্থান, অপর্যাপ্ত সড়কবাতি, ত্রুটিপূর্ণ সাইন ও মার্কিং, অরক্ষিত সড়ক বিভাজক এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রবেশপথ চিহ্নিত করে সংশোধন করতে হবে। মহাসড়কে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে নিরাপদ পারাপার, সার্ভিস লেন, সঠিক বাসস্টপ, গতিনিয়ন্ত্রণ এবং পথচারীবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান সড়কের নিরাপত্তা নিরীক্ষা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থান দ্রুত সংশোধনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার জন্যে  ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ বা নিরাপদ সড়কব্যবস্থা অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই ধারণার মূল কথা হলো, মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু সেই ভুল যেন অনিবার্যভাবে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের কারণ না হয়, সে অনুযায়ী পুরো পরিবহনব্যবস্থাকে সাজাতে হবে। নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা, এই উপাদানগুলোকে সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সচেতনতার প্রচার কিংবা শুধু শাস্তি দিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। অবকাঠামো, আইন, যানবাহন, চালকের প্রশিক্ষণ, জরুরি চিকিৎসা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা কমানোর জাতিসংঘের বৈশ্বিক লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশকেও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ এবং অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে।দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক মিনিট অনেক আহত মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানো, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী পাওয়া, আহত ব্যক্তিকে সঠিকভাবে হাসপাতালে স্থানান্তর এবং উপযুক্ত জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। তাই জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে কার্যকর জরুরি সাড়া ব্যবস্থা, সমন্বিত অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক, হাসপাতালের মধ্যে রেফারেল ব্যবস্থা, ট্রমা চিকিৎসার সক্ষমতা এবং প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা জরুরি। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও হাসপাতালের মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনাস্থলে আহত ব্যক্তিকে অদক্ষভাবে টানাহেঁচড়া না করে প্রশিক্ষিত সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সাধারণ মানুষকেও সচেতন করতে হবে। সড়ক নিরাপত্তার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনায় দুর্ঘটনা প্রতিরোধের পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর জীবন রক্ষার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।সড়ক দুর্ঘটনারোধে আরেকটি  বড় সমস্যা হলো দুর্ঘটনার তথ্যের বিচ্ছিন্নতা। পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের তথ্য এক জায়গায় সমন্বিত না হলে দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান, মৃত্যুর কারণ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ণয় কঠিন হয়। তাই একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় সড়ক দুর্ঘটনা তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দুর্ঘটনার স্থান, সময়, যানবাহনের ধরন, সড়কের অবস্থা, হতাহত, চিকিৎসা এবং তদন্তের ফলাফল নিয়মিত নথিভুক্ত করতে হবে। তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য, সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা এবং অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে পদ্ধতি ও সংজ্ঞার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান তুলনা ও বিশ্লেষণ করা যায়।সড়ক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় জনগণের দায়িত্বও অনস্বীকার্য। চালককে গতিসীমা মানতে হবে, বৈধ লাইসেন্স ও ফিটনেস নিশ্চিত করতে হবে, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার করতে হবে এবং গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। মোটরসাইকেলে চালক ও যাত্রী উভয়ের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার জরুরি। পথচারীদের নির্ধারিত স্থানে রাস্তা পারাপার, ফুটপাত ব্যবহার এবং ট্রাফিক সংকেত মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনকে দায়িত্বশীল আচরণ, চালকের প্রশিক্ষণ এবং যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে জনসচেতনতার নামে রাষ্ট্র ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আড়াল করা যাবে না। নিরাপদ আচরণের সুযোগ তৈরি করতে হবে নিরাপদ অবকাঠামো, কার্যকর আইন এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে।নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যক্রমে বয়সোপযোগী সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা এবং জনসচেতনতামূলক প্রচার বাড়াতে হবে। গণমাধ্যমে দুর্ঘটনার খবর প্রকাশের পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ, প্রতিরোধের উপায়, আইনের প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন থাকা প্রয়োজন। কোনো বড় দুর্ঘটনার পর সাময়িক আলোচনা করে থেমে না গিয়ে সড়ক নিরাপত্তার অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে। জনমত ও গণমাধ্যমের নজরদারি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।নিরাপদ সড়ক চাই ( নিসচা) দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি ও নীতিগত পরিবর্তনের দাবিতে কাজ করে আসছে। সংগঠনটির প্রায় ১২০টি শাখার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকার চাইলে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, চালক প্রশিক্ষণ এবং সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় গড়ে তোলা গেলে উদ্যোগগুলো আরও কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ নাগরিক সংগঠনগুলোর মতামত গ্রহণ করা উচিত। সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হলে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের জনসম্পৃক্ততা কাজে লাগানো সম্ভব হবে। নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা কোনো একক সংস্থার কাজ নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের তাৎপর্য তাই শুধু শোক স্মরণ বা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এই দিন হতে হবে সড়ক নিরাপত্তার অগ্রগতি পর্যালোচনা, ব্যর্থতার কারণ শনাক্ত এবং বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের অঙ্গীকারের দিন। সরকারকে বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সমন্বিত আইন প্রণয়ন করতে হবে, নিরাপদ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, দক্ষ চালক তৈরি করতে হবে, জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি কর্মসূচির বাস্তব অগ্রগতি নিয়মিত যাচাই এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো দুর্ঘটনা বা দিবসকেন্দ্রিক তৎপরতা যেন কিছুদিন পর থেমে না যায়, সে জন্য সড়ক নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থের অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে একজন মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারবেন, একজন শিক্ষার্থী নিশ্চিন্তে বিদ্যালয়ে যেতে পারবে এবং একজন শ্রমজীবী মানুষ জীবিকার সন্ধানে বের হয়ে সুস্থভাবে পরিবারের কাছে ফিরতে পারবেন। সড়কে মৃত্যু যেন স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া না হয়, প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা হয় এবং একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। উন্নয়নের প্রকৃত সার্থকতা মানুষের জীবন রক্ষায়। তাই জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির বাইরে এসে সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা, কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন, আইনের নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক প্রয়োগ, নিয়মিত মনিটরিং, স্বচ্ছতা এবং স্থায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রণয়ন করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না, আবার আইন প্রয়োগের নামে সাময়িক তৎপরতা দেখিয়েও থেমে থাকা যাবে না। নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ - সবার আগে বাংলাদেশ, এই প্রত্যয়কে শুধু  স্লোগানে নয়, বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে সড়ক দুর্ঘটনার‍্যধে বিদ্যমান আইনের যথাযথ  প্রয়োগ, সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন,  নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।লেখক পরিচিতি:লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল( শিক্ষক, কবি,কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি), কেন্দ্রীয় কমিটিযুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)ফোন: ০১৫৫২৬৩১১১৮,  ০১৮৪২৬৩১১১৮E-mail: lionganibabul@gmail.com

চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে তারেক রহমানের কঠোর অবস্থান এবং সুশাসনের রূপরেখা

আমাদের রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে শিকড় গেড়ে বসা চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং অপরাধমূলক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সরকার ও দলের প্রধানের আসন থেকে যে নজিরবিহীন ও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে, তা এ দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত হতাশার মাঝে এক ফালি স্বস্তির আলো হয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে সুনির্দিষ্ট ও আপসহীন নির্দেশনা দিয়েছেন, তা কেবল রাজনৈতিক শিষ্টাচার ফিরিয়ে আনার ঘোষণা নয়; এটি এক নতুন ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ার ঐতিহাসিক ঘোষণা। দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ যে আর পার পাবে না এবং সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় অপরাধীদের প্রশ্রয় না দিয়ে কঠোর নজরদারি বজায় রাখবেন-এই বার্তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।   রবিবার রাতে জাতীয় সংসদ ভবনের সরকারদলীয় সদস্যদের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সাড়ে তিন ঘণ্টার ওই বৈঠকে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সরকারি কার্যক্রমের জবাবদিহি, দুর্গাপূজার নিরাপত্তা এবং সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে শুরু হয়ে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চলা এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, বিএনপিতে চাঁদাবাজ ও দখলদারদের কোনো স্থান নেই। বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি গণমাধ্যমকে জানান যে, দলের নাম ব্যবহার করে অন্যায় করে কেউ পার পাবে না-এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সুনির্দিষ্টভাবে সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার চাঁদাবাজ ও দখলদারদের নিয়ন্ত্রণের কড়া নির্দেশ দেওয়া হলো। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে বলেন, দলের কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান সার্বিক পরিস্থিতি ও জবাবদিহির বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন।   প্রধানমন্ত্রী তিনি মুখে নয়, নিজের কাজ ও আচরণের মাধ্যমে প্রতিমুহূর্তে প্রমাণ করে চলেছেন যে, তিনি এ দেশকে ও দেশের মানুষকে কতটা ভালোবাসেন। এর আগেও তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, দেশের সর্বত্র দুর্নীতি ও জঞ্জালের পাহাড় জমেছে এবং দেশ ও জাতির উন্নয়নের স্বার্থে তিনি সেই পাহাড় ভেঙে চুরমার করে দিতে চান। মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে একজন নারী সংসদ সদস্যকে সরাসরি পদ থেকে অপসারণ করার ঘটনা প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল মুখের বুলি নয়, কাজের মাধ্যমেই জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করছেন।   চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের মতো সামাজিক ব্যাধি দূর করতে হলে শুধু ‘লেজ ধরে টানাটানি’ করলে চলবে না, সোজা ‘মাথা ধরে টান’ দিতে হবে। আমাদের দেশে দীর্ঘকাল ধরে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর দু-একজন চুনোপুঁটি বা স্থানীয় মাস্তানকে গ্রেপ্তার করে কিংবা দল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করে দায়সারা কাজ করার সংস্কৃতি চলে আসছে। কিন্তু এই ছোট অপরাধীদের পেছনে যে শক্তিশালী সিন্ডিকেট এবং রাজনৈতিক তোষামোদির চক্র কাজ করে, তাদের গায়ে হাত না দিলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাজনীতি যখন জনসেবার পরিবর্তে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, তখন মাঠপর্যায়ের কর্মীরা চাঁদাবাজিকে নিজেদের ‘অধিকার’ বলে মনে করতে শুরু করে। এই চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা অবৈধ ক্ষমতার নানা সিঁড়ি বেয়ে বহুদূর পর্যন্ত প্রবাহিত হয় এবং ওপরতলা থেকে আসা সবুজ সংকেত মাঠপর্যায়ের অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।   প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবার ঠিক সেই মূল শিকড় বা মাথাতেই হাত দিয়েছেন। সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি মূলত ক্ষমতার মূল স্রোত থেকে অপরাধের উচ্ছিষ্টভোগীদের বিচ্ছিন্ন করার মহড়া শুরু করেছেন। সংসদ সদস্যরা যদি তাঁদের প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন, তবে অপরাধীদের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়তে বাধ্য।   চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি-একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থাকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য এসব অপরাধই যথেষ্ট। সাধারণ মানুষ যখন নিজের উপার্জন, ব্যবসা, জমি কিংবা নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটায়, তখন উন্নয়নের বড় বড় প্রতিশ্রুতিও তাদের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। একজন ব্যবসায়ী নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারবেন কি না, একজন কৃষক তাঁর জমি ও ফসলের ন্যায্য অধিকার ভোগ করতে পারবেন কি না, একজন সাধারণ নাগরিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে নিরাপদ থাকতে পারবেন কি না-এসব প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হয় একটি সরকার মানুষের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য।   এমন বাস্তবতায় চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর অবস্থান এবং সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি তাঁর সুস্পষ্ট নির্দেশনা নিঃসন্দেহে জনমনে স্বস্তি ও প্রত্যাশা জাগানোর মতো একটি বার্তা। দলের নাম ব্যবহার করে কেউ চাঁদাবাজি বা দখলদারিত্ব করে পার পাবে না, বিএনপিতে চাঁদাবাজ ও দখলদারদের কোনো স্থান নেই-প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়কে ব্যবহার করে অপরাধ করার প্রবণতা বন্ধ করতে না পারলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কার্যকর করা কঠিন।   জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী যে বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন, তার মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সরকারি কার্যক্রমের জবাবদিহি এবং জনপ্রতিনিধিদের নিজ নিজ এলাকার প্রতি দায়িত্বশীলতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই নির্দেশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হিসেবে না দেখে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দায়িত্বের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে। একজন সংসদ সদস্য কেবল আইন প্রণয়নের জন্য নির্বাচিত হন না; তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকার মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশারও একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। তাঁর এলাকায় দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তিনি নীরব থাকতে পারেন না। অপরাধী নিজের দলের লোক হলেও তাঁকে প্রশ্রয় না দেওয়া, অভিযোগ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করা তাঁর দায়িত্বের অংশ।   বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দায়িত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা দাবি, সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি দখল এবং স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অভিযোগ জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অপরাধ সংঘটনের যে ঝুঁকি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে বারবার সামনে এসেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সরকার পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা থাকে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসবে। মানুষ শুধু নতুন মুখ বা নতুন নেতৃত্ব দেখতে চায় না; তারা চায় দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তা, ব্যবসায় স্বস্তি, সম্পত্তির নিশ্চয়তা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচারের বাস্তব অভিজ্ঞতা। কোনো ব্যবসায়ীকে যদি দোকান চালাতে গিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কারও অন্যায় দাবির মুখোমুখি হতে হয়, কোনো জমির মালিক যদি প্রভাবশালীদের কারণে নিজের সম্পত্তি নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, কিংবা কোনো সাধারণ মানুষ যদি অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গিয়ে রাজনৈতিক প্রতিশোধের আশঙ্কা করেন, তাহলে সেই বাস্তবতায় সুশাসনের প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে বলা যায় না।   প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যে অবস্থান ঘোষণা করেছেন, সেটিকে কেবল একটি দলীয় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য পুরোপুরি উপলব্ধি করা যাবে না। এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন কতটা গভীর হবে, তা নির্ভর করবে ঘোষণার পরবর্তী পদক্ষেপ, অপরাধের অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগের ওপর।   তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হতে পারে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সন্তান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী হিসেবে তাঁর সামনে যেমন ঐতিহাসিক প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি রয়েছে সেই প্রত্যাশার যথার্থতা প্রমাণের দায়িত্বও। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য কিংবা নির্বাচনী বিজয় একজন নেতাকে মানুষের আস্থা অর্জনের সুযোগ দিতে পারে; কিন্তু সেই আস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় কাজের মাধ্যমে, বিশেষ করে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে।   প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সাফল্য তাই শুধু সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাঁর নেতৃত্ব কতটা কার্যকর, তার একটি বড় মাপকাঠি হবে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের অপরাধ থেকে দূরে রাখা এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তিনি সংসদ সদস্যদের সতর্ক করেছেন-এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এখন দেখতে হবে, সেই সতর্কবার্তা মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর হয় এবং অপরাধের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতারা কী ভূমিকা পালন করেন।   বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণ করা কোনো সহজ কাজ নয়। কারণ, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যবসায়িক স্বার্থ, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত আনুগত্যের মধ্যে কখনো কখনো এমন সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা অপরাধের অভিযোগ তদন্ত ও বিচারকে জটিল করে তোলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিরা এসব প্রভাবশালী ব্যক্তিকে রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখার উপায় হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। আবার কোথাও প্রশাসনের কর্মকর্তা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপরও স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কেবল মৌখিক নির্দেশনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা, স্বাধীন তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃশ্যমান শাস্তি।   এখানে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় নজর রাখতে বলেছেন। কিন্তু এই নজরদারির অর্থ হওয়া উচিত অপরাধ প্রতিরোধে সহযোগিতা করা, প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং নাগরিকদের অভিযোগ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কোনো সংসদ সদস্যের কাজ হবে না ব্যক্তিগতভাবে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা কিংবা প্রশাসনকে আইনবহির্ভূত নির্দেশ দেওয়া। একইভাবে, প্রশাসনের কর্মকর্তারাও জনপ্রতিনিধিদের রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে নয়, আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন। সুশাসনের জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় যেমন জরুরি, তেমনি একে অপরের বৈধ এখতিয়ার ও স্বাধীনতার প্রতি সম্মানও অপরিহার্য।   প্রধানমন্ত্রী নিজেও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনপ্রিয় ও যোগ্য ব্যক্তিদের সমর্থন দেওয়ার এবং স্বজনপ্রীতি পরিহারের নির্দেশ দিয়েছেন বলে বৈঠক শেষে জানানো হয়েছে। নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রকৃত অর্থে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত হতে পারেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনা চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা না থাকলে নাগরিক সেবা ব্যাহত হয়; আর জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে পেশিশক্তি, অর্থের প্রভাব কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্য প্রাধান্য পেলে স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে। সুতরাং স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হবে তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক চর্চা, নেতৃত্বের যোগ্যতা এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিকার অর্থে স্বজনপ্রীতিমুক্ত প্রার্থী বাছাই, নির্বাচনে হস্তক্ষেপ না করা এবং জনগণের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে পারেন, তাহলে তা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে এই অঙ্গীকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে ক্ষমতাসীন দলের পছন্দের প্রার্থীরাও একই নিয়মের আওতায় থাকছেন কি না, তার ওপর।   চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনীতি। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানমালিক, পরিবহনসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা, নির্মাণ ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন সেবা খাতের মানুষ যদি অবৈধ আর্থিক দাবির মুখে পড়েন, তাহলে তাঁদের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। এই ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম, সেবার মূল্য কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিনিয়োগকারীরাও এমন পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে অনাগ্রহী হতে পারেন, যেখানে সম্পত্তির নিরাপত্তা এবং ব্যবসা পরিচালনার নিশ্চয়তা প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব প্রতিরোধ শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বাজারের স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও পূর্বশর্ত।   সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে আরও কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ জানানোর জন্য সহজলভ্য ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগকারীর পরিচয় ও নিরাপত্তা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে অভিযোগ পৌঁছানোর পর তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে যথাযথ তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মামলা প্রত্যাহার, তদন্ত বাধাগ্রস্ত করা কিংবা অপরাধীকে রক্ষা করার চেষ্টা হলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কতগুলো অভিযোগ তদন্ত হলো, কতগুলো প্রমাণিত হলো এবং কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলো-এসব বিষয়ে নিয়মিত ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রকাশ করলে সরকারি অঙ্গীকারের বাস্তব অগ্রগতি মূল্যায়ন করা সহজ হবে।   মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও দখলসংক্রান্ত অভিযোগের পর সংরক্ষিত আসনের একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার যে তথ্য আলোচনায় এসেছে, সেটিও দলীয় জবাবদিহির প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তবে এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা, অভিযোগের প্রকৃতি এবং গৃহীত ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা উচিত। কোনো ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য তখনই স্থায়ী হয়, যখন ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে নেওয়া ব্যবস্থা একটি ধারাবাহিক নীতিতে পরিণত হয় এবং একই ধরনের অভিযোগে অন্যদের ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষতা বজায় থাকে। একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ইতিবাচক হতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তন নিশ্চিত হয়েছে বলা যায় না।   আসন্ন দুর্গাপূজায় হিন্দু সম্প্রদায়সহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী যে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেটিও নাগরিক অধিকারের বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপদে ধর্ম পালন, উপাসনালয় রক্ষা এবং সামাজিক জীবনে অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভয় দেখিয়ে, তাদের সম্পত্তি দখল করে কিংবা উৎসব পালনে বাধা দিয়ে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সুবিধা নিতে না পারে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের; কোনো সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা যেন কেবল কোনো রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না থাকে।   বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকেই আমরা রাজনৈতিক বিভাজনের সুযোগ নিয়ে অপরাধীদের পুনর্বাসিত হতে দেখেছি। এক দলের আমলে কোণঠাসা হওয়া চাঁদাবাজ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অন্য দলের ব্যানার জড়িয়ে পুনরায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে-এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। অপরাধীকে যদি এক দল বহিষ্কার করে, তবে সে অন্য দলের ব্যানারে আত্মপ্রকাশ করে। এই চক্রাকারে ঘুরতে থাকা অপরাধের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হলে দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি সাধারণ ইস্যুতে এক টেবিলে বসতে হবে এবং স্পষ্ট অঙ্গীকার করতে হবে-চাঁদাবাজ ও অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় থাকতে পারবে না। চাঁদাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত কাউকে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য করা যাবে না এবং তাদের আজীবনের জন্য রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করতে হবে। তাই আমি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করব, আপনি সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে এক টেবিলে বসুন। চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি সর্বসম্মত ‘জাতীয় ও রাজনৈতিক ঐক্য’ গড়ে তুলুন এবং এর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী চূড়ান্ত জাতীয় অভিযান ঘোষণা করুন।   প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। তিনি যদি নিজের দলের নেতাকর্মীদের জন্য স্পষ্ট করে দিতে পারেন যে, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাস কিংবা দুর্নীতির ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ই সুরক্ষা দেবে না, তাহলে তাঁর ঘোষিত অবস্থান সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। এ জন্য সংসদ সদস্যদের শুধু সতর্ক করলেই হবে না; তাঁদের কার্যক্রমের মূল্যায়ন করতে হবে, অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে দলীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে।   আমি বিশ্বাস করি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থান কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তি শক্তিশালী হতে পারে। তবে কোনো সরকার বা নেতার প্রতি আস্থা কেবল প্রশংসা কিংবা প্রত্যাশার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; তার ভিত্তি গড়ে ওঠে বাস্তব ফলাফলে। প্রধানমন্ত্রী যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তার প্রতিফলন যদি বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, জমি-সম্পত্তি, স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দেখা যায়, তাহলেই এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য প্রতিষ্ঠিত হবে। বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশের মানুষ এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে দলীয় পরিচয়ের কারণে কেউ বিশেষ সুবিধা পাবে না, অপরাধ করে কেউ রাজনৈতিক আশ্রয়ে পার পাবে না এবং ন্যায়বিচারের জন্য সাধারণ মানুষকে ক্ষমতাবান কারও দ্বারস্থ হতে হবে না। তারেক রহমানের ঘোষিত কঠোর অবস্থান সেই প্রত্যাশা পূরণের একটি সম্ভাবনাময় সূচনা বলেই মনে হচ্ছে। এখন প্রয়োজন ঘোষণাকে কার্যকর নীতিতে,ধারাবাহিক পদক্ষেপে এবং দৃশ্যমান জনস্বস্তিতে রূপান্তর করা। সুতরাং আমি মনে করি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার সাফল্যই হবে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের সবচেয়ে বড় বিজয়। পরিশেষে বলতে চাই, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, প্রশাসনিক দৃঢ়তা এবং দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের এই যাত্রায় যদি আমরা সবাই যার যার অবস্থান থেকে সহযোগিতা করি, তবে অচিরেই বাংলাদেশ চাঁদাবাজ-দখলবাজমুক্ত একটি নিরাপদ, মানবিক ও উন্নত, সুখী-সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হবে-ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ সুবাহানাতালা আমাদের সহায় হোন।   লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন। ই-মেইল: [email protected]    বিডি-প্রতিদিন/বিএম

চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে তারেক রহমানের কঠোর অবস্থান এবং সুশাসনের রূপরেখা

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার

দুর্যোগ প্রকৃতির নিয়মে আসতে পারে, কিন্তু দুর্যোগে প্রাণহানি ও সম্পদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সব সময় অনিবার্য নয়। যথাযথ পরিকল্পনা, আগাম সতর্কতা, নিরাপদ অবকাঠামো, জনসচেতনতা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তাই দুর্যোগের পর উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি দুর্যোগের আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। ১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবস আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছর ১৩ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবস পালিত হয়। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়ানো। বাংলাদেশে দিবসটির গুরুত্ব বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে।বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, বজ্রপাত, ভূমিধস ও ভূমিকম্পের ঝুঁকির পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ড, ভবনধস, শিল্পকারখানার দুর্ঘটনা এবং পরিবেশদূষণও জনজীবনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। এসব দুর্যোগ মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা ও শিক্ষা কার্যক্রম। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, শিশু, নারী, প্রবীণ ব্যক্তি এবং প্রতিবন্ধী মানুষ। ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে শুধু জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জাতীয় উন্নয়ন, জননিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস প্রচার, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, স্বেচ্ছাসেবক তৈরি এবং উদ্ধার কার্যক্রমে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা প্রশংসনীয়। অতীতের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা ও আশ্রয়ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। তবে এসব অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের চাপ বাড়ছে। অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় নগরজীবন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানা এবং দুর্বল জরুরি প্রস্তুতি মানবসৃষ্ট দুর্যোগের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে।এই বাস্তবতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রতিক্রিয়াভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তে ঝুঁকি হ্রাসকেন্দ্রিক পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো এলাকায় বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস বা ভূমিকম্পের ঝুঁকি কতটা, কোন জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি বিপন্ন এবং কোন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি, নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ প্রস্তুতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা কার্যকর করাও অত্যন্ত জরুরি। শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রচার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সতর্কবার্তা মানুষের কাছে সময়মতো পৌঁছাতে হবে এবং সেই বার্তার ভিত্তিতে কী করণীয়, তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চল, চরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা ও দুর্গম জনপদের মানুষ যেন সহজে সতর্কবার্তা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় ভাষা ও সহজবোধ্য বার্তার পাশাপাশি মোবাইল ফোন, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মসজিদ-মন্দির এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানো যেতে পারে। সতর্কবার্তা পাওয়ার পর নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা না থাকলে কিংবা উদ্ধার কার্যক্রমে সমন্বয় না থাকলে আগাম সতর্কতার সুফল সীমিত হয়ে পড়ে।দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ ও বিদ্যমান স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণবিধি মানা, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর রাখা, জরুরি বহির্গমনপথ উন্মুক্ত রাখা এবং নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, শিল্পকারখানা ও গণপরিবহনকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে দুর্যোগ সহনশীল করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নদী, খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থা রক্ষা করতে হবে। অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ ও জলাধার ভরাটের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা অনেক সময় অতিবৃষ্টির ক্ষয়ক্ষতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।বাংলাদেশের নগর এলাকাগুলোতে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জনবহুল শহরে বিপুলসংখ্যক ভবন, সংকীর্ণ সড়ক এবং অপর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ, প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার, নির্মাণবিধি বাস্তবায়ন এবং উদ্ধারকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ভূমিকম্পের সময় কীভাবে নিরাপদ থাকতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে এবং দুর্যোগের পর কীভাবে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান এড়িয়ে চলতে হবে, তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে শেখানো উচিত।সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। দুর্যোগ মোকাবিলা শুধু সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের একক দায়িত্ব নয়। স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন, প্রাথমিক চিকিৎসা ও উদ্ধার প্রশিক্ষণ, জরুরি সরঞ্জাম সংরক্ষণ এবং দুর্যোগকালীন যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখার প্রস্তুতি থাকতে হবে। বিশেষ করে শিশু, নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে আশ্রয়কেন্দ্র ও উদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন। দুর্যোগের সময় তাঁদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা মানবিক দায়িত্ব।গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্যোগের সময় নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রচার, গুজব প্রতিরোধ, সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং মানুষের করণীয় তুলে ধরার মাধ্যমে গণমাধ্যম জীবন রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দুর্যোগের সময়ই শুধু নয়, সারা বছর সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে। বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে দুর্যোগ প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাবিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা এবং নিয়মিত মহড়ার ব্যবস্থা করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে উঠবে।দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, প্রযুক্তিনির্ভর পূর্বাভাস, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের পরিকল্পনা ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্য দুর্যোগঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে উন্নয়নের নামে নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি না হয়।সরকারের দায়িত্ব হলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা, আইন ও নীতিমালার বাস্তবায়ন তদারক করা এবং বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে। ত্রাণ বিতরণে বৈষম্য, অনিয়ম কিংবা দীর্ঘসূত্রতা যেন অসহায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে না দেয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে পর্যাপ্ত জনবল, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে।দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ঝুঁকি সম্পর্কে জানা, আগাম প্রস্তুতি নেওয়া এবং সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। দুর্যোগের পর উদ্ধার ও ত্রাণ অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দুর্যোগের আগেই মানুষের জীবন রক্ষার ব্যবস্থা করা। এ জন্য পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, জবাবদিহি এবং জনসম্পৃক্ততার সমন্বয় ঘটাতে হবে।আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, দুর্যোগকে শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা না করে এর ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সরকারকে দুর্যোগ সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিককে সচেতন, দায়িত্বশীল ও প্রস্তুত থাকতে হবে। দুর্যোগ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও পরিকল্পিত উদ্যোগ, বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। দুর্যোগের পর প্রতিক্রিয়া নয়, দুর্যোগের আগেই প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক জাতীয় অগ্রাধিকার।লেখক পরিচিতি:লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটিযুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটিফোন: ০১৫৫২৬৩১১১৮, ০১৮৪২৬৩১১১৮ইমেইল: lionganibabul@gmail.com 2 Attachments  •  Scanned by Gmail

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার

ব্রিটেনে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের স্থায়ী অনুমতি সংক্রান্ত নিয়মে পরিবর্তনের প্রস্তাব ও অভিবাসীদের উদ্বেগ

ব্রিটেনে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা ইন্ডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (আইএলআর) পাওয়ার নিয়মে প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে বসবাস ও কাজ করা অভিবাসীরা। তাদের আশঙ্কা, ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি বৈধ বসবাসের মাধ্যমে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ বাতিল করা হলে অনেককে ব্রিটেন ছাড়তে হতে পারে। এতে পরিবার পুনর্মিলনের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পাশাপাশি বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা জীবনও অনিশ্চয়তায় পড়বে।যুক্তরাষ্ট্রের ভারমন্টে জন্ম নেওয়া ৩২ বছর বয়সী জুলিয়ান গ্রান্ট ১৮ বছর বয়সের পর স্কটল্যান্ডে চলে আসেন। ২০১২ সালে সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পড়তে ব্রিটেনে আসেন এবং পরে পিএইচডি করতে ২০১৭ সালে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ১০ বছর বৈধভাবে বসবাসের শর্ত পূরণ করায় আগামী বছর তার স্থায়ী বসবাসের অনুমতির আবেদন করার যোগ্যতা তৈরি হওয়ার কথা।সরকার ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের পথ বাতিলের প্রস্তাব দেওয়ার পর থেকে গ্রান্ট নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, ব্রিটেনেই তার পুরো প্রাপ্তবয়স্ক জীবন, পেশাগত ক্যারিয়ার ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এত বছর ধরে স্থায়ী হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করার পর নিয়ম পরিবর্তন হলে তাকে আবার শুরু থেকে সবকিছু ভাবতে হবে। শেষ পর্যন্ত ব্রিটেন ছাড়তে হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তিনি।পরিবারের ভিসার জন্য প্রায় ১২ হাজার পাউন্ড খরচ করার পরও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সামির স্ত্রী ও মেয়েকে ভারতে ফিরে যেতে হয়। আগামী বছর স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের পর পরিবারকে আবার ব্রিটেনে ফিরিয়ে আনার আশা করেছিলেন তিনি। কিন্তু ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের পথ বাতিলের প্রস্তাব তার সেই পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। সামি বলেন, তার স্ত্রী ব্রিটেনের জন্য অনেক অবদান রেখেছেন এবং কোভিড-১৯ টিকাদান কার্যক্রমে দায়িত্বশীল পদে কাজ করেছেন। তিনি চান তার মেয়েও ব্রিটেনে বড় হোক।১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের পথ বাতিলের প্রস্তাব এখনো কার্যকর হয়নি এবং সরকারও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। আবাসনবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনার ব্রিটেনে আগে থেকেই থাকা বিদেশি কর্মীদের ওপর নতুন নিয়ম প্রয়োগের পরিকল্পনাকে ‘ব্রিটিশ মূল্যবোধের পরিপন্থী’ বলে সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ লেবার পার্টির সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগে থেকেই ব্রিটেনে থাকা অভিবাসীদের ওপর প্রস্তাবিত পরিবর্তন প্রয়োগের বিষয়টি কিছুটা শিথিল করা হতে পারে।স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র জানান, গত বছরের নভেম্বরে সরকার এমন সংস্কারের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছিল, যার লক্ষ্য স্থায়ী বসবাসকে স্বয়ংক্রিয় অধিকার না রেখে অর্জন করতে হয়—এমন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা। এসব সংস্কারের কয়েকটি দিক নিয়ে পরামর্শ গ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়া যথাসময়ে প্রকাশ করা হবে।সূত্রঃ দ্য আই পেপার

ব্রিটেনে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের স্থায়ী অনুমতি সংক্রান্ত নিয়মে পরিবর্তনের প্রস্তাব ও অভিবাসীদের উদ্বেগ

প্রকৃতির শৃঙ্খলা

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুলভোরের আকাশে রবি হাসে, সোনার আলো ভাসে,শিশিরভেজা ঘাসের বুকে মুক্তো ঝিলিক জ্বালে।ভোরের পাখি মধুর সুরে জাগায় বন-প্রান্তর,নিয়ম মেনে নদী ছুটে চলে নিরন্তর।নদী চলে সাগর পানে, থামে না তার ধারা,পাহাড় দাঁড়ায় মাথা তুলে, অটল সে চিরসারা।দিনের শেষে সন্ধ্যা নামে রাঙা মেঘের ভেলায়,চাঁদের হাসি জোছনা হয়ে নামে রাতের খেলায়।তারার মেলা নীল আকাশে জ্বলে আপন তালে,নিশির হাওয়া ফুলের গন্ধ বিলায় বন-ডালে।ঋতুর পরে ঋতু আসে, বদলায় ধরার রূপ,শীতের বুকে কুয়াশা নামে, বসন্তে ফুলের ধূপ।গ্রীষ্ম আনে তপ্ত রোদন, বর্ষা আনে জল,শরৎ হাসে সাদা মেঘে, হেমন্তে সোনার ফল।পাতার ফাঁকে বাতাস বাজায় অদৃশ্য এক বাঁশি,প্রজাপতির রঙিন ডানায় জাগে বনের হাসি।মৌমাছিরা ফুলের বুকে খোঁজে মধুর দান,ফুলের গন্ধে ভরে ওঠে প্রকৃতিরই প্রাণ।নিয়ম মেনে আপন পথে চলে বিশ্বভুবন,ছন্দে বাঁধা এই পৃথিবী, ছন্দে বাঁধা জীবন।সূর্য ওঠে নিয়ম মেনে, নিয়ম মেনে নামে,চাঁদও হাসে আপন তালে নীল আকাশের থামে।দিনের পরে রাত যে আসে, রাতের পরে দিন,নিয়ম মেনে ঘুরছে ধরার জীবন-রথ প্রতিদিন।প্রকৃতিই  শেখায় মোদের নিয়ম মানাই ধর্ম,ছন্দময় এই বিশ্বজুড়ে শৃঙ্খলাই তো মর্ম।নিয়ম মেনে চললে জীবন সুন্দর হয়ে ওঠে,শৃঙ্খলারই ছন্দ বাজে সৃষ্টির প্রতিটি পাঠে।লেখক পরিচিতি:লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল( শিক্ষক, কবি,কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি), কেন্দ্রীয় কমিটিযুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)ফোন: ০১৫৫২৬৩১১১৮,  ০১৮৪২৬৩১১১৮E-mail: lionganibabul@gmail.com

প্রকৃতির শৃঙ্খলা

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর প্রতি একটি খোলা চিঠি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,আপনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইংকে, যার বিরুদ্ধে আইসিসিতে একটি মামলা আছে এবং যিনি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত। তিনি সার্বিয়ার মিলোশেভিচের মতো রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছেন। সার্বিয়ার মিলোশেভিচ লক্ষ লক্ষ বসনিয়ান মুসলমানকে হত্যা করেছিলেন। তাকে আইসিসিতে বিচার করা হয়েছিল। মিন অং হ্লাইংয়ের অপরাধও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় বিচারাধীন।২০১২ সালে রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা ও মুসলমানদের ওপর বৌদ্ধ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চালানো হয়। এর জন্য কফি আনান কমিশন একটি রিপোর্ট পেশ করে। যেদিন রিপোর্ট পেশ করা হয়, সেদিনই মিন অং হ্লাইং রোহিঙ্গাদের ওপর অপারেশন চালান।আসিয়ান ও অন্যান্য সহযোগী দেশ মিন অং হ্লাইংয়ের সামরিক সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। আপনি তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যু এবং মিয়ানমারের শরণার্থী সংকট নিয়ে মিয়ানমারের যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত প্রেসিডেন্টকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কেন?ফিলিস্তিনে শরণার্থীদের জন্য আপনি যদি ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকেও আমন্ত্রণ জানান, ইসরায়েলকে কি স্বীকৃতি দেন? এই দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।রাখাইন প্রদেশে চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যে আপনি কীভাবে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন? ২০১২ -২০১৭  এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গারা নৌকায় করে নিজের জীবন বাজি রেখে মালয়েশিয়ায় এসেছিল নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। তাদেরকে নিরাপদ স্থান থেকে আবার ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠাচ্ছেন আপনি।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তার ভিত্তিতে। চলমান সংঘাতের মধ্যে তাদের জীবনকে আবারও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না।ফয়সাল আলমরহিঙ্গা হিউমান রাইট এক্টিভিস্ট

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর প্রতি একটি খোলা চিঠি

বিশ্ব শিক্ষক দিবস: শিক্ষকই গড়েন আগামীর মানুষ

প্রতিটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর, আর সেই শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্রে রয়েছেন শিক্ষক। একজন প্রকৃত শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেন না; তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও মানবিকতাকে বিকশিত করেন। তাই শিক্ষকতা নিছক একটি পেশা নয়—এটি মানুষ গড়ার এক মহান দায়িত্ব।প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। শিক্ষকদের অবদান, অধিকার, মর্যাদা ও পেশাগত উন্নয়নের গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী তুলে ধরাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। ১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর উদ্যোগে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে এটি শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দিবসে পরিণত হয়েছে। শিক্ষক: জ্ঞান থেকে প্রজ্ঞার পথেবর্তমান বিশ্বে তথ্যের কোনো অভাব নেই। ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও নানা ধরনের অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী মুহূর্তেই মানুষের সামনে বিপুল তথ্য হাজির করতে পারে। কিন্তু তথ্য আর জ্ঞান এক বিষয় নয়, আর জ্ঞানও সবসময় প্রজ্ঞায় পরিণত হয় না। এখানেই শিক্ষকের অনন্য ভূমিকা।কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য, কোনটি বিভ্রান্তিকর, কীভাবে যুক্তি দিয়ে কোনো বিষয় বিশ্লেষণ করতে হয়, কীভাবে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে হয়—এসব শেখানোর ক্ষেত্রে একজন দক্ষ শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। প্রযুক্তি শিক্ষকের বিকল্প নয়; বরং একজন দক্ষ শিক্ষক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে শিক্ষাকে আরও কার্যকর, আনন্দময় ও জীবনমুখী করে তুলতে পারেন। বাংলাদেশের শিক্ষকতা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জবাংলাদেশের শিক্ষা বিস্তারে শিক্ষকসমাজের অবদান অনস্বীকার্য। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, পাহাড়ি অঞ্চল থেকে চরাঞ্চল—দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লাখ লাখ শিক্ষক প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের আলোকিত করার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও অনেক শিক্ষক নিষ্ঠা, মেধা ও মানবিকতার সঙ্গে তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন। তবে শিক্ষকতার সামনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক চাপ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা, মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ—এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে হলে শুধু নতুন ভবন নির্মাণ বা আধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহ করলেই হবে না। শিক্ষকের মানসম্মত প্রশিক্ষণ, মর্যাদা, পেশাগত স্বাধীনতা, গবেষণার সুযোগ এবং কাজের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।শিক্ষককে সম্মান মানে ভবিষ্যৎকে সম্মানএকজন চিকিৎসক সুস্থ জীবন ফিরিয়ে দেন, একজন প্রকৌশলী অবকাঠামো নির্মাণ করেন, একজন বিজ্ঞানী নতুন জ্ঞানের দ্বার উন্মোচন করেন—কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের পেছনেই কোনো না কোনো শিক্ষকের অবদান থাকে। একজন শিক্ষকের প্রভাব তাই একটি শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।একজন ভালো শিক্ষক কখনো কখনো একটি শিক্ষার্থীর জীবন বদলে দিতে পারেন। হতাশ একজন শিক্ষার্থীকে তিনি আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারেন, সম্ভাবনাময় একজন শিক্ষার্থীকে তার প্রতিভা বিকাশের পথ দেখাতে পারেন এবং ভুল পথে যাওয়া একজন তরুণকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারেন।এই কারণেই শিক্ষককে সম্মান করা শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। পরিবর্তিত বিশ্বে শিক্ষকের নতুন ভূমিকাচতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মজগত শিক্ষার ধারণাকেও বদলে দিচ্ছে। ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য প্রস্তুত করলেই চলবে না। তাকে সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তা, যোগাযোগ, দলগত কাজ, সৃজনশীলতা, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আজীবন শেখার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।এ ক্ষেত্রে শিক্ষককে হতে হবে শুধু বক্তা নয়, একজন মেন্টর, পথপ্রদর্শক ও সহযাত্রী।শিক্ষার্থীর প্রশ্নকে উৎসাহিত করা, ভুল থেকে শেখার সুযোগ দেওয়া এবং তার নিজস্ব চিন্তাশক্তিকে বিকশিত করা—আধুনিক শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে অনুসন্ধান, গবেষণা ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার দিকে অগ্রসর হওয়া সময়ের দাবি।শিক্ষক ও নৈতিক সমাজএকটি উন্নত রাষ্ট্র শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মাধ্যমে গড়ে ওঠে না। নৈতিকতা, মানবিকতা, সহনশীলতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাগরিক ছাড়া কোনো দেশই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না। এই মূল্যবোধগুলো গড়ে তোলার প্রথম সারির কারিগর শিক্ষকরা। একজন শিক্ষক যখন সততা, ন্যায়, সহমর্মিতা ও দেশপ্রেমের শিক্ষা দেন, তখন তিনি আসলে ভবিষ্যতের একটি উন্নত সমাজের ভিত্তি নির্মাণ করেন।তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু ‘কী পড়ানো হবে’—এই প্রশ্নের পাশাপাশি ‘কী ধরনের মানুষ তৈরি হবে’—এই প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকারবিশ্ব শিক্ষক দিবস কেবল শিক্ষকদের শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়; এটি শিক্ষকতা পেশার প্রতি আমাদের সামগ্রিক দায়িত্ব নতুন করে স্মরণ করার দিন। শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান, পেশাগত নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ এবং আধুনিক শিক্ষণ-উপকরণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের মতামতকে শিক্ষা-নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার।একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে নিজেদের দক্ষতা ও জ্ঞানকে ক্রমাগত সমৃদ্ধ করতে হবে। কারণ একজন শিক্ষক নিজে যত বেশি শিখবেন, তাঁর শিক্ষার্থীদের শেখার পরিসরও তত বিস্তৃত হবে।শেষ কথাএকটি জাতির প্রকৃত সম্পদ তার মানুষ। আর সেই মানুষকে জ্ঞানী, দক্ষ, সৃজনশীল ও মানবিক করে গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান কারিগর শিক্ষক। তাই শিক্ষকের প্রতি বিনিয়োগ মূলত একটি জাতির ভবিষ্যতের প্রতি বিনিয়োগ। বর্তমান সরকার শিক্ষা-সংক্রান্ত উদ্যোগের পাশাপাশি শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের বাস্তব সমস্যাগুলো বেতন-ভাতা, পদোন্নতি, পদসৃজন, শিক্ষকস্বল্পতা, প্রশাসনিক চাপ, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং সামাজিক মর্যাদা—বাস্তবতার আলোকে সমাধান করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমাদের প্রত্যাশা হোক—শিক্ষক যেন শুধু পাঠদানকারী হিসেবে নয়, জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে যথাযথ মর্যাদা পান। শ্রেণিকক্ষ হোক জ্ঞান, মানবিকতা ও সৃজনশীলতার মিলনস্থল। আর প্রতিটি শিক্ষক যেন তাঁর শিক্ষার্থীর মধ্যে শুধু একজন সফল পেশাজীবী নয়, একজন সৎ, বিবেকবান ও মানবিক মানুষকে দেখতে পান।শিক্ষককে সম্মানিত করা মানে শুধু একজন মানুষকে সম্মান করা নয়; বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎকে সম্মান করা।বিশ্ব শিক্ষক দিবসে পৃথিবীর সব শিক্ষককে গভীর শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা।লেখক,অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ এবং প্রভোস্ট , শাহ আমানত হল ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস: শিক্ষকই গড়েন আগামীর মানুষ

ব্যাংক সংকট ও শেয়ার বাজারে দৃশ্যমান প্রভাব

​সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চরম তারল্য সংকট এবং একীভূতকরণের (Merger) আলোচনার কারণে পুরো আর্থিক খাতেই এক ধরনের অনাস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।​প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের অভাব: দেশের পুঁজিবাজারের বড় চালিকাশক্তি হলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তারল্য সংকট থাকায় তারা বাজারে কোনো সাপোর্ট বা নতুন বিনিয়োগ করতে পারছে না।​বিনিয়োগকারীদের মনস্তাত্ত্বিক ভয়: আর্থিক খাতের ভিত্তি নড়বড়ে দেখলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজি রক্ষায় প্যানিক সেল (Panic Sell) শুরু করেন, যার ফলে বাজারের সূচক টানা নিম্নমুখী থাকে।​গত ১৭ বছর বাংলাদেশের শেয়ার বাজার উন্নতি না হওয়ার মূল কারণ​বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বছরের পর বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে থাকার প্রধানতম কারণগুলো হলো:​ফ্লোর প্রাইসের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব: কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম ধরে রাখার (Floor Price) নীতির কারণে দীর্ঘদিন বাজারে স্বাভাবিক লেনদেন ব্যাহত হয়েছে এবং বিদেশী ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।​আইপিও (IPO) ও দুর্বল কোম্পানির দাপট: ভালো ও লাভজনক বহুজাতিক বা বড় দেশীয় কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনা সম্ভব হয়নি। উল্টো কারসাজিপূর্ণ আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেওয়া দুর্বল কোম্পানিকে প্রিমিয়ামসহ আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।​ইনস্ট্রুমেন্টের অভাব (Lack of Product Diversity): ১৭ বছর ধরে বাজার কেবল ইকুইটি/শেয়ার-নির্ভর রয়ে গেছে। উন্নত বন্ড মার্কেট, মিউচুয়াল ফান্ড, ডেরিভেটিভস কিংবা ইটিএফ (ETF) গড়ে না ওঠায় সাধারণ বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি কমানোর সুযোগ ছিল না।​ইনসাইডার ট্রেডিং ও শাস্তির অভাব: কারসাজির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রগুলোকে বড় ধরনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বা আর্থিক জরিমানা আদায় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।​নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধারাবাহিকতার অভাব: বারবার নীতি পরিবর্তন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার (BSEC) মধ্যকার সমন্বয়হীনতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করেছে।​বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জরুরি করণীয়​পুঁজিবাজারে বিগত দেড় দশকের সঞ্চিত ক্ষত দূর করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অবিলম্বে কিছু নীতিগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে:​বিশেষ তদন্ত কমিটি ও ট্রাইব্যুনাল গঠন: গত ১৭ বছরে যারা ফ্লোর প্রাইস, প্লেসমেন্ট শেয়ার এবং ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীর পুঁজি হাতিয়ে নিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।​'টার্নঅ্যারাউন্ড ফান্ড' ও ডেট-টু-ইকুইটি সোয়াপ: দেউলিয়া না করে সম্ভাবনাময় বন্ধ কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে ব্যাংকের অকার্যকর ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর (Debt-to-Equity Swap) করার আইনি অবকাঠামো তৈরি করতে হবে।​বহুজাতিক ও লাভজনক সরকারি কোম্পানি তালিকাভুক্তকরণ: বাজারে মানসম্পন্ন শেয়ারের জোগান বাড়াতে ভালো পারফর্ম করা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান (যেমন: গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের লাভজনক কোম্পানি) এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার জন্য নীতিগত বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে।​বিএসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয় সেল: পুঁজিবাজার ও ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দূর করে সুনির্দিষ্ট নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে, যেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে আশ্বস্ত হন।​উপসংহার​বিএসইসির চেয়ারম্যানের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক নীতিগত যৌক্তিকতা থাকলেও, শুধুমাত্র লেনদেন বন্ধ বা তালিকাচ্যুত করাই বাজারের সমাধান নয়। যেসব নিষ্ক্রিয় কোম্পানির বিশাল সম্পদ রয়েছে, সেগুলোকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় নতুন ব্যবস্থাপনা ও বোর্ডের অধীনে এনে চালু করার কার্যকর রূপরেখা থাকা প্রয়োজন—যাতে বাজারের গভীরতা (Market Depth) বৃদ্ধি পায় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসে।

ব্যাংক সংকট ও শেয়ার বাজারে দৃশ্যমান প্রভাব

প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন অভিজ্ঞতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কর্মক্ষমতা কিছুটা কমে এলেও জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, মূল্যবোধ ও সামাজিক অবদান কোনোভাবেই কমে যায় না। বরং একটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের গুরুত্বপূর্ণ ধারক- বাহক  প্রবীণরা। অথচ জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে অনেক প্রবীণ মানুষ একাকিত্ব, অবহেলা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, নিরাপত্তাহীনতা এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। তাই প্রবীণদের সুরক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও।বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বাড়ছে। এর ফলে আগামী দিনে প্রবীণদের স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন, চলাচল, আর্থিক সুরক্ষা ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। উন্নত সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সেখানে শিশু, নারী, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণসহ অপেক্ষাকৃত ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশেও প্রবীণদের জন্য বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ থাকলেও সামগ্রিকভাবে একটি সমন্বিত প্রবীণবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।প্রবীণদের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তার জায়গা হওয়া উচিত পরিবার। আমাদের ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক কাঠামোয় বাবা-মা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের দীর্ঘ সংস্কৃতি রয়েছে। কিন্তু নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং জীবনের ব্যস্ততার কারণে অনেক পরিবারে প্রবীণরা আগের মতো সময় ও সঙ্গ পাচ্ছেন না। সন্তানরা কর্মসূত্রে দূরে থাকছেন, অনেক প্রবীণ একা বসবাস করছেন। কেউ কেউ আবার পরিবারের মধ্যেই মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। এই পরিস্থিতি প্রবীণদের শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগের কারণ।প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ব শুধু নিয়মিত খাবার বা ওষুধের ব্যবস্থা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের সঙ্গে কথা বলা, সময় দেওয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণে মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সামাজিকভাবে সক্রিয় রাখাও জরুরি। পরিবারের ছোটদেরও প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিতে হবে। একজন প্রবীণ মানুষ যেন নিজ ঘরেই নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে না করেন, সেটি নিশ্চিত করা পরিবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।স্বাস্থ্যসেবা প্রবীণ সুরক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, শ্রবণশক্তি হ্রাস, হাড়ের দুর্বলতা, স্মৃতিজনিত সমস্যা এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ে। কিন্তু অনেক প্রবীণ নিয়মিত চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার সুযোগ পান না। আবার চিকিৎসা ব্যয়ও অনেক পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সরকারি হাসপাতাল ও কমিউনিটি পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় প্রবীণবান্ধব সেবা জোরদার করা প্রয়োজন। তাঁদের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য চিকিৎসা ব্যবস্থা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা এবং বিশেষজ্ঞ পরামর্শের সুযোগ বাড়াতে হবে।প্রবীণদের নিরাপত্তার সঙ্গে চলাচলের বিষয়টিও সরাসরি জড়িত। রাস্তা পারাপার, ফুটপাত ব্যবহার, গণপরিবহনে ওঠানামা কিংবা ব্যস্ত সড়কে চলাচলের সময় প্রবীণরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক ফুটপাত দখল হয়ে থাকায় তাঁদের বাধ্য হয়ে সড়কে নামতে হয়। গণপরিবহনে পর্যাপ্ত আসন, নিরাপদ ওঠানামার ব্যবস্থা এবং চালক-হেলপারদের আচরণও তাঁদের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই প্রবীণবান্ধব সড়কব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত করা, নিরাপদ পারাপার ব্যবস্থা তৈরি, পর্যাপ্ত জেব্রা ক্রসিং ও পথচারী সংকেত স্থাপন এবং গণপরিবহনে প্রবীণদের জন্য অগ্রাধিকারমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার।একটি প্রবীণবান্ধব নগর কেবল বড় বড় ভবন বা প্রশস্ত সড়ক দিয়ে তৈরি হয় না। নগর পরিকল্পনায় মানুষের বয়স ও সক্ষমতার বৈচিত্র্যকে বিবেচনায় নিতে হয়। পার্ক, খোলা জায়গা, বসার স্থান, গণশৌচাগার, নিরাপদ হাঁটার পথ, পর্যাপ্ত আলো এবং সহজে প্রবেশযোগ্য সরকারি ও বেসরকারি সেবা প্রবীণদের জীবনকে অনেক সহজ করতে পারে। হাসপাতাল, ব্যাংক, সরকারি অফিস ও গণপরিবহনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন কমানো এবং অগ্রাধিকার সেবা চালু করাও প্রয়োজন।প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মজীবন শেষ হওয়ার পর অনেক মানুষের আয় কমে যায় বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। যাঁদের অবসরকালীন সঞ্চয় বা পেনশন নেই, তাঁদের জন্য জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে পড়ে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন, ভাতা প্রদানে স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। প্রবীণদের জন্য সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে পারলে তাঁদের জীবনের অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমবে।তবে আর্থিক সহায়তা দিয়েই প্রবীণদের সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। মানসিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অবসর গ্রহণের পর অনেকেই মনে করেন তাঁদের সামাজিক ভূমিকা শেষ হয়ে গেছে। এই ধারণা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সামাজিক, শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা যেতে পারে। তাঁদের দিয়ে তরুণদের পরামর্শমূলক কার্যক্রম, স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণ, শিক্ষা সহায়তা, সামাজিক সচেতনতা এবং স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ পরিচালনা করা সম্ভব। এতে প্রবীণরা যেমন নিজেদের প্রয়োজনীয় মনে করবেন, তেমনি সমাজও তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হবে।প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের যুগে প্রবীণদের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিও জরুরি। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা, টেলিমেডিসিন, সরকারি সেবা ও যোগাযোগের বড় অংশ এখন প্রযুক্তিনির্ভর। কিন্তু অনেক প্রবীণ এসব ব্যবস্থার সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারেন না। তাঁদের জন্য সহজ ভাষায় ডিজিটাল প্রশিক্ষণ, নিরাপদ অনলাইন লেনদেন সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রতারণা থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কারণ প্রযুক্তিগত অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে প্রতারকচক্র প্রবীণদের লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।প্রবীণদের প্রতি সহিংসতা ও অবহেলাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা। শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন, সম্পত্তি দখল, আর্থিক প্রতারণা কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক প্রবীণ সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কিংবা অসহায়ত্বের কারণে এসব ঘটনা প্রকাশ করেন না। তাঁদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে প্রবীণ নির্যাতনকে ব্যক্তিগত পারিবারিক বিষয় হিসেবে এড়িয়ে না গিয়ে সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা হয়।রাষ্ট্রের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে প্রবীণদের তালিকা, প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা, স্বাস্থ্য ক্যাম্প, সামাজিক মিলনকেন্দ্র ও নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং যুবসমাজকে যুক্ত করলে এসব উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।গণমাধ্যমও প্রবীণদের অধিকার ও সুরক্ষা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রবীণদের সমস্যা নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন, বিশেষ অনুষ্ঠান, জনমত গঠন এবং সফল প্রবীণদের জীবন ও অবদান তুলে ধরা দরকার। প্রবীণদের শুধু সহায়তা পাওয়ার মানুষ হিসেবে নয়, সমাজের সম্পদ হিসেবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।আমাদের মনে রাখতে হবে, আজকের তরুণই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের সুরক্ষা আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিজেদের নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। যে সমাজ তার প্রবীণদের সম্মান করে, সেই সমাজ মানবিক মূল্যবোধকে সম্মান করে। প্রবীণদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, এটি তাঁদের অধিকার।প্রবীণদের সুরক্ষায় পরিবারকে দায়িত্বশীল হতে হবে, রাষ্ট্রকে কার্যকর নীতি ও সেবা নিশ্চিত করতে হবে, স্থানীয় প্রশাসনকে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে, চিকিৎসাব্যবস্থাকে প্রবীণবান্ধব করতে হবে এবং সমাজের প্রতিটি মানুষকে মানবিক আচরণ করতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক, গণপরিবহন, নগর পরিকল্পনা, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও ডিজিটাল ব্যবস্থাকে প্রবীণদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সাজাতে হবে।প্রবীণরা আমাদের অতীতের সাক্ষী, বর্তমানের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীবন্ত শিক্ষার উৎস। তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায় যেন একাকিত্ব, অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতায় না কাটে, তা নিশ্চিত করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কাজ করলেই একটি প্রবীণবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। প্রবীণদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু তাঁদের জীবনকে নিরাপদ করা নয়, বরং সমাজের মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও সভ্যতার মানকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়া। তাই প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা।লেখক পরিচিতি:লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটিযুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটিফোন: ০১৫৫২৬৩১১১৮, ০১৮৪২৬৩১১১৮ইমেইল: lionganibabul@gmail.com 

প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও প্রমাণের রাজনীতি: আইনের শাসন রক্ষায় সরকারের করণীয়

একটি গণতান্ত্রিক ও সুস্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থার পূর্বশর্ত হলো শক্তিশালী ‘আইনের শাসন’। সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি)-র নেতাদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র শীর্ষপর্যায়ের কয়েকজন নেতার নাম উল্লেখ করে চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করতে দেখা যাচ্ছে। নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, এই ধরনের পরিস্থিতি সরকারের জন্য একটি বড় আইনি ও প্রশাসনিক পরীক্ষা। রাজনৈতিক অঙ্গনে যদি ঢালাও বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগের কোনো আইনি সমাধান না হয়, তবে সাধারণ জনগণের মনে বিভ্রান্তি ও সংশয় ছড়িয়ে পড়ে—যা গণতন্ত্রের সুদূরপ্রসারী ক্ষতি করে।​গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই বিষয়ে সংবিধান ও প্রচলিত আইন কী বলে, এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত, তা অনুধাবন করা জরুরি:​১. সংবিধানের মূল চেতনা ও আইনের সাম্য:গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন বা রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” যদি কোনো নেতার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট চাঁদাবাজির প্রমাণ থাকে, তবে অপরাধী রাজনৈতিকভাবে যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, তাঁকে আইনের আওতায় এনে বিচার করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।​২. বিচার বিভাগ ও প্রমাণভিত্তিক আইনি প্রক্রিয়া:গণমাধ্যমে বা জনসভায় অভিযোগ তুলে রাজনীতি উত্তপ্ত করার চেয়ে দায়িত্বশীল রাজনীতির পরিচয় হলো উপযুক্ত প্রমাণাদিসহ আদালতের শরণাপন্ন হওয়া। অভিযোগকারী দল বা নেতাদের কাছে সত্যি কোনো তথ্যপ্রমাণ থাকলে, প্রথাগত রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি না করে তাঁদের সরাসরি আদালতে গিয়ে মামলা করা অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য প্রমাণ জমা দেওয়া উচিত।​৩. মিথ্যা অপপ্রচার ও মানহানির আইনি পরিণতি:সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও সুনামের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। যদি তদন্তে দেখা যায় এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, প্রমানহীন বা কেবল রাজনৈতিকভাবে মানহানি করার উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে—তবে দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারা (মানহানি আইন) অনুযায়ী মিথ্যা অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। অপরাধ প্রমাণ ছাড়া কাউকে প্রকাশ্যে অপরাধী বানানো যেমন আইনি ব্যবস্থার পরিপন্থী, তেমনি অপরাধীকে শাস্তি না দেওয়াও আইনের শাসনের বরখেলাপ।​জনগণের বিভ্রান্তি নিরসনে সরকারের করণীয়:সরকার যদি এই ধরনের বড় পরিসরের অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত না করে বা নীরব ভূমিকা পালন করে, তবে সাধারণ মানুষ কোনটা সত্য আর কোনটা রাজনৈতিক অপপ্রচার—তা নির্ধারণ করতে না পেরে চরম বিভ্রান্তিতে পড়ে। এতে রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা ও শাসন ব্যবস্থার ওপর থেকে জনগণের আস্থা উঠে যায়।​একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারকে অবশ্যই এসব বিষয়ের সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে অথবা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আইনি কাঠামোর মধ্যে এসে অভিযোগ প্রমাণের মুখোমুখি করতে হবে। ফাঁকা বুলি বা অভিযোগের রাজনীতি বন্ধ করে আইনি প্রক্রিয়ার ওপর দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দাঁড় করানোই এখন সময়ের দাবি।​— একজন সচেতন নাগরিক

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও প্রমাণের রাজনীতি: আইনের শাসন রক্ষায় সরকারের করণীয়

আজকের বিশৃঙ্খলা বনাম জিয়াউর রহমানের সুশাসন: কেন মানুষ আজও তাঁকে স্মরণ করে

​ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতা বিপ্লবের মাধ্যমে যখন জিয়াউর রহমান দেশের হাল ধরেন এবং পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের ২১ই এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত সংকটময়। সেখান থেকে শক্ত হাতে তিনি একটি অরাজক দেশকে সুশৃঙ্খল, সম্মানজনক ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্রে রূপান্তর করেছিলেন।​১৯৮১ সালের কথা। জীবন ও জীবিকার তাগিদে আমি দুবাই চলে যাই। প্রবাসে অবস্থান করলেও সবসময় দেশের খবর রাখতাম। তিনি ক্ষমতায় আসার পর আমরা দেখেছি—কীভাবে দ্রুত তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিলেন।​তাঁর শাসনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল অপরাধের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' ও শক্ত প্রশাসনিক শৃঙ্খলা। অপরাধী, বখাটে কিংবা আইন ভঙ্গকারীদের বিষয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল এক চুল ছাড় না দেওয়া নীতিতে কঠোর। গভীর রাতেও সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে রাস্তায় চলাফেরা করতে পারত। তিনি কথার চেয়ে কাজের শক্তিতে বেশি বিশ্বাসী ছিলেন। কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়—খাল কাটা কর্মসূচি, কৃষি বিপ্লব, প্রবাসী শ্রমবাজারের দ্বার উন্মোচন এবং তৈরি পোশাক শিল্পের ভিত্তি স্থাপনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশকে স্বনির্ভরতার সঠিক পথ দেখিয়েছিলেন।​কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক মর্মান্তিক ও দেশবিরোধী চক্রান্তের মাধ্যমে কতিপয় বিদ্রোহী সেনাসদস্য তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেই রক্তঝরা সংবাদের পর সমগ্র বাংলাদেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। দল-মত নির্বিশেষে দেশের কোটি কোটি মানুষ সেদিন চোখের জলে ভেসেছিল। ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তাঁর জানাজায় মানুষের যে বিপুল জনসমুদ্র নেমেছিল, তা জাতীয় ইতিহাসে বিরল।​আজকে যখন প্রবাসে বসে দেশের পরিস্থিতি দেখি, সত্যি ভীষণ অবাক ও মর্মাহত হই। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জায়গায় যা ঘটছে—হাসপাতালে প্রকাশ্য হামলা ও ভাঙচুর চালানো, কিংবা 'মব' সৃষ্টি করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তার জন্য দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু হাসপাতাল বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করা হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জায়গাটি কোথায় থাকে?​এভাবে চলতে থাকলে দেশের আনাচে-কানাচে যে যার মতো আইন হাতে তুলে নেবে। এটি আর যা-ই হোক, কখনোই গণতন্ত্র হতে পারে না; এটি অবাধ বিশৃঙ্খলা ও 'মব-রুল'।​একটি দেশকে সঠিক পথে রাখতে এবং জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যে কঠোর অনুশাসন, দূরদর্শী নেতৃত্ব ও আইনি শাসন দরকার—প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তা বাস্তব কাজের মাধ্যমেই প্রমাণ করে গেছেন। সেই কারণেই যুগ পার হয়ে গেলেও একজন সৎ, দূরদর্শী ও শক্ত হাতের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মানুষ আজও তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করে।

আজকের বিশৃঙ্খলা বনাম জিয়াউর রহমানের সুশাসন: কেন মানুষ আজও তাঁকে স্মরণ করে

কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

শিশুর নিরাপদ শৈশব তার মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে এখনও বহু কন্যাশিশু জন্মের পর থেকেই নানা ধরনের বৈষম্য, সহিংসতা, নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, যৌন হয়রানি, অনলাইন নিপীড়ন এবং শিক্ষাবঞ্চনার ঝুঁকিতে বেড়ে ওঠে। একটি কন্যাশিশুকে নিরাপদ পরিবেশে বড় করে তোলা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়, এর সঙ্গে রাষ্ট্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সর্বোপরি সমাজের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব জড়িত। তাই কন্যাশিশুর সুরক্ষা কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক ইস্যু নয়, এটি একটি দেশের মানবিকতা, আইনের শাসন ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন আইন, নীতিমালা ও সরকারি কর্মসূচি রয়েছে। কিন্তু আইন ও নীতির উপস্থিতির সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে এখনও যে ব্যবধান রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে বা MICS-এর তথ্য এ বিষয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথভাবে পরিচালিত এই জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ বর্তমানে বিবাহিত। একই জরিপে দেখা যায়, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ গত এক মাসে শারীরিক শাস্তি অথবা মানসিক আগ্রাসনের অভিজ্ঞতা পেয়েছে।পরিসংখ্যান শুধু কিছু সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর জীবন, একটি পরিবারের গল্প এবং একটি অপূর্ণ সম্ভাবনা। বাল্যবিবাহের ফলে একটি কন্যাশিশু শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে, অল্প বয়সে মাতৃত্বের ঝুঁকিতে পড়ে, অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে যায় এবং পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়ে। ইউনিসেফ বলছে, বাল্যবিবাহের সঙ্গে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, অপুষ্টি, গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং ঘরের ভেতর সহিংসতার ঝুঁকি সম্পর্কিত।বাংলাদেশের কন্যাশিশুর সুরক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বাল্যবিবাহ। আইন থাকা সত্ত্বেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা কারণে এটি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। দরিদ্রতা, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপ, কন্যাশিশুকে পরিবারের বোঝা হিসেবে দেখার মানসিকতা, যৌতুকের ভয় এবং ‘মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দেওয়া’কে সামাজিক নিরাপত্তার উপায় মনে করার প্রবণতা এখনও অনেক ক্ষেত্রে কাজ করে। অথচ একটি মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না বরং তার শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য, আত্মনির্ভরতা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্ব আরও বড় হয়ে ওঠে।কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী অপরিচিত কেউ নয়। যে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী বা পরিচিত পরিবেশকে একটি শিশু নিরাপদ মনে করে, সেখানেও নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিশুরা সহিংসতা, নির্যাতন ও শোষণের মুখোমুখি হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকেও ঝুঁকি তৈরি হয়। শুধু শারীরিক নিরাপত্তাই নয়, কন্যাশিশুর মানসিক নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভয় দেখানো, অপমান করা, অবহেলা করা, অন্য শিশুদের সঙ্গে বৈষম্য করা কিংবা তার মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়াও শিশুর বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একটি শিশুকে বারবার বলা যে সে ‘মেয়ে বলে কম পারবে’, তার চলাফেরা, শিক্ষা বা সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা সীমিত করা এবং ছেলেশিশুর তুলনায় তাকে কম সুযোগ দেওয়া মূলত বৈষম্যের সংস্কৃতিকেই শক্তিশালী করে।ডিজিটাল যুগে কন্যাশিশুর সুরক্ষার প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত হয়েছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট শিশুদের শিক্ষা, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তির নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইলিং এবং যৌন শোষণের মতো ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। ফলে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু বাড়ি ও বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সচেতনতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।শিক্ষা কন্যাশিশুর সুরক্ষার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। যে মেয়ে বিদ্যালয়ে থাকে, নিজের অধিকার সম্পর্কে জানে, প্রয়োজনীয় তথ্য পায় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করার সুযোগ পায়, তার ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার এখনও উদ্বেগের বিষয়। MICS 2025 অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে adjusted net attendance rate ৬০ দশমিক ১ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ।কন্যাশিশুকে শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। তাকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে হবে। নিরাপদ যাতায়াত, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, হয়রানিমুক্ত পরিবেশ, দক্ষ শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও দরিদ্র এলাকার মেয়েদের জন্য শিক্ষা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে পরিবার ও রাষ্ট্রকে বাড়তি সহায়তা দিতে হবে।কন্যাশিশুর সুরক্ষায় জন্মনিবন্ধনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জন্মনিবন্ধন না থাকলে বয়স প্রমাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। MICS 2025 অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মাত্র ৫৯ দশমিক ২ শতাংশের জন্ম নিবন্ধন কোনো নাগরিক কর্তৃপক্ষের কাছে সম্পন্ন হয়েছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জন্মনিবন্ধন ও বয়স যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শুধু কাজি বা নিবন্ধকের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, বিদ্যালয়, পরিবার ও কমিউনিটিকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কোনো কন্যাশিশুর বিয়ে নির্ধারিত হলে বিষয়টি আগেই শনাক্ত করে দ্রুত হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা থাকতে হবে।বাল্যবিবাহরোধে চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সমাজসেবা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১০৯৮-এ ২২ লাখ ৪৮ হাজার ৮৮৭টি কল গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বাল্যবিবাহ বন্ধে ৮ হাজার ২০২টি ঘটনায় সহায়তা করা হয়েছে এবং শিশুনির্যাতনসংক্রান্ত ৫৪ হাজার ১২২টি কলের সেবা দেওয়া হয়েছে। ১০৯৮ নম্বরটি সারাদেশে বিনামূল্যে এবং ২৪ ঘণ্টা সেবা দেয়। শিশু নিজে অথবা অন্য কোনো ব্যক্তি শিশুর সুরক্ষার জন্য এই নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।তবে একটি হেল্পলাইন যতই কার্যকর হোক, প্রতিটি ঘটনা ঘটার পর প্রতিকার দেওয়ার চেয়ে ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিরোধ করা বেশি জরুরি। এজন্য পরিবারে শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তাদের ভয় দেখিয়ে নয়, বুঝিয়ে নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়, কারও অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ বা আচরণে কীভাবে ‘না’ বলতে হবে, বিপদে পড়লে কার কাছে সাহায্য চাইতে হবে এবং অনলাইনে কীভাবে নিরাপদ থাকতে হবে, তা বয়স উপযোগীভাবে শেখানো প্রয়োজন।বিদ্যালয়েও শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়ন জরুরি। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্ভরযোগ্য অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, গোপনীয়তা রক্ষা, দ্রুত অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা থাকা উচিত। কোনো অভিযোগকে ‘পারিবারিক বিষয়’ বা ‘ছোট ঘটনা’ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। শিশুর বক্তব্যকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং অভিযোগকারী শিশুকে দোষারোপ বা সামাজিকভাবে অপমান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগও অপরিহার্য। শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পাচার কিংবা বাল্যবিবাহের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হতে পারে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে শিশুবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।শিশুদের সুরক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশুর ওপর নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশের সময় তার পরিচয় প্রকাশ করে তাকে দ্বিতীয়বার সামাজিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়। বরং গণমাধ্যমকে ঘটনার পাশাপাশি সমস্যার কারণ, আইনগত ব্যবস্থা, প্রতিরোধের উপায় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির বিষয় তুলে ধরতে হবে। জনমত গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গণমাধ্যম কন্যাশিশুর সুরক্ষাকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে।কন্যাশিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়, এটি তার অধিকার। একটি শিশুকে নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ হওয়া মানে শুধু একটি পরিবারকে বিপদে ফেলা নয়; এর মাধ্যমে একটি জাতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করা। তাই কন্যাশিশুকে ‘রক্ষা করার বস্তু’ হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। তার মতামত, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য প্রথমেই পরিবারকে সচেতন হতে হবে। শিশুদের জন্য বিদ্যালয়কে নিরাপদ করতে হবে।  স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের বাল্যবিবাহ ও শিশুনির্যাতন প্রতিরোধে সক্রিয় হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত ও শিশুবান্ধব সেবা নিশ্চিত করতে হবে। শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের সমন্বয় বাড়াতে হবে। অনলাইন নিরাপত্তাকে শিশু সুরক্ষা নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের কন্যাশিশুদের শিক্ষা অব্যাহত রাখতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করতে হবে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ‘ঘটনা ঘটলে ব্যবস্থা’ থেকে ‘ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিরোধ’ ব্যবস্থায় যেতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ কন্যাশিশু ও পরিবার শনাক্তকরণ, বাল্যবিবাহের আগাম সতর্কতা, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধ এবং নির্যাতনের অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ ও সমাধানের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমের নিয়মিত মূল্যায়ন ও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু আজকের একটি শিশুকে রক্ষা করা নয়; আগামী দিনের একজন শিক্ষিত মা, দক্ষ কর্মী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক কিংবা নেতৃত্বদাতা তৈরি করার পথকে নিরাপদ করা। তাই কন্যাশিশুর প্রতি বিনিয়োগ কোনো ব্যয় নয়, এটি জাতির ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু অবকাঠামো, আয় বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। দেশের কন্যাশিশু কতটা নিরাপদে বেড়ে উঠছে, কতজন স্কুলে থাকতে পারছে, কতজন বাল্যবিবাহ থেকে মুক্ত থাকছে এবং নির্যাতনের শিকার হলে কত দ্রুত ন্যায়বিচার ও সহায়তা পাচ্ছে, সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।আজকের শিশুই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তার শৈশব যদি ভয়, বৈষম্য ও অনিরাপত্তায় বন্দী থাকে, তাহলে একটি নিরাপদ ও মানবিক সমাজের স্বপ্ন পূরণ হবে না। তাই পরিবারকে সচেতন, সমাজকে দায়িত্বশীল, প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিমূলক এবং রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর হতে হবে। কন্যাশিশুসহ প্রত্যেকটি  শিশুর  নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস নয়, কোনো অবহেলা নয়। রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই গড়ে উঠতে পারে এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে কন্যাশিশুসহ প্রতিটি শিশু ভয় নয়, সম্ভাবনা নিয়ে বেড়ে উঠবে। তাই কন্যাশিশুসহ প্রত্যেকটি শিশুর সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা।লেখক পরিচিতি:লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটিযুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটিফোন: ০১৫৫২৬৩১১১৮, ০১৮৪২৬৩১১১৮ইমেইল: lionganibabul@gmail.com

কন্যা শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প: সম্ভাবনা, সম্ভাবনা ও স্বকীয়তা

​বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম সেরা ও উন্নত মানের পোশাক তৈরি করে। আমাদের গার্মেন্টসের কাপড়ের ফিনিশিং, নিখুঁত সেলাই এবং মান নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববাজারে প্রশংসিত। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, সুশাসন এবং সদিচ্ছা থাকলে বিশ্বমঞ্চে যেকোনো শক্তিশালী প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।​তবে এই সম্ভাবনার শতভাগ সুফল পেতে হলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে আমাদের অভ্যন্তরীণ কয়েকটি জায়গায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি:​শ্রমিকের প্রাপ্য মূল্যায়ন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন: আমাদের পোশাক শিল্পের মূল চালিকাশক্তি হলো লাখ লাখ কঠোর পরিশ্রমী শ্রমিক। তারা দিনরাত পরিশ্রম করে উন্নত মানের পোশাক তৈরি করছেন। কিন্তু তাদের যদি ন্যায্য পারিশ্রমিক না দিয়ে কম মজুরিতে কাজ করানো হয়, তবে সেটি টেকসই হবে না। মালিকদের প্রফিটের একটি যুক্তিসঙ্গত অংশ শ্রমিকদের কল্যাণ, দক্ষতা বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বিনিয়োগ করা উচিত। শ্রমিক শোষণ বন্ধ করে তাদের সঠিক মূল্যায়ন করলে উৎপাদনশীলতা (Productivity) ও কাজের মান আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।​অর্থ পাচার রোধ ও দেশীয় অর্থনীতিতে পুনর্বিনিয়োগ: পোশাক খাতের অর্জিত অতিরিক্ত মুনাফা দেশের বাইরে না পাঠিয়ে যদি দেশের অভ্যন্তরেই পুনর্নিয়োগ করা হয়, তবে আমাদের টেক্সটাইল ও কাঁচামাল শিল্প আরও স্বাবলম্বী হবে। দেশীয় শিল্পে টাকা বিনিয়োগ হলে বাংলাদেশকে কাঁচামালের জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভর করতে হবে না।​আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে শক্ত অবস্থান: বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের কোয়ালিটি উন্নত হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের (Buyers) কাছে সঠিক দাম বা ফেয়ার প্রাইস দাবি করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। মালিকপক্ষকে শুধু সস্তা মজুরির সুবিধা না নিয়ে পণ্যের গুণগত মানকে সামনে রেখে সঠিক দামে অর্ডার নিতে হবে।​উপসংহার:বিশ্বের অন্যান্য দেশ যদি বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না? আমাদের রয়েছে দক্ষ শ্রমিক এবং বিশ্বমানের পণ্য তৈরির সক্ষমতা। মালিকদের অতি-মুনাফার মানসিকতা ত্যাগ করে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রদান, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দেশে অর্থ বিনিয়োগ করার মানসিকতা তৈরি হলেই বাংলাদেশ বিশ্ব পোশাক বাজারে এক নম্বর স্থান দখল করতে পারবে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প: সম্ভাবনা, সম্ভাবনা ও স্বকীয়তা

আপনার সন্তান কোথায় যায় খোঁজ রাখুন

আপনার সন্তান কোথায় যায় খোঁজ রাখুন । আপনার সন্তান কাদের সাথে মিশছে  ?? বর্তমান এ  পত্রিকার পাতা খুলতেই দেখা যাচ্ছে কিছু দু:খজনক ঘটনা । যে ঘটনার জন্য কোন বাবা , মা কখনোই প্রস্তুত থাকে না । বাবা, মা কখনোই ধারনাই করেন নি , এমন একটা দু:সংবাদ এ পুরো পরিবারে নেমে আসবে , অমানিসার অন্ধকার।  প্রতিটি বাবা, মা সন্তান কে নিয়ে অনেক আশা করেন । স্বপ্ন দেখেন।  এটাই স্বাভাবিক বিষয় । কিন্ত সেই স্বপ্ন, সামান্য একটু ভুলের কারণে সব কিছুই ধুলোর সাথে মিশে যেতে পারে । সমাজের কিছু হিংস্র হায়না,  আপনার সন্তান কে বিপথে নিতে পারে । অন্ধকার গলিতে   একবার চলে গেলে । তাকে কোনদিন আলোর পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না । আপনার সন্তানকে সময় দিন । আপনি অনেক ব্যস্ত থাকেন। তারপরেও আপনার সন্তানের , প্রতিটি মুহূর্তের খোঁজ নিন । লেখাপড়া ঠিক মত করছে তো? নিয়মিত স্কুলে বা কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় তো ??আপনার সন্তান কে , কখনোই  দামী মোবাইল ফোন কিনে দিবেন না । এই দামী মোবাইল ফোন  টা হতে পারে , ওর জীবনের জন্য কাল । একটা ফুলের মতো ছোট শিশুকে , সামান্য একটা মোবাইলের জন্য,  জীবন দিতে দিতে হতে পারে । আপনার তিল, তিল করে গড়ে তোলা  সন্তানদের ভবিষ্যত টা , টুকরো , টুকরো কাচের মতো করে ভেঙ্গে দিবে ঐ সব হিংস্র হায়না । আপনার সন্তান বা আপনি যাদের কে বিশ্বাস করেন,  তাদের দ্বারা ও প্রতারিত হতে পারেন । তাই আপনি সন্তানদের অভিভাবক।  আপনার সর্বোচ্চ সতর্কতাই , পারে , ঐ সব হিংস্র  হায়নাদের থাবা থেকে দুরে রাখতে । আর একটি ফুটফুটে  , ফুলের মতো ছোট্ট শিশু যেন আমরা হারিয়ে যেতে দেব না ।

আপনার সন্তান কোথায় যায় খোঁজ রাখুন

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়ছে জনদুর্ভোগ

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুলজ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু একটি পণ্যের বাজারদরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য সরবরাহ থেকে শুরু করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের আয় যখন জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন নতুন করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই লিটারে ২০ টাকা করে বেড়েছে।সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা বলে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং পার্শ্ববর্তী দেশে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির বিষয়টিও সরকার মূল্য সমন্বয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা ও রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থার আর্থিক চাপ অবশ্যই বিবেচনার বিষয়। কিন্তু এই বাড়তি ব্যয়ের ভার শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে? জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন মালিক, কৃষক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তা প্রত্যেকেই যদি নিজ নিজ ব্যয় সমন্বয়ের চেষ্টা করেন, তাহলে এর সম্মিলিত চাপ গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু একটি প্রশাসনিক মূল্য সমন্বয় হিসেবে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতির পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ডিজেলের গুরুত্ব বিশেষভাবে বেশি। পরিবহন খাতের পাশাপাশি কৃষির সেচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্প খাতেও ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বছরে প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন ডিজেল ব্যবহৃত হয় এবং মোট পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহারে ডিজেলের অংশ প্রায় ৬৪ শতাংশ। এর বড় অংশ পরিবহন খাতে ব্যবহৃত হয়, কৃষি, বিদ্যুৎ ও শিল্পেও এর উল্লেখযোগ্য ব্যবহার রয়েছে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা স্বাভাবিক।সবচেয়ে দ্রুত যে খাতে চাপ তৈরি হতে পারে, তা হলো গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহন। বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, নৌযানসহ বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থায় জ্বালানি ব্যয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচালন ব্যয়। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন মালিকদের ব্যয় বাড়ে। সেই বাড়তি ব্যয় ভাড়া বা পণ্য পরিবহন খরচের মাধ্যমে ভোক্তার ওপর স্থানান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইতোমধ্যে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহন ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দূরপাল্লা ও মহানগর দুই ধরনের বাসের ক্ষেত্রেই একই হারে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর  (মঙ্গলবার) সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাসে বর্তমানে কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ২৩ পয়সা ভাড়া রয়েছে। ১৭ পয়সা বাড়লে তা দাঁড়াবে ২ টাকা ৪০ পয়সা। আর ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় কিলোমিটারপ্রতি বর্তমান ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হতে পারে। জ্বালানির দাম নির্ধারণ করার পর ভাড়া বৃদ্ধির যৌক্তিকতা, পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং বাজারদরের ওপর এর প্রভাবও কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো এর ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’। একটি পণ্য উৎপাদন করতে জ্বালানি লাগে, উৎপাদিত পণ্য বাজারে আনতে পরিবহন লাগে, দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালাতেও বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জ্বালানি ব্যয় হয়। ফলে একটি পর্যায়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অন্য সকল পর্যায়ের ব্যয় বাড়াতে পারে। ব্যবসায়ী যদি পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে পণ্যের দাম বাড়ান, তাহলে তার প্রভাব গিয়ে পড়ে ক্রেতার ওপর। আবার উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে উৎপাদকও মূল্য সমন্বয়ের চেষ্টা করেন। এভাবেই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।কৃষি খাতও এর বাইরে নয়। সেচযন্ত্র, কৃষিপণ্য পরিবহন, যন্ত্রপাতি পরিচালনা এবং বাজারজাতকরণের সঙ্গে জ্বালানি ব্যয় জড়িত। ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্যের বাজারদরেও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। খাদ্যপণ্যের দাম ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়। আগস্ট ২০২৬-এ দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৮.২৬ শতাংশে নেমেছিল এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.০২ শতাংশ। এই অবস্থায় জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির কারণে নতুন করে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয় কি না, তা সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।শিল্প ও ব্যবসা খাতেও এর প্রভাব পড়বে। কারখানার উৎপাদন, কাঁচামাল পরিবহন, পণ্য সরবরাহ ও লজিস্টিক ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। বিশেষ করে যেসব শিল্প ইতোমধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ সুদহার, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসার ব্যয় বাড়াবে এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে জ্বালানির দাম কমিয়ে রাখা সবসময় সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্যের কারণে বিপিসি প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৮৯ টাকা পর্যন্ত লোকসান করছিল এবং দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা পর্যন্ত দাঁড়িয়েছিল। সরকার বলেছে, নতুন মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে বিপিসির বার্ষিক লোকসান কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং সীমান্তপথে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।কিন্তু রাষ্ট্রীয় লোকসান কমানোর পাশাপাশি জনগণের ওপর বাড়তি চাপ কীভাবে কমানো হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে যদি পরিবহন ব্যয়, খাদ্যপণ্যের দাম, কৃষি উৎপাদন ব্যয় এবং সাধারণ পরিবারের মাসিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, তাহলে এর সামাজিক অভিঘাতও বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসায় ব্যয় করেন। তাদের আয় যদি একই হারে না বাড়ে, তাহলে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি জীবনযাত্রার মানে পড়ে।বাজার তদারকি আরও জোরদার করা জরুরি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সুযোগ নিয়ে কোনো মহল যেন অযৌক্তিকভাবে পণ্য ও সেবার দাম বাড়াতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবহন ভাড়া নির্ধারণে বাস্তব ব্যয়, দূরত্ব, জ্বালানি ব্যবহার ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য হিসাব বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, পণ্য পরিবহনে অস্বাভাবিক চার্জ এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থাতেও আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারে তার সুফল কত দ্রুত প্রতিফলিত হবে, দাম বাড়লে কতটা সমন্বয় করা হবে, বিপিসির ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান কত, ভর্তুকির পরিমাণ কত এবং জনগণের ওপর মোট আর্থিক চাপ কতটা তৈরি হচ্ছে, এসব তথ্য নিয়মিতভাবে জনসম্মুখে প্রকাশ করা দরকার। এতে জনগণের মধ্যে মূল্য সমন্বয়ের কারণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি হবে এবং অযথা বিভ্রান্তি ও সন্দেহ কমবে।জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো, গণপরিবহনকে আরও কার্যকর করা, বৈদ্যুতিক ও বিকল্প জ্বালানিনির্ভর যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো, রেল ও নৌপথে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু দাম বাড়িয়ে জ্বালানি খাতের সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করাও জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত।জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর এর প্রভাব কোথায় কতটা পড়ছে, তার নিয়মিত তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন করা। পরিবহন ভাড়া, কৃষি উৎপাদন ব্যয়, শিল্পের উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের সরবরাহ ব্যয় ও বাজারদরের ওপর এর প্রভাব আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কোথাও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু মূল্য ঘোষণা করে বাজারকে নিজের গতিতে ছেড়ে দিলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এর চূড়ান্ত প্রভাব পড়ে মানুষের জীবনযাত্রায়। তাই মূল্য সমন্বয়ের অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি জনস্বার্থ, বাজার স্থিতিশীলতা এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় সংস্থার লোকসান কমানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেই প্রক্রিয়ায় জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন থেকে বাজার, কৃষি থেকে শিল্প এবং উৎপাদন থেকে মানুষের পারিবারিক ব্যয় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো জ্বালানি বাজারের বাস্তবতা ও রাষ্ট্রীয় আর্থিক চাপ মোকাবিলার পাশাপাশি জনদুর্ভোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে যদি কঠোর বাজার তদারকি, যৌক্তিক পরিবহন ভাড়া, কৃষি ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা এবং স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, তবে এর প্রভাব কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অন্যথায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির চাপ ধীরে ধীরে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়াবে। তাই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বাস্তবতা মেনে নিয়েও জনদুর্ভোগ কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।লেখক পরিচিতি:লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটিযুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটিফোন: ০১৫৫২৬৩১১১৮, ০১৮৪২৬৩১১১৮ইমেইল: lionganibabul@gmail.com

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়ছে জনদুর্ভোগ

পুঁজিবাজারের গতি ও নীতিগত সংস্কার: পাকিস্তান মডেলের শিক্ষা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য টেকসই পুঁজিবাজার কেবল শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্র নয়; বরং তা দীর্ঘমেয়াদি অর্থসংস্থান, শিল্পায়ন এবং সাধারণ মানুষের মূলধন বৃদ্ধির প্রধান হাতিয়ার। তবে নীতিগত কাঠামোর জটিলতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ এবং মানসিকতার কারণে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরে গতিহীন অবস্থায় আটকে রয়েছে।  ​সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক পরিচালক এবং ডিএসই ব্রোকার অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সাবেক সভাপতি আহমেদ রশীদ লালী দেশের পুঁজিবাজারের নীতিগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে এক তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।  ​তিনি বলেন, ১৯৯৪ সালের পুরনো মানসিকতা নিয়ে ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক মানের পুঁজিবাজার পরিচালনা করা অসম্ভব। বর্তমানে বাজার স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না; বরং অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারকে আটকে রাখার চেষ্টা চলছে। সূচক একটু বাড়লেই (যেমন ৫৮০০ বা ৫৯০০ পয়েন্টে পৌঁছালে) নানামুখী অপ্রয়োজনীয় নজরদারি এবং অতিরিক্ত কাগজপত্রের চাপে বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।  ​তিনি আঞ্চলিক অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে বলেন, প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা যেখানে মাত্র ২৯০টি কোম্পানি নিয়ে তাদের সূচক ২১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে বাংলাদেশে সাড়ে তিনশরও বেশি তালিকাভুক্ত কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও সূচক ৫ হাজার বা ৬ হাজারের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারছে না। এই কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণের কারণে গত ৭২ বছরেও বাংলাদেশ 'ফ্রন্টিয়ার মার্কেট' থেকে 'ইমার্জিং মার্কেটে' উন্নীত হতে ব্যর্থ হয়েছে।  ​বাংলাদেশের শেয়ারবাজার যখন নিয়ন্ত্রণের চাপে স্থবির, তখন প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের অর্থনীতি কাটিয়ে ওঠার কৌশলটি বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদদের নজর কেড়েছে। চরম অর্থনৈতিক সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের দায়িত্ব নেন গভর্নর জামিল আহমেদ।  ​তিনি অনুভবে আনেন যে, মূল্যস্ফীতি কমানো এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য ফেরানোর সহজ পথ হলো জনগণের হাতে থাকা বিপুল অর্থকে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্রোতে ফিরিয়ে আনা। এর অংশ হিসেবে:১. সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা শেয়ারবাজারের জন্য বিভিন্ন নীতিগত প্রণোদনা ঘোষণা করে।২. বাজারে মূলধন প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় লেনদেনকৃত অর্থ ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংকিং সিস্টেমে যুক্ত হয়, যা ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট দূর করে।৩. বাজার ইতিবাচক ধারায় ফেরায় প্রায় ১৮৮০-রও বেশি আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী পাকিস্তানের বাজারে প্রবেশ করে, যার সরাসরি সুফল হিসেবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পায়।  ​দেশে বিপুল অর্থ, কিন্তু সঠিক কৌশলের অভাব​বাংলাদেশের বাজারেও সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে যে মূলধনের অভাব নেই, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ 'টেকনো ড্রাগস' আইপিও। মাত্র ৭৩ কোটি টাকার আইপিও আবেদনের বিপরীতে বিনিয়োগকারীরা আবেদন করেছিলেন প্রায় ২৩০০ কোটি টাকা।  ​অর্থনীতিবিদদের মতে, আমাদের দেশে ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারকে পরস্পর পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করার কোনো দূরদর্শী উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। শেয়ারবাজারকে গতিশীল না করে উচ্চ সুদে বন্ড বা সরকারি ঋণের দিকে বেশি নজর দেওয়া হচ্ছে, যা বাজারে তারল্য বাড়ানোর বদলে ঘুরিয়ে মূল্যস্ফীতিকেই ত্বরান্বিত করছে।  ​বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিধি বড় হলেও পুঁজিবাজারের দুর্বলতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে। বাজারকে গতিশীল করতে হলে:  ​অহেতুক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা: সূচক বাড়া বা কমাকে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক নিয়মে চলতে দেওয়া এবং অতিরিক্ত নজরদারির নামে বিনিয়োগকারীদের ভয় ছড়ানো বন্ধ করা।  ​সহায়ক নীতি গ্রহণ: ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট কাটাতে শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করার কৌশল গ্রহণ করা।  ​বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি: বিশ্বমানের পুঁজিবাজার গঠনে আধুনিক ও দূরদর্শী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।  ​শেয়ারবাজারকে ভয় না পেয়ে সাহসের সাথে সঠিক নীতি প্রণয়ন করলেই কেবল দেশের অর্থসংস্থান ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রূপ নিতে পারে।

পুঁজিবাজারের গতি ও নীতিগত সংস্কার: পাকিস্তান মডেলের শিক্ষা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream