সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM

মাগুরায় সেলুনে পাঠাগার গড়ে তাক লাগালেন নাপিত রাজু


ডেস্ক নিউজ
ডেস্ক নিউজ
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

 মাগুরায় সেলুনে পাঠাগার গড়ে তাক লাগালেন নাপিত রাজু

এক হাতে কাঁচি, অন্য হাতে বই—এভাবেই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় এসেছেন মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা রাজু আহমেদ। পেশায় তিনি একজন সেলুন ব্যবসায়ী। তবে তাঁর সেলুনে শুধু চুল-দাড়ি কাটার ব্যবস্থা নয়, রয়েছে বই পড়ার সুযোগও। একসময় অপমানের শিকার হয়ে সেই অপমানকে শক্তিতে পরিণত করে নিজের সেলুনেই গড়ে তুলেছেন ছোট্ট একটি পাঠাগার। তাঁর এই উদ্যোগে খুশি স্থানীয় বাসিন্দা ও গ্রাহকরা।

মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের শিকদারের মোড়ে অবস্থিত ‘অশিক্ষিত রাজু সেলুন জোন’। বাইরে থেকে সাধারণ সেলুন মনে হলেও ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় ভিন্ন এক পরিবেশ। দেয়ালে সাজানো রয়েছে কবিতা, গল্প ও অনুপ্রেরণামূলক বাণী। পাশাপাশি রয়েছে সারি সারি বই। চুল কাটানোর অপেক্ষায় থাকা গ্রাহকরা মোবাইল ফোনে সময় না কাটিয়ে হাতে তুলে নিচ্ছেন বই।

এই উদ্যোগের পেছনের মানুষ রাজু আহমেদ। তাঁর জীবনও নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কেটেছে। অল্প বয়সেই বাবা-মাকে হারান তিনি। আর্থিক সংকটের কারণে নবম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে মাত্র ১৭ বছর বয়সে হাতে তুলে নেন কাঁচি ও চিরুনি।

প্রথমে স্থানীয় কলমধারী বাজারে সেলুনের কাজ শেখেন। পরে ঢাকার বিভিন্ন সেলুনে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। একপর্যায়ে নিজ এলাকায় ফিরে গড়ে তোলেন নিজের সেলুন।

তবে রাজুর জীবনের একটি অপমানজনক ঘটনা তাঁর চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনে। রাজুর ভাষ্য অনুযায়ী, একদিন এক ব্যক্তি তাঁকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘তুমি নাপিত, তুমি অশিক্ষিত, তুমি আমার সঙ্গে কী কথা বলবা?’ মানুষের সামনে এমন কথা শুনে কষ্ট পান রাজু। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং সেই অপমানকে শক্তিতে পরিণত করে নিজের সেলুনের নাম রাখেন ‘অশিক্ষিত রাজু সেলুন জোন’।

তবে শুধু সেলুনের নামের মধ্যেই প্রতিবাদ সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সেলুনের এক পাশে গড়ে তোলেন একটি ছোট পাঠাগার। শুরুতে কয়েকটি বই থাকলেও গ্রাহক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে বইয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে সেখানে রয়েছে শতাধিক বই। ইসলামি বই, গল্প, কবিতা ও উপন্যাসসহ বিভিন্ন ধরনের বই রয়েছে এই পাঠাগারে।

এখন সেলুনে চুল কাটানোর অপেক্ষায় থাকা গ্রাহকরা বই পড়ে সময় কাটান। কেউ পড়েন গল্প-উপন্যাস, কেউ কবিতা, আবার কেউ ধর্মীয় বই। অনেক গ্রাহক নিজেরাও বই উপহার দিয়ে রাজুর এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করছেন।

শুধু বই পড়ার সুযোগ তৈরি নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করেন রাজু। নিজে এতিম হওয়ায় এতিম শিশুদের প্রতি তাঁর রয়েছে বিশেষ ভালোবাসা। তাই তাঁর সেলুনে এতিম শিশুদের বিনা মূল্যে চুল কাটানো হয়। মসজিদের ইমাম ও খতিবদের জন্য রয়েছে অর্ধেক মূল্যে সেবা। পাশাপাশি বয়স্ক ও অসহায় মানুষের জন্যও রয়েছে বিশেষ ছাড়।

নিজের সীমিত আয়ের মধ্যেও মানুষের জন্য এমন উদ্যোগ স্থানীয়দের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

রাজুর স্বপ্ন, একদিন তাঁর এই ছোট্ট পাঠাগারটি বড় একটি গণপাঠাগারে পরিণত হবে। সেখানে এলাকার তরুণ-যুবকসহ সব বয়সী মানুষ অবসর সময়ে বই পড়তে পারবেন। নতুন প্রজন্মকে বই পড়ায় আগ্রহী করে তোলা এবং জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রাজু পড়াশোনা বেশি দূর চালিয়ে যেতে না পারলেও নিজের উদ্যোগে অন্যদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করছেন। একটি সেলুনে এমন পাঠাগার গড়ে তোলা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

রাজু আহমেদের গল্প আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বেশি দূর করতে না পারলেও জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে হয় না। ইচ্ছাশক্তি, ভালো চিন্তা ও মানুষের জন্য কিছু করার মানসিকতা একজন মানুষকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলতে পারে।

একদিন যাঁকে ‘অশিক্ষিত’ বলে অপমান করা হয়েছিল, আজ সেই রাজুই নিজের সেলুনে শতাধিক বই সাজিয়ে অন্যদের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দিচ্ছেন। কাঁচি দিয়ে মানুষের চুল কাটার পাশাপাশি বইয়ের মাধ্যমে মানুষের মনে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬


মাগুরায় সেলুনে পাঠাগার গড়ে তাক লাগালেন নাপিত রাজু

প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

এক হাতে কাঁচি, অন্য হাতে বই—এভাবেই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে আলোচনায় এসেছেন মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা রাজু আহমেদ। পেশায় তিনি একজন সেলুন ব্যবসায়ী। তবে তাঁর সেলুনে শুধু চুল-দাড়ি কাটার ব্যবস্থা নয়, রয়েছে বই পড়ার সুযোগও। একসময় অপমানের শিকার হয়ে সেই অপমানকে শক্তিতে পরিণত করে নিজের সেলুনেই গড়ে তুলেছেন ছোট্ট একটি পাঠাগার। তাঁর এই উদ্যোগে খুশি স্থানীয় বাসিন্দা ও গ্রাহকরা।

মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের শিকদারের মোড়ে অবস্থিত ‘অশিক্ষিত রাজু সেলুন জোন’। বাইরে থেকে সাধারণ সেলুন মনে হলেও ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় ভিন্ন এক পরিবেশ। দেয়ালে সাজানো রয়েছে কবিতা, গল্প ও অনুপ্রেরণামূলক বাণী। পাশাপাশি রয়েছে সারি সারি বই। চুল কাটানোর অপেক্ষায় থাকা গ্রাহকরা মোবাইল ফোনে সময় না কাটিয়ে হাতে তুলে নিচ্ছেন বই।

এই উদ্যোগের পেছনের মানুষ রাজু আহমেদ। তাঁর জীবনও নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কেটেছে। অল্প বয়সেই বাবা-মাকে হারান তিনি। আর্থিক সংকটের কারণে নবম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে মাত্র ১৭ বছর বয়সে হাতে তুলে নেন কাঁচি ও চিরুনি।

প্রথমে স্থানীয় কলমধারী বাজারে সেলুনের কাজ শেখেন। পরে ঢাকার বিভিন্ন সেলুনে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। একপর্যায়ে নিজ এলাকায় ফিরে গড়ে তোলেন নিজের সেলুন।

তবে রাজুর জীবনের একটি অপমানজনক ঘটনা তাঁর চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনে। রাজুর ভাষ্য অনুযায়ী, একদিন এক ব্যক্তি তাঁকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘তুমি নাপিত, তুমি অশিক্ষিত, তুমি আমার সঙ্গে কী কথা বলবা?’ মানুষের সামনে এমন কথা শুনে কষ্ট পান রাজু। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং সেই অপমানকে শক্তিতে পরিণত করে নিজের সেলুনের নাম রাখেন ‘অশিক্ষিত রাজু সেলুন জোন’।

তবে শুধু সেলুনের নামের মধ্যেই প্রতিবাদ সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সেলুনের এক পাশে গড়ে তোলেন একটি ছোট পাঠাগার। শুরুতে কয়েকটি বই থাকলেও গ্রাহক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে বইয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে সেখানে রয়েছে শতাধিক বই। ইসলামি বই, গল্প, কবিতা ও উপন্যাসসহ বিভিন্ন ধরনের বই রয়েছে এই পাঠাগারে।

এখন সেলুনে চুল কাটানোর অপেক্ষায় থাকা গ্রাহকরা বই পড়ে সময় কাটান। কেউ পড়েন গল্প-উপন্যাস, কেউ কবিতা, আবার কেউ ধর্মীয় বই। অনেক গ্রাহক নিজেরাও বই উপহার দিয়ে রাজুর এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করছেন।

শুধু বই পড়ার সুযোগ তৈরি নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করেন রাজু। নিজে এতিম হওয়ায় এতিম শিশুদের প্রতি তাঁর রয়েছে বিশেষ ভালোবাসা। তাই তাঁর সেলুনে এতিম শিশুদের বিনা মূল্যে চুল কাটানো হয়। মসজিদের ইমাম ও খতিবদের জন্য রয়েছে অর্ধেক মূল্যে সেবা। পাশাপাশি বয়স্ক ও অসহায় মানুষের জন্যও রয়েছে বিশেষ ছাড়।

নিজের সীমিত আয়ের মধ্যেও মানুষের জন্য এমন উদ্যোগ স্থানীয়দের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

রাজুর স্বপ্ন, একদিন তাঁর এই ছোট্ট পাঠাগারটি বড় একটি গণপাঠাগারে পরিণত হবে। সেখানে এলাকার তরুণ-যুবকসহ সব বয়সী মানুষ অবসর সময়ে বই পড়তে পারবেন। নতুন প্রজন্মকে বই পড়ায় আগ্রহী করে তোলা এবং জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রাজু পড়াশোনা বেশি দূর চালিয়ে যেতে না পারলেও নিজের উদ্যোগে অন্যদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করছেন। একটি সেলুনে এমন পাঠাগার গড়ে তোলা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

রাজু আহমেদের গল্প আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বেশি দূর করতে না পারলেও জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে হয় না। ইচ্ছাশক্তি, ভালো চিন্তা ও মানুষের জন্য কিছু করার মানসিকতা একজন মানুষকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলতে পারে।

একদিন যাঁকে ‘অশিক্ষিত’ বলে অপমান করা হয়েছিল, আজ সেই রাজুই নিজের সেলুনে শতাধিক বই সাজিয়ে অন্যদের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দিচ্ছেন। কাঁচি দিয়ে মানুষের চুল কাটার পাশাপাশি বইয়ের মাধ্যমে মানুষের মনে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream