শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩
Bangla FM

মতামত

টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি গ্রামীণ অর্থনীতি

টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি গ্রামীণ অর্থনীতি

​বাংলাদেশের উন্নয়ন নীতি বেশ কিছু দিন ধরেই মেগাসিটি ঢাকা-কেন্দ্রিক। ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে বা হাল আমলের পাতাল রেল—অর্থনীতির বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বড় অংশই জমা হচ্ছে রাজধানীতে। কিন্তু রাজধানীমুখী এই প্রবৃদ্ধির বিপরীতে বারবার প্রশ্ন উঠছে: দেশের লাখ লাখ শিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেকার তরুণের কর্মসংস্থান কোথায়?​চীন আজ বিশ্বে উৎপাদনে শীর্ষস্থানে পৌঁছেছে মূলত তাদের বিকেন্দ্রীকরণ ও ‘ভিলেজ এন্টারপ্রাইজ’ (Township and Village Enterprises) মডেলের কারণে। চীনারা প্রতিটি গ্রাম ও মফস্বলে ছোট-বড় কারখানা ছড়িয়ে দিয়ে প্রতিটি ঘরকে একেকটি উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তর করেছে। ফলে চীনের সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক অস্থিরতা ফেলে কাজে ব্যস্ত থেকেছে, যা তাদের মাথাপিছু আয় ও জাতীয় অর্থনীতিকে পৌঁছে দিয়েছে নতুন উচ্চতায়।​ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়নের ঝুঁকিগ্রাম ও ছোট শহরগুলোতে আধুনিক জীবনযাত্রার সুবিধা, মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা এবং কাজের সুযোগ না থাকায় কোটি মানুষ বাধ্য হয়ে ঢাকার দিকে ছুটছে। ফলে ঢাকা আজ বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, যানজটে তো বটেই, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে স্থবির। এই অবস্থায় মেগা প্রজেক্ট বা পাতাল রেল বানিয়ে ঢাকার ওপর সাময়িক প্রলেপ দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান এতে হয় না।​তরুণদের কর্মসংস্থান ও মেগা মানবসম্পদএকটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার যুবসমাজ। প্রতি বছর শিক্ষা শেষ করে হাজার হাজার তরুণ কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশায় ভুগছে। কাজ না থাকায় এই বিপুল তরুণ শক্তি রাজপথে নানা সহিংসতা বা রাজনৈতিক অস্থিরতায় জড়িয়ে পড়ছে।​মেগা অবকাঠামোর চেয়ে 'মেগা মানবসম্পদ': শত কোটি ডলার খরচে একটি অবকাঠামো তৈরির চেয়ে জরুরি লক্ষ লক্ষ যুবকের হাতে কাজ তুলে দেওয়া।​বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় শিল্পায়ন: চীনের মতো আমাদের গ্রামে গ্রামে কৃষি-ভিত্তিক শিল্প, টেক্সটাইল বা ক্ষুদ্র প্রস্তুতকারী কারখানা গড়ে তুলতে পারলে গ্রামের মানুষ গ্রামেই উপার্জন করতে পারবে।​সামাজিক স্থায়িত্ব: একজন মানুষ যখন কাজ পাবে এবং উপার্জনের পথ দেখতে পাবে, তখন সে নিজের জীবন গঠনে ব্যস্ত থাকবে; রাজপথে অহেতুক বিশৃঙ্খলা বা হরতাল-মারামারির সুযোগ থাকবে না।​ভবিষ্যতের পথরেখাশুধু ঢাকাভিত্তিক উন্নয়নে বিলিয়ন ডলার ঢাললে ভবিষ্যতে সেই বিনিয়োগ বিফলে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। সরকারের উচিত অবিলম্বে অবকাঠামোগত উন্নয়নের নজর রাজধানীর বাইর ফিরিয়ে আনা। ছোট ছোট শহর ও গ্রামগুলোতে বিদ্যুৎ, গ্যাস, ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কারখানা করার সুযোগ দিলে বাংলাদেশ সত্যিকারের সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হতে পারবে।​মেগা প্রজেক্টের ভিড়ে মানুষকে যেন আমরা ভুলে না যাই—কারণ মানুষের হাতে কাজ দেওয়াই হলো একটি দেশের সবচেয়ে বড় ও টেকসই উন্নয়ন।

ব্যাংকে 'বেনামী' আধিপত্য ও অনিয়ম রোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়া নির্দেশ

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, স্বার্থের দ্বন্দ্ব রোধ এবং বেনামী মালিকানার মাধ্যমে পর্ষদ দখলের অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে কোনো কোম্পানি তার নিজস্ব নিট সম্পদের (Net Worth) চেয়ে বেশি মূল্যের শেয়ার ব্যাংকে ধারণ করতে পারবে না। একইসাথে, ব্যাংক-কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে "প্রতিনিধি পরিচালক" (Nominee Director) হতে হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজ নামে নির্দিষ্ট পরিমাণ শেয়ার থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।​গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (BRPD) থেকে এ সংক্রান্ত 'বিআরপিডি সার্কুলার নং-০৬' জারি করা হয়েছে। দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।​বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় যা রয়েছে:​১. নিট সম্পদের সীমা: কোনো কোম্পানি তার নিজস্ব নিট সম্পদের চেয়ে বেশি মূল্যের ব্যাংকের শেয়ার ধারণ করতে পারবে না। যাদের বর্তমানে এ সীমার বেশি শেয়ার রয়েছে, সার্কুলার জারির তারিখ হতে আগামী ৬ (ছয়) মাসের মধ্যে তা বাধ্যতামূলকভাবে সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে।​২. স্বার্থের দ্বন্দ্ব নিরসন: কোনো শেয়ারধারক কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD) বা পরিচালক, ওই কোম্পানির পক্ষে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে বসতে পারবেন না।​৩. ব্যক্তিগত শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা: প্রতিনিধি পরিচালক হওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজ নামে তালিকাভুক্ত পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২% এবং অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২০% দায়মুক্ত শেয়ারের মালিকানা থাকতে হবে।​৪. অনুমোদনে কঠোরতা: ব্যাংকের পর্ষদে প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগ বা পরিবর্তনের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদনপত্রের সাথে মালিকানার যাবতীয় দালিলিক প্রমাণ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।​পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং খাতের ওপর এর প্রভাব বিশ্লেষণ​বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন সিদ্ধান্তকে অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত যুগান্তকারী ও সময়োপযোগী হিসেবে দেখছেন।​দীর্ঘমেয়াদে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব (দীর্ঘমেয়াদী লাভ):​সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: নামসর্বস্ব বা কাগুজে কোম্পানি তৈরি করে ব্যাংক দখল এবং পরবর্তীতে নিজ কোম্পানিতে কাড়ি কাড়ি টাকা ঋণ হিসেবে বের করে নিয়ে যাওয়ার যে সুযোগ ছিল, তা পুরোপুরি বন্ধ হবে।​আমানতকারী ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা: পর্ষদে প্রভাবশালী কিন্তু যোগ্যতা বা আসল মালিকানাহীন পরিচালকদের আধিপত্য কমায় ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি কমবে। ব্যাংকগুলোর মৌলিক ভিত্তি (Fundamental Base) শক্তিশালী হলে পুঁজিবাজারে ব্যাংক খাতের শেয়ারের ওপর বিনোয়োগকারীদের আস্থা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে।​শেয়ারধারকদের প্রকৃত অংশগ্রহণ: পর্ষদে প্রতিনিধিত্ব করতে হলে পরিচালকের নিজের পকেটের অর্থ বা মালিকানা থাকা আবশ্যক হওয়ায় তারা ব্যাংকের ভালো-মন্দের বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন।​স্বল্পমেয়াদী প্রভাব ও বাজার প্রতিক্রিয়া:​বিক্রির চাপ (Selling Pressure): যেসকল প্রাতিষ্ঠানিক বা শেয়ারধারক কোম্পানি তাদের নিট সম্পদের তুলনায় অতিরিক্ত শেয়ার ব্যাংকে ধরে রেখেছে, আগামী ৬ মাসের মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে তাদের অতিরিক্ত শেয়ার বাজারে বিক্রি বা সমন্বয় করতে হবে। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকের শেয়ারে সাময়িক বিক্রির চাপ তৈরি হতে পারে।​পুনর্গঠনজনিত সাময়িক অস্থিরতা: ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক রিশাফলিং বা পরিবর্তনের কারণে কিছু ব্যাংকে সাময়িক প্রশাসনিক স্থবিরতা দেখা দিতে পারে।​উপসংহার:স্বল্পমেয়াদে পুঁজিবাজারে নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারে কিছুটা বিক্রির চাপ দেখা গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজার এবং দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের সুস্থতার জন্য এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও আস্থার সংকট দূর হবে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংকে 'বেনামী' আধিপত্য ও অনিয়ম রোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়া নির্দেশ

শেয়ারবাজার ধ্বসে অপব্যবহার ও অদক্ষতা: আইসিবির ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

​বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল রাখতে এবং মন্দাবস্থায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পাশে দাঁড়াতে গঠিত হয়েছিল ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। সরকারি তহবিল ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্যই ছিল বাজার যখন খারাপের দিকে যাবে, তখন সাপোর্ট দিয়ে বাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। অর্থাৎ, কম দামে শেয়ার কিনে বাজারকে ঠেকিয়ে রাখা এবং বাজার চাঙ্গা হলে তা থেকে ভারসাম্য বজায় রাখা।​তবে বাস্তবচিত্র একেবারেই ভিন্ন। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি অর্থের সঠিক ও কৌশলগত ব্যবহারের মাধ্যমে বাজার ঘুরে দাঁড় করানোর যে লক্ষ্য আইসিবির ছিল, তা বাস্তবায়নে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো সরকারি বরাদ্দের বিশাল অংকের অর্থ ভুল সিদ্ধান্ত ও অনিয়মের কারণে শেষ হয়ে গেছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা না করে উচ্চ মূল্যে শেয়ার ক্রয় এবং অনুপযুক্ত সময়ে লেনদেনের কারণে প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজারকে স্থিতিশীল করতে কোন কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারেনি।​পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মতে, আইসিবি যদি তাদের মূল লক্ষ্য অনুসারেই পরিচালিত হতো, তবে এটি আজকে দেশের একটি বিশাল ও শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারতো। কিন্তু সঠিক সময়ে সাপোর্ট না দিয়ে এবং বাজারে প্রয়োজনীয় ভূমিকা না রাখার ফলে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন বহু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী।​অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্বে থাকা অদক্ষ ব্যক্তিদের সিদ্ধান্তহীনতা এবং অভ্যন্তরীণ অনিয়মের কারণেই আজকের এই চরম হতাশা। বাজারে এই মন্দাভাব বজায় থাকার পেছনে আইসিবির এই ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ ভূমিকা একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।​দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অব্যবস্থাপনা ও অর্থ অপচয়ের নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবি তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। কাদের মাধ্যমে উচ্চ মূল্যে অনুপযোগী শেয়ার কেনা হয়েছে এবং সরকারি ফান্ডের টাকা কিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে—তা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।

শেয়ারবাজার ধ্বসে অপব্যবহার ও অদক্ষতা: আইসিবির ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

সেকেন্ডারি বাজারে মূলধনী মুনাফাই মূল আকর্ষণ: অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ কমানোর দাবি বিনিয়োগকারীদের

দেশের পুঁজিবাজারে টানা দরপতন এবং নীতিনির্ধারণী সংস্থাগুলোর একের পর এক নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তাদের মতে, বাজারে কোন শেয়ারের দর বৃদ্ধিকে সবসময় 'কারসাজি' হিসেবে দেখার প্রবণতা এবং অপ্রয়োজনীয় তদন্ত বাজারের স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করছে।​বাজারে চলমান বিভিন্ন সংকট ও সমাধান নিয়ে সম্প্রতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তাদের মূল দাবি ও বক্তব্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:​বাজারের স্বাভাবিক গতিতে বাধার সৃষ্টি: দর বাড়লেই কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদান কিংবা হঠাৎ তদন্ত শুরু করায় ক্রেতারা আতঙ্কিত হন। চাহিদা ও জোগানের স্বাভাবিক নিয়মে দর বাড়লে তাকে সরাসরি কারসাজি না ভেবে বাজারের নিজস্ব নিয়মে চলতে দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।​সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া তদন্ত নয়: বিনিয়োগকারীদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট শেয়ার কিনে কেউ প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে লিখিত অভিযোগ না করা পর্যন্ত তদন্তের নামে অতিরিক্ত তদারকি করার প্রয়োজন নেই। এতে ভালো শেয়ারের লেনদেনও থমকে দাঁড়ায়।​পতনের পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার দাবি: সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে দরপতন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও মূল সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না। কম দামে শেয়ার বিক্রি করে যারা বাজারে কৃত্রিম পতন তরান্বিত করছে, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানান তারা।​লেনদেনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ: কে কত দামে শেয়ার কিনবে বা বিক্রি করবে, তা সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। প্রতিটি দর বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত কঠোরতা প্রদর্শন করলে বাজার তার প্রাণচঞ্চলতা হারায়।​ক্যাপিটাল গেইনের গুরুত্ব: সেকেন্ডারি মার্কেটের প্রধান আকর্ষণ হলো মূলধনী মুনাফা বা 'ক্যাপিটাল গেইন'। ভালো কোম্পানি, বন্ড মার্কেট কিংবা সুকুক আনার মতো দীর্ঘমেয়াদি নানা তত্ত্ব দেওয়া হলেও বাস্তবে ক্যাপিটাল গেইনের সুযোগ না থাকলে কোনো বিনিয়োগকারীই উচ্চ ঝুঁকি নিয়ে বাজারে দীর্ঘমেয়াদে থাকবে না। শুধু বাৎসরিক সামান্য লভ্যাংশের (ডিভিডেন্ড) ওপর ভর করে কোটি কোটি টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।​বাজার বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি মজবুত করার পাশাপাশি সেকেন্ডারি বাজারকে মুক্তভাবে কাজ করতে দেওয়াই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। নীতিনির্ধারণী সংস্থার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই পারে পুঁজিবাজারে আবার আস্থা ফিরিয়ে আনতে।

সেকেন্ডারি বাজারে মূলধনী মুনাফাই মূল আকর্ষণ: অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ কমানোর দাবি বিনিয়োগকারীদের

শেয়ারবাজারে টানা রক্তক্ষরণ: নীতি-নির্ধারকদের প্রতিশ্রুতি বনাম প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডের বাস্তবতা

সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া ও অর্থমন্ত্রী দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজার পুনর্গঠন নিয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট কাটানো এবং ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন।​তবে বাজারে রাষ্ট্রীয় বা সরকারি বার্তাগুলোর তাত্ক্ষণিক প্রভাব কিছুটা ধীরগতির। বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ আশা করেন সরকারের সরাসরি বড় কোনো ফান্ড সাপোর্ট বা তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ আসবে। ফলে ঘোষণা ও প্রত্যাশার মধ্যে সমন্বয় না ঘটলে বাজারে অস্থিরতা সাময়িকভাবে থেকেই যায়।  ​আইসিবি (ICB) এবং সরকারি ভূমিকাইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) মূলত পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে মার্কেট মেকারের কাজ করার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিনের পোর্টফোলিও চাপ ও তারল্য সংকটের কারণে আইসিবি বাজারে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সাপোর্ট দিতে পারছে না। শুধু তদন্ত কমিটি বা রেগুলেটরি নির্দেশ দিয়ে তাৎক্ষণিক সূচক বাড়ানো সম্ভব নয়; বাজারে সাপোর্ট দিতে প্রয়োজন বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বাই-প্রেসার।  ​বাজারের বর্তমান অবস্থা ও পর্যবেক্ষণ  ​তদন্ত বনাম আসল সাপোর্ট: শুধু অনিয়ম তদন্ত বা মিটিং করে বাজারের রক্তক্ষরণ থামানো কঠিন। বাজারে স্থায়ী আস্থা ফেরাতে ক্যাপিটাল ইনফিউশন (ফান্ড সরবরাহ) এবং প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।  ​আতঙ্কে প্যানিক সেল এড়ানো: টানা দরপতনের শেষ ধাপে অনেক ভালো শেয়ার একদম বটম প্রাইসে (কম RSI ও আকর্ষণীয় ভ্যালুয়েশনে) চলে আসে। ইতিহাস বলে, চরম আতঙ্কের এই দিনগুলোতেই নতুন সাইকেলের ভিত্তি তৈরি হয়।  ​কৌশলগত অবস্থান: এই মন্দা কাটাতে টেকনিক্যাল রিভার্সাল সিগন্যালের (যেমন- RSI বা Money Flow Index) জন্য অপেক্ষা করা এবং ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারগুলোতে আতঙ্কিত হয়ে বিক্রি না করে সঠিক জায়গায় ধরে রাখার কৌশলই এখন বেশি কার্যকর।

শেয়ারবাজারে টানা রক্তক্ষরণ: নীতি-নির্ধারকদের প্রতিশ্রুতি বনাম প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডের বাস্তবতা

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও নিরাশ বিনিয়োগকারীরা: পতনের চক্রে শেয়ারবাজার

সরকারের নানা সহায়তা ও নীতিগত সমর্থনের পরও অযোগ্য নেতৃত্ব ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না পুঁজিবাজার।ক্ষমতার রদবদল এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের পুঁজিবাজারে সূচকের বড় ধরনের টেকসই উত্থান দেখবন—এমনটাই প্রত্যাশা ছিল সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একাংশের। ধারণা করা হয়েছিল, নতুন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আবহে বাজারের দীর্ঘদিনের টানা মন্দাভাব কাটবে এবং বিনিয়োগকারীদের পুঁজির ক্ষতি কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার হবে। তবে বাস্তবে সে আশার গুড়ে বালি ঢেলে সূচকের ধারাবাহিক দরপতন এবং চরম তারল্যসংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে দেশের দুই প্রধান পুঁজিবাজার—ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)।  ​সম্প্রতি কয়েক সপ্তাহের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাবে বাজারে ক্রেতার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। মূল্যসূচক ক্রমাগত নিম্নমুখী হওয়ার পাশাপাশি দৈনিক লেনদেনের পরিমাণও আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে।সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ—সরকার বা রাজনৈতিক পরিক্রমায় পরিবর্তন এলেও বাজার মধ্যস্থতাকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা সামষ্টিক অর্থনীতির মূল সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান হয়নি।  পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণ বা প্রত্যাশার ওপর ভর করে কোনো দেশের শেয়ারবাজার চলতে পারে না। বর্তমান বাজার মন্দার নেপথ্যে একাধিক বড় কারণ কাজ করছে:​জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যাহত: দেশে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তালিকাভুক্ত বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে চলতি অর্থবছরে করপোরেট মুনাফা কম হওয়ার আশঙ্কায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা নতুন করে শেয়ার কেনা থেকে বিরত থাকছেন।   নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি (BSEC) ও স্টক এক্সচেঞ্জের বিভিন্ন তদন্ত এবং তদারকিমূলক পদক্ষেপ অনেক সাধারণ ও বড় বিনিয়োগকারীকে সতর্ক অবস্থানে বা 'ওয়েট অ্যান্ড সি' মোডে ঠেলে দিয়েছে।  ​উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার: ব্যাংকে আমানতের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় সাধারণ মানুষের হাতে সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ কমেছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বাজারের তারল্য প্রবাহে।  ​মৌলভিত্তির চেয়ে গুজবে নির্ভরতা: অনেক বিনিয়োগকারী রাজনৈতিক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে শেয়ারে বিনিয়োগ করেছিলেন, যা বাস্তব আর্থিক পারফরম্যান্সের সাথে না মেলায় বড় ধরনের বিক্রয়চাপ (Selling Pressure) তৈরি হয়েছে।  ​বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা, বড় কোম্পানিগুলোর আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করা পর্যন্ত শুধু রাজনৈতিক প্রত্যাশার জোরে টেকসই বুুলিশ (উর্ধ্বমুখী) ট্রেন্ড ফেরা কঠিন। দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত লোকসানে থাকা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখন বাজারের দৃশ্যমান সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের দিকেই তাকিয়ে আছেন।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও নিরাশ বিনিয়োগকারীরা: পতনের চক্রে শেয়ারবাজার

শেয়ারবাজারের টানা মন্দা ও ডে ট্রেডিং চালুর বাস্তবতা—সুযোগ না নতুন ঝুঁকি?

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার প্রতিষ্ঠার ৭২ বছর পার হতে চললেও বাজারের কাঙ্ক্ষিত গুণগত পরিবর্তন বা স্থায়ী স্থিতিশীলতা এখনও আসেনি। আমেরিকা, ভারতসহ বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত ও উদীয়মান শেয়ারবাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ লেনদেন হয় ‘ডে ট্রেডিং’ বা ইন্ট্রাডে ট্রেডিংয়ের (একই দিনে শেয়ার কেনাবেচা) মাধ্যমে। বর্তমানে দেশের বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা তারল্য সংকট ও দরপতনের প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে—আমাদের বাজারেও কি ডে ট্রেডিং পুরোদমে শুরু হওয়া উচিত?​শেয়ারবাজারের ৭২ বছরের পথচলা ও বর্তমান সংকট  ​১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর সাত দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আজও মূলত রিটেইল বা খুচরা বিনিয়োগকারী-নির্ভর। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের অপশাসন, ফ্লোর প্রাইসের মতো কৃত্রিম হস্তক্ষেপ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা এবং দুর্বল সুশাসনের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বারবার আস্থা হারিয়েছেন। ফলে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের মানসিকতা যেমন গড়ে ওঠেনি, তেমনি বাজারে প্রয়োজনীয় গতিশীলতারও অভাব রয়ে গেছে।  ​ডে ট্রেডিং চালুর ভালো ও খারাপ দিক​আমেরিকা বা ভারতের মতো দেশগুলোতে প্রতিদিনের মোট লেনদেনের একটি বড় অংশ আসে ডে ট্রেডিং থেকে। আমাদের বাজারে এই ব্যবস্থা পুরোদমে চালু হলে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরণের প্রভাবই পড়বে:  ​সুযোগ বা ভালো দিক:​তারল্য বৃদ্ধি: ডে ট্রেডারদের ঘন ঘন কেনাবেচার ফলে বাজারে প্রতিদিন ক্যাশ ফ্লো বা লেনদেনের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।​দ্রুত মুনাফার সুযোগ: সঠিক টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস (যেমন RSI, সাপোর্ট-রেজিস্ট্যান্স) ও চার্ট প্যাটার্ন অনুসরণ করে দক্ষ ট্রেডাররা খুব অল্প সময়ে মূলধন ঘুরিয়ে মুনাফা নিতে পারেন।  ​আন্তর্জাতিক মান অর্জন: বাজার অটোমেশন ও আধুনিক ডেরিভেটিভস প্রোডাক্টের দিকে এগোতে হলে ডে ট্রেডিং গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।  ​ঝুঁকি বা খারাপ দিক:​অত্যধিক অস্থিরতা: একই দিনে বিপুল শেয়ার বেচাকেনা হলে বাজারে হঠাৎ তীব্র ওঠানামা দেখা দিতে পারে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য প্যানিক বা ভীতি তৈরি করতে পারে।  ​গুজব ও মেনিপুলেশন: পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত নজরদারি ও কঠোর আইন না থাকলে জুয়াড়ি বা কারসাজিকারীরা রিউমার ছড়িয়ে কৃত্রিম প্রাইস হাইপ তৈরি করতে পারে।  ​ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসির অভাব: টেকনিক্যাল জ্ঞান ছাড়া আবেগ বা ধারণার ওপর নির্ভর করে ট্রেড করলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মূলধন দ্রুত হারানোর ঝুঁকি শতভাগ থাকে।  ​আমাদের দেশে কি এখনই ডে ট্রেডিং শুরু হওয়া উচিত?  ​আমাদের দেশের বর্তমান অবকাঠামো এবং বিনিয়োগকারীদের আচরণের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত মূল্যায়নে পৌঁছানো সম্ভব।​যাচাই ও সিদ্ধান্ত:  ​অবকাঠামোগত প্রস্তুতি: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE)-কে প্রথমে টি+০ (Same-day Settlement) এবং শক্তিশালী আইটি নেটওয়ার্ক শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে।  ​শিক্ষিত বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী: শুধুমাত্র ফান্ডামেন্টাল ও টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিসে অভিজ্ঞ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ট্রেডারদেরই এই সুযোগ সঠিকভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা রয়েছে।  ​নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়াকড়ি: ভারতে ‘SEBI’ যেভাবে অ্যালগরিদম ও ডে ট্রেডিং নিয়ন্ত্রণ করে, BSEC-কেও সেভাবে রিয়েল-টাইম সার্ভেইল্যান্স বজায় রাখতে হবে।​চূড়ান্ত মন্তব্য: ডে ট্রেডিং কোনো ম্যাজিক নয়, এটি একটি আধুনিক আর্থিক হাতিয়ার। শেয়ারবাজারের দীর্ঘদিনের মন্দা কাটাতে তারল্য ফেরা অত্যন্ত জরুরি, আর সেটির জন্য ডে ট্রেডিং শুরু হওয়া অবশ্যই সময়ের দাবি। তবে তা হতে হবে শক্ত রেগুলেশন, পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে।

শেয়ারবাজারের টানা মন্দা ও ডে ট্রেডিং চালুর বাস্তবতা—সুযোগ না নতুন ঝুঁকি?

পেট্রোল: আধুনিক সভ্যতার রানি ও উন্নত দেশের মূল দুর্বলতা

​আজকের আধুনিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণভাবে জ্বালানি তেলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পেট্রোলিয়ামকে বলা হয় "আধুনিক শিল্প সভ্যতার রক্ত।" এটি শুধু গাড়ি চালানো বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নয়; প্লাস্টিক, সার, ওষুধ, বিমান চলাচল থেকে শুরু করে উন্নত দেশের বিশাল অর্থনীতিকে সচল রাখতে এটি অপরিহার্য।​ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে বড় যুদ্ধ শুরু হলে এবং হোরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে কোনো দেশই রক্ষা পাবে না। তবে ক্ষতির ধরণ ও মাত্রা দেশভেদে ভিন্ন হবে:  ​১. উন্নত দেশগুলোর অবস্থা: কেন তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে?  ​প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা পঙ্গু হওয়া: যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর জীবনযাত্রা ১০০% বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। পেট্রোল ও গ্যাসের জোগান বন্ধ হলে বা অতিমাত্রায় দাম বাড়লে তাদের বিশাল পরিবহণ ব্যবস্থা, বিমান সংস্থা, হিটিং সিস্টেম এবং রোবোটিক শিল্প কারখানা স্তব্ধ হয়ে যাবে।  ​বিশাল অর্থনৈতিক পতন: উন্নত দেশগুলোর মূল শক্তি তাদের বিশাল শেয়ারবাজার এবং বিশ্ব বাণিজ্য। জ্বালানির ঘাটতিতে উৎপাদন বন্ধ হলে তাদের পুঁজিবাজার ধসে পড়বে, যা তাদের ব্যাংকিং খাতকে পঙ্গু করে দিতে পারে।  ​নাগরিকদের জীবনযাত্রায় মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয়: উন্নত দেশের নাগরিকরা প্রযুক্তি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সুবিধার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এই ব্যবস্থার সামান্য ব্যাঘাতও সেখানে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।  ​২. কোনো দেশ কি ভালো থাকবে?​অল্প ক্ষতিগ্রস্ত বা লাভবান দেশ: রাশিয়া, ক্যানাডা বা আফ্রিকার কিছু দেশ—যাদের নিজস্ব তেল, গ্যাস বা প্রাকৃতিক সম্পদ প্রচুর রয়েছে এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, তারা কিছুটা ভালো অবস্থানে থাকবে।​তবে এককভাবে কেউ নিরাপদ নয়: আজকের বিশ্ব "গ্লোবালাইজড" বা সার্বিকভাবে সংযুক্ত। এক অঞ্চল ধসে পড়লে বৈশ্বিক বাণিজ্য বন্ধ হয়ে সব দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই স্থবির হয়ে যাবে।  ​৩. আমাদের বাংলাদেশের অবস্থা কী হবে?বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই সংকট বেঁচে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হবে:  ​জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট: বাংলাদেশের ব্যবহৃত জ্বালানির সিংহভাগই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। হোরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের জাহাজের চলাচল বিঘ্নিত হলে বাংলাদেশে তীব্র তেল ও এলএনজি (LNG) গ্যাস সংকট তৈরি হবে, যার ফলে মারাত্মক লোডশেডিং দেখা দেবে।  ​কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: ডিজেলের দাম বাড়লে সেচ পাম্প চালানো ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি ও পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে খাদ্য উৎপাদনের খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।  ​পোশাক খাত ও বৈদেশিক মুদ্রা (রেমিট্যান্স):​মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়ালে সেখানে কর্মরত লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি সংকটে পড়বেন, যা রেমিট্যান্স আসার হার কমিয়ে দিতে পারে।  ​বিদ্যুৎ সংকট এবং বিশ্ব বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) খাতের রপ্তানি মারাত্মক ধাক্কা খাবে।​চরম মূল্যস্ফীতি: জ্বালানি ও জাহাজের ভাড়া (Freight Cost) বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে।  ​সংক্ষেপে বলতে গেলে, উন্নত দেশগুলো তাদের বিশাল অর্থনৈতিক উচ্চতা থেকে আছড়ে পড়ার কারণে মানসিক ও কাঠামোগতভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদাপূরণ এবং জীবনযাত্রার ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে।  ​

পেট্রোল: আধুনিক সভ্যতার রানি ও উন্নত দেশের মূল দুর্বলতা

ইনডেক্স ৬ হাজারের ঘরে গেলেই কেন বাড়ে বিক্রির চাপ? নেপথ্যে প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ ও তদারকির প্রশ্ন

দেশের শেয়ারবাজারে সূচক যখনই ৬,০০০ পয়েন্টের মনস্তাত্ত্বিক সীমানার কাছাকাছি পৌঁছায়, তখনই দেখা যায় বিক্রির প্রবল চাপ। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে একটি প্রশ্ন ঘনীভূত হচ্ছে—ইনডেক্স ৬ হাজার ছুঁইছুঁই হলেই কি বড় বড় ব্রোকারেজ হাউস বা প্রভাবশালী শেয়ার মালিকরা চক্রান্ত করে শেয়ার বিক্রি বাড়িয়ে দেন?​বিনিয়োগকারীদের অনেকের অভিযোগ, বাজার যখনই একটু ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেয়, ঠিক তখনই কিছু বড় হাউসের অভ্যন্তরীণ ট্রেডিং কৌশলের কারণে কৃত্রিম বিক্রির চাপ তৈরি হয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ধারণা, বাজার ভালো হতে না দেওয়ার পেছনে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে—যাতে সূচক আবার নিচে নামলে কম দামে শেয়ার হাতিয়ে নেওয়া যায়।​ইনসাইডার ও প্রোপাইটারি ট্রেডিংয়ের প্রভাব: অনেক ব্রোকারেজ হাউসের নিজস্ব ‘প্রোপাইটারি অ্যাকাউন্ট’ (Proprietary Desk) থেকে বড় অঙ্কের কেনাবেচা হয়। সূচক নির্দিষ্ট উচ্চতায় গেলে এসব অ্যাকাউন্ট থেকে একযোগে শেয়ার বিক্রি শুরু হলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস অনুযায়ী ৬,০০০ পয়েন্ট একটি শক্তিশালী রেজিস্ট্যান্স লেভেল। বড় ফান্ড ম্যানেজাররা ঝুঁকি কমাতে এই লেভেলে এসে মুনাফা তুলে নেন, যা খুচরা বিনিয়োগকারীদের প্যানিক সেলিংয়ে বাধ্য করে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা (BSEC) এবং স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে প্রতিদিনের ট্রেডিং ডাটা ও 'ক্লায়েন্ট ওয়াইজ' বিক্রির তথ্য থাকে। কিন্তু কোন হাউস থেকে নির্দিষ্ট লেভেলে অস্বাভাবিক শেয়ার সরবরাহ হচ্ছে, তা সময়মতো খতিয়ে না দেখলে কৃত্রিম বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ থেকেই যায়।​শেয়ারবাজারকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও শক্তিশালী করতে হলে কেবল সূচক টেনে তোলা নয়, বরং সূচক নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করলে যাতে ইচ্ছাকৃত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিক্রির চাপ তৈরি না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। বাজার মধ্যস্থতাকারী ও হাউস মালিকদের স্বল্পমেয়াদি সুবিধার চেয়ে সামগ্রিক পুঁজিবাজারের সুরক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা জরুরি।

ইনডেক্স ৬ হাজারের ঘরে গেলেই কেন বাড়ে বিক্রির চাপ? নেপথ্যে প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ ও তদারকির প্রশ্ন

পারিবারিক ঐতিহ্য বনাম রাজনৈতিক ভাষার মার্জিত রূপ: রাশেদ খানের বক্তব্যে ক্ষোভ, ক্ষমা প্রার্থনার জোর দাবি

বাংলাদেশে বিএনপির রাজনীতি সবসময়ই বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্যে সাধারণ মানুষের কাছে সমাদৃত—আর তা হলো ভাষা ও আচরণের পারিবারিক শালীনতা। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—কাউকে কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে কুৎসিত বা কটু ভাষা ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। বেগম খালেদা জিয়া প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করলেও তাঁর ভাষার ভেতরে উচ্চমানের রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও বিনয় প্রকাশ পেত। এই ঐতিহ্য ও শালীন ভাষার কারণেই সাধারণ মানুষ বিএনপিকে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর থেকে আলাদা হিসেবে সম্মান করে এসেছে।​তবে সম্প্রতি রাজনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ খান কর্তৃক জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতা নাসির উদ্দীন পাটোয়ারীকে লক্ষ্য করে চরম আপত্তিকর ও অশালীন শব্দ প্রয়োগের ঘটনায় নাগরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।রাজনীতিতে ভুল বক্তব্য বা আবেগের বশবর্তী হয়ে মন্তব্য করা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু যখন তা একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির মুখ থেকে আসে, তখন তা সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং দলের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলে দেয়। লেখক ও সচেতন সমাজের মতে, নাসির উদ্দীন পাটোয়ারীর মতো তরুণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গেমতপার্থক্য থাকলেও কোনো অবস্থাতেই অশালীন শব্দ বা গালিগালাজ সমর্থনযোগ্য নয়। এমন আচরণে প্রধানমন্ত্রীর সার্বিক ইমেজ ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়।​দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ এবং দলের দায়িত্বশীল সমর্থক মহল স্পষ্টভাবে মনে করেন, রাশেদ খানের এই মন্তব্যের জন্য তাঁর নিজের ভুল স্বীকার করে অবিলম্বে জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত। মানুষ ভুলের উর্ধ্বে নয়, কিন্তু ভুল স্বীকার করে অনুশোচনা প্রকাশ করাই হচ্ছে একজন রাজনীতিবিদের প্রকৃত শালীনতার পরিচয়।​যদি তিনি নিজ থেকে ক্ষমা না চান, তবে দেশের সচেতন জনসাধারণ ও নাগরিক সমাজ এর প্রতিবাদ জানাবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাকে পরিচ্ছন্ন রাখতে এবং জিয়া পরিবারের ঐতিহাসিক শিষ্টাচারের ঐতিহ্য রক্ষা করতে যেকোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির বক্তব্যের ক্ষেত্রে সতর্ক ও জবাবদিহিমূলক থাকা জরুরি।

পারিবারিক ঐতিহ্য বনাম রাজনৈতিক ভাষার মার্জিত রূপ: রাশেদ খানের বক্তব্যে ক্ষোভ, ক্ষমা প্রার্থনার জোর দাবি

ডিজিটাল স্লোগান বনাম বাস্তব চিত্র: কেন যুগের পর যুগ পিছিয়ে বাংলাদেশের শেয়ার বাজার?

​'স্মার্ট বাংলাদেশ' বা ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার কথা আমরা হরহামেশাই শুনি, অথচ দেশের পুঁজিবাজারে একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী পা রাখলেই টের পান বাস্তবতার কঙ্কালসার রূপ। প্রতিনিয়ত অ্যাপ হ্যাং করা বা প্রযুক্তিগত বিভ্রাট কেবল একটি সাময়িক সমস্যা নয়; এটি বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ।  ​কেন এতদিনেও ঠিক হচ্ছে না বাংলাদেশের শেয়ার বাজার? সমস্যাগুলো আসলে কোথায়?  ​দুর্বল ও জরাজীর্ণ আইটি অবকাঠামো: ডিএসই (DSE)-র সার্ভার ডাউন হওয়া বা সফটওয়্যার জটিলতা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। কোটি কোটি টাকার লেনদেন যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হয়, তার প্রযুক্তিগত মান বিশ্বমানের তো দূরের কথা, সাধারণ অ্যাপের চেয়েও ধীরগতির। অথচ বহু আগে ডিএসইর প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ ও বিদেশি কৌশলগত অংশীদারদের যুক্ত করার কথা থাকলেও বাস্তবায়ন থমকে আছে।  ​পুঁজিবাজারের প্রতি পলিসি মেকারদের অবহেলা: ব্যাংকনির্ভর ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে শিল্প খাত বা বড় বড় প্রজেক্ট কখনোই শেয়ার বাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহে উৎসাহিত হয় না। ফলে বাজারটি অর্থায়নের মূল হাতিয়ার না হয়ে স্রেফ একটি সেকেন্ডারি কেনাবেচার জায়গায় পরিণত হয়েছে।  ​ভালো কোম্পানির তীব্র অভাব (আইপিও খরা): বাজারে বছরের পর বছর ধরে ভালো ও মৌলিকভাবে শক্তিশালী (Fundamentally Strong) মাল্টিন্যাশনাল বা স্বনামধন্য দেশীয় কোম্পানির প্রাথমিক শেয়ার (IPO) আসা প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। বাজারে ভালো শেয়ারের জোগান না থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে কীভাবে?  ​কারসাজি ও প্রশাসনিক দুর্বলতা: শেয়ারের দর কৃত্রিমভাবে ওঠানামা করানো এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে ঠেকিয়েছে।​ব্রোকারেজ হাউসগুলোর উদাসীনতা: অনেক ব্রোকারেজ হাউস বিনিয়োগকারীদের আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য ইউজার-ফ্রেন্ডলি অ্যাপ বা দ্রুতগতির এপিআই (API) সুবিধা দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ।কারিগরি সমস্যা হলে সময়মতো সাপোর্ট দেওয়ার মতো দক্ষ জনবলও তাদের নেই।  ​শেয়ার বাজার কেবল কয়েকজন ট্রেডারের জুয়া খেলার জায়গা নয়; এটি যেকোনো দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। খালি মুখে 'স্মার্ট' না বলে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা (BSEC) ও এক্সচেঞ্জগুলোর উচিত অবিলম্বে আধুনিক ও শক্তিশালী আইটি অবকাঠামো নিশ্চিত করা, ভালো কোম্পানি বাজারে আনা এবং বাজারের সুশাসন নিশ্চিত করা। সাধারণ বিনিয়োগকারীর ঘাম ঝরানো টাকা আর প্রযুক্তির বলি  না হন!

ডিজিটাল স্লোগান বনাম বাস্তব চিত্র: কেন যুগের পর যুগ পিছিয়ে বাংলাদেশের শেয়ার বাজার?

সুশাসনের অভাব, কারসাজি ও নীতিগত অস্থিরতায় মুখথুবড়ে পড়া বাংলাদেশের পুঁজিবাজার

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সূচক সাময়িক বৃদ্ধি পেলেও স্থায়ী ও টেকসই মন্দাভাব বা দীর্ঘমেয়াদী দরপতন এখানে সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রতিনিয়ত ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে—কেন অন্যান্য দেশের অর্থনীতি বৃদ্ধির সঙ্গে বাজার এগোলেও বাংলাদেশের বাজারে উত্থান স্থায়ী হয় না?​১. ভালো ও মৌলিক শেয়ারের তীব্র অভাব (Low Quality IPOs)বাজারে মানসম্মত কোম্পানির শেয়ারের সংখ্যা অত্যন্ত কম। বহুজাতিক ও শক্ত ভিতের দেশীয় বড় কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসতে চায় না। বহু দুর্বল ও নামসর্বস্ব কোম্পানি ভুল এবং অতিরঞ্জিত আর্থিক বিবরণী জমা দিয়ে বাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে, যা পরবর্তীতে বিনিয়োগকারীদের চরম ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।​২. কারসাজি ও সিন্ডিকেট (Market Manipulation)বাজারে স্বাভাবিক লেনদেনের চেয়ে গুজোব ও সিন্ডিকেটকেন্দ্রিক লেনদেন বেশি দেখা যায়। নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি বা চক্র দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করে। পরবর্তীতে তারা লাভ তুলে নিয়ে কেটে পড়লে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হন।​৩. নিয়ন্ত্রক সংস্থার (BSEC) নীতিগত অস্থিতিশীলতাবাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (BSEC) নীতিমালায় ঘন ঘন পরিবর্তন বাজারের গতিশীলতা নষ্ট করে। যেমন: দীর্ঘ সময় ধরে 'ফ্লোর প্রাইস' (Floor Price) কার্যকর রাখার ফলে বাজারে স্বাভাবিক লেনদেন সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছিল। এ ধরনের হস্তক্ষেপ প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করেছে।​৪. প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দুর্বল ভূমিকাএকটি পরিপক্ক শেয়ারবাজারে ব্যাংক, মার্চেন্ট ব্যাংক, মিউচুয়াল ফান্ড ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো মূল ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার বদলে নিজেরাও অনেক সময় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মতো জল্পনা-কল্পনানির্ভর (speculative) ট্রেডিংয়ে জড়িয়ে পড়ে।​৫. সুশাসনের অভাব ও দুর্বল তদারকি (Lack of Corporate Governance)অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করে না। অনিয়মিত লভ্যাংশ ঘোষণা, ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন এবং অর্জিত মুনাফা সঠিকভাবে বণ্টন না করার কারণে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। একইসাথে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব রয়েছে।​৬. ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতাবাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সাথে দেশের ব্যাংকিং খাত গভীরভাবে যুক্ত। ব্যাংকিং খাতের উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং তারল্য সংকট সরাসরি পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলে।​কারও একক দোষ দিয়ে এই জটিল পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। DSE/CSE-র দুর্বল তদারকি, BSEC-র নীতিগত ভুল ও প্রয়োগের দুর্বলতা, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সুশাসনের অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দায়িত্বহীনতা—সব মিলিয়েই আজকের এই অবস্থা।​পুঁজিবাজারকে ঘুরে দাঁড় করাতে হলে দুর্বল কোম্পানির তালিকাভুক্তি বন্ধ করা, অনিয়মকারীদের কঠোর শাস্তি প্রদান এবং নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।

সুশাসনের অভাব, কারসাজি ও নীতিগত অস্থিরতায় মুখথুবড়ে পড়া বাংলাদেশের পুঁজিবাজার

এক দুর্ম্মদ প্রেম

বলেছো, বিশেষ কিছু বলবার মতো সময় নাকি পেরিয়ে গেছে—আমি বলি, সময়ের শেষ স্টেশনেও তোমার জন্য আমার ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে।শেষ বাঁশি বেজে গেলে পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেমে যাবে,তবু তোমার নামটি আমার বুকের ভেতর নিঃশব্দে বাজতেই থাকবে।বৃষ্টি-শূন্য মেঘে যদি আকাশ ভেসে যায়, আমি দু’হাত বাড়িয়ে রাখব,তোমার চোখের কাজল থেকে ধার নেব এক ফোঁটা শান্ত সমুদ্র।উইন্ডস্ক্রিন ঝাপসা হলে পথ চিনব না—তোমার মুখ চিনব,দর্শকশূন্য আসনগুলোতে বসে একাই তোমার জন্য হাততালি দেব।মেয়াদোত্তীর্ণ প্রেমের কবিতাগুলো ফেলে দিও না—আমি তাদের প্রতিটি পুরোনো অক্ষরে নতুন করে তোমাকে ভালোবাসব।যে নাবিক বেঁচে গেছি বলে প্রাণ খুলে গান গাইত, সে যদি মৃতও হয়,তার অসমাপ্ত গান আমি তুলে নেব আমার রক্তের ভেতর থেকে।তোমার প্রেমের বারো হাতের বুনন খুলে গেলে ভয় পেয়ো না,আমি অর্বাচীনের মতো নয়—উন্মাদের মতো তোমার ছেঁড়া সুতোয় নিজেকে বুনব।আর তুমি যদি স্বপ্ন দেখতে গিয়ে রাতের ভেতর কেঁদে ওঠো,জেনে রেখো, অন্য কোনো ঘুমে আমি তোমার কান্নার পাশে জেগে আছি।বলেছো তো, স্মৃতিচারণে বিশেষ কিছু বলবার নেই—তাহলে এসো, স্মৃতি নয়, আমরা দু’জন মিলে ভবিষ্যৎ লিখে ফেলি।জন্মের পর থেকেই যদি নিজেকে সত্তর বছরের বৃদ্ধ বলে মনে হয়ে থাকে,আমার কাছে এসো—আমি তোমার কপালে একটি নতুন শৈশব এঁকে দেব।শৈশব, কৈশোর, যৌবন—এসব বায়বীয় শব্দ না হয় থাকলই,তোমার হাতের উষ্ণতাই হোক আমার কাছে বয়সের একমাত্র সংজ্ঞা।ভাগাভাগি করে যদি বেঁচে থাকো, এবার তোমার অর্ধেক জীবন আমাকে দাও,আমি আমার জীবনটারে তোমার কাছে রেখে দেব।নামবার মতো সুলভ কোনো স্টেশন না পেয়ে এতদিন নামোনি—আমি তোমার জন্য নির্জন এক প্ল্যাটফর্ম হবো, যেখানে কোনো শেষ ট্রেন নেই।যদি মনে হয় এখনও কিছু বদলে দেওয়া সম্ভব,তবে আমার হাত ধরো—আমরা দু’জনে মিলে সময়ের বুক উল্টে দেব।দুর্লভ জীবন-নদী যদি তোমাকে ডুবিয়ে দিতে চায়,আমি সাঁতার জানি না তবু তোমার সঙ্গে ডুবতে রাজি আছি।হে অপরিচিত, ক্ষমা চেও না—তোমার অপরাধ যদি ভালোবাসা হয়, তবে সেই অপরাধের একমাত্র সাক্ষী আমি।করুণা করার আগে আমাকে ভালোবেসো,আর ভালোবাসার পর ক্ষমা কোরো না—কারণ তোমাকে একবার ভালোবেসে ফেললেতোমার মৃত্যুর জবানবন্দীতেও আমিআমার জীবনের স্বাক্ষর রেখে যাব।

এক দুর্ম্মদ প্রেম

মেগা প্রজেক্ট থেকে ক্ষমতা বদল: আওয়ামী লীগ আমলের হিসাব-নিকাশ ও বিএনপির সামনে কঠিন পরীক্ষা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত দেড় দশকের ইতিহাস এক জটিল ও বহুমুখী পরিক্রমা। একদফা গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশের অন্যতম প্রাচীন ও শক্তিশালী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতি বাংলাদেশকে এক নতুন মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। তাদের প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকাল পর্যালোচনা করলে উন্নয়ন ও অনিয়মের এক বৈপরিত্যপূর্ণ চিত্র ফুটে ওঠে, যা দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর গভীর দাগ রেখে গেছে।​অবকাঠামোগত মাইলফলক: আওয়ামী লীগ আমলের ইতিবাচক দিক​ক্ষমতায় থাকাকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দেশের দৃশ্যমান যোগাযোগ ও ভৌত অবকাঠামোয় অভাবনীয় পরিবর্তন এনেছে।  ​ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৩য় টার্মিনাল: প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা (২১০-২২০ বিলিয়ন টাকা) ব্যয়ে নির্মিত আন্তর্জাতিক মানের ৩য় টার্মিনাল প্রকল্প। এই আধুনিক টার্মিনালটি দেশের বিমান যোগাযোগ খাতকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।  ​স্বপ্নের মেগা প্রজেক্টসমূহ: নিজেদের অর্থায়নে তৈরি 'পদ্মা বহুমুখী সেতু', ঢাকার যানজট নিরসনে 'মেট্রোরেল' ও 'এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে', চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম 'বঙ্গবন্ধু টানেল' এবং দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বহুলাংশে প্রসারিত করেছে।​প্রযুক্তিগত ও বিদ্যুৎ খাতের বিপ্লব: 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' ধারণার বাস্তবায়ন, সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ বৃদ্ধি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার মতো প্রাথমিক সাফল্যগুলো দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি এনেছিল।  ​অপরিকল্পিত ব্যবস্থা ও দুর্নীতি: ক্ষয়ক্ষতির খেসারত​তবে বড় বড় অবকাঠামোগত অর্জনের আড়ালে নীতি ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া দুর্বলতাগুলো দেশের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল:  ​মেগা প্রকল্পে বিপুল দুর্নীতি ও ব্যয় বৃদ্ধি: বিমানবন্দর টার্মিনাল, পাওয়ার প্ল্যান্টসহ প্রায় প্রতিটি বড় প্রকল্পের বাজেট বারবার বাড়ানো, অনুমোদনহীন ব্যয় এবং কেনাকাটায় অনিয়মের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।  ​বিদ্যুৎ খাত ও একপাক্ষিক চুক্তি: ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার অপচয় এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে একপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির কারণে জাতীয় অর্থনীতি মারাত্মক চাপে পড়ে।  ​জবাবদিহিতাহীন শাসন ব্যবস্থা: সর্বগ্রাসী দুর্নীতি, ব্যাংক খাতের লুটপাট এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর চরম দলীয়করণের ফলে জনরোষ চরম আকার ধারণ করে, যা শেষ পর্যন্ত একটি বড় সংগঠনকে অমার্জনীয়ভাবে বিদায় নিতে বাধ্য করে।  ​১৮ মাসের ক্রান্তিকাল ও ক্ষমতা পরিবর্তন​আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর দেশে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দীর্ঘ ১৮ মাস দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকে। ক্রান্তিকালীন সময় হওয়ায় এই ১৮ মাসে নিত্যপণ্যের উর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সংকট এবং অর্থনৈতিক মন্দা সামাল দিতে সাধারণ মানুষকে তীব্র ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে পরিস্থিতির পূর্ণ স্বাভাবিকতা না আসায় জনমনে প্রশ্ন ও ক্ষোভ ঘনীভূত হতে থাকে।  ​এরপর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জনরায় পেয়ে ২১২টি আসন নিয়ে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই নতুন সরকারের ওপর এখন দেশ পুনর্গঠনের বিশাল দায়িত্ব।​নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ ও জনভাবনা​সরকার পরিবর্তন হলেও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এখন অনেক বেশি বাস্তবমুখী ও কঠোর:​১. সুশাসন প্রতিষ্ঠার পরীক্ষা: বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাদের প্রথম দায়িত্ব দুর্নীতি, সুবিধাভোগী, দখলদার ও চাঁদাবাজদের শক্ত হাতে দমন করা। যদি বিএনপির ভেতরে এসব অরাজকতা প্রশ্রয় পায়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত হ্রাস পাবে।২. অতীতের ইতিহাস থেকে শিক্ষা: দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে এত শক্ত রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও জনরোষের মুখে আওয়ামী লীগ যেভাবে টিকে থাকতে পারল না—তা থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপির জন্য অনেক বড় রাজনৈতিক শিক্ষা রয়েছে। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, সুশাসন ও জনগণের ট্রাস্টই টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি।৩. ‘আগের দিনই ভালো ছিল’ মানসিকতার ঝুঁকি: বর্তমান অরাজকতা ও অর্থনৈতিক সংকট যদি বিএনপি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে, তবে ক্ষুব্ধ জনগণ পূর্বের আমলের প্রতি ভুল সহানুভূতি দেখাতে পারে। মানুষ কোনো রূপকথার পরিবর্তন চায় না—তারা দেখতে চায় দ্রুত বাজারে স্বস্তি, নিরাপদ সড়ক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা।  ​উপসংহার​রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাজনৈতিক শক্তিকে রাতারাতি পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না। কিন্তু তারা জনগণের কাছে ফিরে আসতে পারবে কি না, তা নির্ভর করে ক্ষমতাসীন সরকারের চালচলন ও কার্যকারিতার ওপর। অতীতকে কেবল দোষ না দিয়ে নতুন ক্ষমতাসীন বিএনপি যদি স্বচ্ছতা ও সঠিক নীতি নিয়ে এগিয়ে যায়, তবেই দেশ দীর্ঘদিনের সংকট থেকে স্থায়ী মুক্তি পেতে পারে।

মেগা প্রজেক্ট থেকে ক্ষমতা বদল: আওয়ামী লীগ আমলের হিসাব-নিকাশ ও বিএনপির সামনে কঠিন পরীক্ষা

নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভুল নীতি ও আস্থার সংকটে পঙ্গু ডিএসই: ৭ দশক পেরিয়েও পুঁজিবাজারের ব্যর্থতায় ক্ষোভ

পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার মতো চরম সংকটাপন্ন দেশগুলোর বাজার রেকর্ড গড়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, সেখানে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র বাংলাদেশে। ৩৫১টিরও বেশি তালিকাভুক্ত কোম্পানি নিয়ে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) আটকে আছে মাত্র ৬ হাজার পয়েন্টের ঘরে।​ আমাদের বাজার ৭২ বছর আগে যাত্রা শুরু করা একটি শেয়ারবাজার যেখানে পূর্ণাঙ্গ সাবালক হয়ে ওঠার কথা, সেখানে এখনো এটি চরম স্থবিরতায় হামাগুড়ি দিচ্ছে। সাধারণ বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারের এই ব্যর্থতা ও দৈন্যদশার মূল কারণ হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার অদক্ষতা, ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন এবং বাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করে ‘কঠোর নিয়ন্ত্রণের’ নামে দীর্ঘদিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা।আঞ্চলিক বাজারের তুলনামূলক চিত্র​সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে বিনিয়োগকারীদের আড্ডায় এখন আঞ্চলিক সূচকের এই চরম বৈষম্যের বিষয়টি জোরালোভাবে উঠে আসছে:​ভারত: বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (BSE) ও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে (NSE) ৫,০০০-এর বেশি কোম্পানি তালিকাভুক্ত। বর্তমানে নিফটি ৫০ সূচক ২৪,০০০–২৫,০০০ পয়েন্টের ঘরে এবং সেনসেক্স ৮০,০০০ পয়েন্টের ওপরে অবস্থান করছে।​পাকিস্তান: চরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট পার করার পরও পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জের (PSX) কেএসই-১০০ (KSE-100) সূচকটি সম্প্রতি ৮০,০০০ থেকে ৮৫,০০০ পয়েন্টের ওপরে উঠে নতুন ইতিহাস গড়েছে।​শ্রীলঙ্কা: কলম্বো স্টক এক্সচেঞ্জে (CSE) তালিকাভুক্ত কোম্পানি মাত্র ২৯০টির মতো। অথচ সঠিক নীতিমালার কারণে সংকট কাটিয়ে তাদের অল শেয়ার প্রাইস ইনডেক্স (ASPI) বর্তমানে ১১,০০০ থেকে ১২,০০০ পয়েন্টের কাছাকাছি অবস্থান করছে।​বাংলাদেশ: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (DSE) মূল বাজারে ৩৫১টিরও বেশি কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও প্রধান সূচক (DSEX) দীর্ঘদিন ধরে ৫,০০০ থেকে ৬০০০ পয়েন্টের ঘরে বন্দি হয়ে রয়েছে।​আস্থার সংকট ও নিয়ন্ত্রণের নামে নীতিগত ভুল​বিনিয়োগকারীদের স্পষ্ট অভিযোগ, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নীতিনির্ধারকদের অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং ঘন ঘন সিদ্ধান্ত বদলের কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে।বাজারকে স্বাভাবিক নিয়মে ওঠানামা করতে দেওয়ার বদলে দীর্ঘ দিন কৃত্রিম 'ফ্লোর প্রাইস' দিয়ে আটকে রাখা, ভালো কোম্পানির ক্ষেত্রে অহেতুক তদন্ত কমিশন বসানো এবং স্বাধীন লেনদেনে হস্তক্ষেপের ফলে দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।বিজ্ঞ পরামর্শক নিয়োগ ও উত্তরণের দাবি​বাজার সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞদের মতে, বিএসইসি যদি ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো বাজার পরিচালনায় অভিজ্ঞ কোনো আন্তর্জাতিক মানের অর্থনীতিবিদ বা বিশেষজ্ঞকে পরামর্শক হিসেবে যুক্ত করত, তবে সঠিক কৌশল ও নীতিমালার জোরে ডিএসই সূচক খুব সহজেই ৮ থেকে ১০ হাজার পয়েন্টে উন্নীত হতে পারত।​একটি শেয়ারবাজারের প্রাণ হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ নিরপেক্ষ আম্পায়ারের ভূমিকা পালন করা, নিজে খেলোয়াড় হয়ে বাজার কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা নয়। ভুল নীতির কারণে ৭২ বছরের পুরোনো একটি বাজারকে পঙ্গু করে রাখা কেবল ক্ষুদ্রবিনিয়োগকারীদের মূলধন ধ্বংস করছে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকেও মারাত্মক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অবিলম্বে আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মাধ্যমে নীতি সংশোধন না করলে এই বাজার কখনোই স্বাবলম্বী হতে পারবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভুল নীতি ও আস্থার সংকটে পঙ্গু ডিএসই: ৭ দশক পেরিয়েও পুঁজিবাজারের ব্যর্থতায় ক্ষোভ

বিএনপির নীতি ও নীরবতা: একটি নাগরিক পর্যবেক্ষণ

​সম্প্রতি অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করছেন—আমি কেন বিএনপি সরকারের বা তাদের কার্যক্রমের ইতিবাচক দিকগুলোর কথা বলছি, কিন্তু তাদের নীতিগত জায়গাগুলো নিয়ে কোনো সমালোচনা করছি না? আজকের বাস্তবতা অনুভব করে বিএনপিকে নিয়ে দুটি কথা না লিখে পারলাম না।​ক্ষমতা বা রাজনীতিতে যেকোনো দলের সাফল্যের পাশাপাশি তাদের ব্যর্থতাগুলোও চিহ্নিত করা নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপির কিছু জায়গায় দৃশ্যমান ব্যর্থতা ফুটে উঠছে, যা জনগণের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে:​অর্থপাচার ও ব্যাংক লুটেরাদের তালিকা প্রকাশে ব্যর্থতা: বিএনপির অন্যতম প্রধান ব্যর্থতা হলো—বিগত সময়ে যারা দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে এবং ব্যাংক খাত ধ্বংস করেছে, তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভিত্তিক তালিকা তারা জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেনি। কোন ব্যাংক থেকে কত টাকা লুট হয়েছে, কার কত টাকার অবৈধ সম্পদ ছিল এবং তারা কীভাবে এই অর্থ আত্মসাৎ করেছে—এমন একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা তাদের দায়িত্ব ছিল। গত ছয় মাস ধরে তারা এই বিষয়টি নিয়ে জনসমক্ষে আসার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি।​বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে স্পষ্ট রূপরেখার অভাব: বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়ছে। এই সংকট কেন হচ্ছে, এর পেছনে মূল কারণ কী এবং কীভাবে তা সমাধান সম্ভব—তা সহজ ভাষায় জনগণকে বুঝিয়ে বলতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। কেবল সংবাদপত্র বা সংবাদের রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে না থেকে বিএনপিকে নিজেদের তথ্য ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে জনগণকে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া উচিত ছিল।​তবে এখনও সময় শেষ হয়ে যায়নি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপির একটি ভালো অবস্থান তৈরি করার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। দেশের মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে বিএনপি অবিলম্বে ৩টি বড় পদক্ষেপ নিতে পারে:​১. ১৯৭১ ও ২০২৪-এর আহত-নিহতদের সঠিক তালিকা: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কতজন শহীদ হয়েছেন, কতজন আহত হয়েছেন এবং কারা রাজাকার ছিলেন—তাদের একটি নির্ভুল তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা। পাশাপাশি, ২০২৪ সালের সাম্প্রতিক আন্দোলনে কতজন সাধারণ মানুষ শহীদ ও আহত হয়েছেন, তার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা জাতির সামনে পেশ করা।​২. প্রত্যক্ষ স্মৃতিকথা সংগ্রহ: ১৯৭১ সালের শহীদ ও আহতদের অনেক আত্মীয়-স্বজন এখনো জীবিত আছেন। তাদের কাছ থেকে সরাসরি সাক্ষ্য ও তথ্য সংগ্রহ করে সঠিক ইতিহাস নথিবদ্ধ করা এখনো সম্ভব।​৩. স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অবস্থান: কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য না দিয়ে মেধা ও তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সত্য ইতিহাস ও অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরা।​বিপুল জনগণ বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছিল। তাই জনগণের কাছে নিজেদের কার্যকারিতা ও সততা প্রমাণ করতে হলে সমালোচনা এড়িয়ে না গিয়ে, এই দায়িত্বগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তাদের বাস্তবায়ন করা উচিত।

বিএনপির নীতি ও নীরবতা: একটি নাগরিক পর্যবেক্ষণ
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream