বাংলাদেশী গণমাধ্যম শিল্পে বর্তমানে নজিরবিহীন আর্থিক সংকট, অপসাংবাদিকতা এবং শৃঙ্খলার অভাব দেখা দিয়েছে। ওয়েজবোর্ড বা নিয়মিত বেতন-ভাতা না দেওয়া, কার্ড বাণিজ্য, সরকারি বিজ্ঞাপনে কমিশন পার্সেন্টেজ প্রথা এবং নামসর্বস্ব এক রুমের পত্রিকার অফিস বা টেলিভিশনের কারণে মূলধারার সাংবাদিকতা মারাত্মক ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে।
দেশের বেশ কিছু টেলিভিশন চ্যানেল এবং সংবাদপত্র নিয়মিত কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করে না। মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে অনেক গণমাধ্যমকর্মী জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এর ফলে বাধ্য হয়ে কিংবা প্রলোভনে পড়ে কিছু কর্মী মাঠপর্যায়ে চাঁদাবাজি, ব্লাকমেইলিং ও অনৈতিক আর্থিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়ছেন, যা সামগ্রিক সাংবাদিক সমাজের মান-মর্যাদা ধূলিসাৎ করছে।
"চুলার পিঠে বিড়াল ঘুমায়, নিজেই খেতে পারে না অথচ সে পত্রিকার সম্পাদক"—এই রূপকটি বর্তমানের বহু ভুঁইফোড় বা ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একটি টেবিল ও একটি কম্পিউটার নিয়ে মোড়ে মোড়ে এক রুমের গণমাধ্যম হাউজ গড়ে উঠেছে। এসব নামসর্বস্ব পত্রিকার মূল আয় আসে 'প্রেস আইডি কার্ড' বিক্রি করে। মফস্বল বা জেলা-উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়ার নামে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে কার্ড দেওয়া হয়। এই কার্ডধারীরা পরে সাংবাদিকতার পরিচয়ে নানা অপকর্মে লিপ্ত হয়।
অনেক পত্রিকার আসল সার্কুলেশন বা প্রচার সংখ্যা অত্যন্ত কম হলেও, অসৎ উপায়ে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে প্রচার সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হয়। সরকারি বিজ্ঞাপন পাওয়ার জন্য চলে লবিং ও বড় অঙ্কের পার্সেন্টেজ কমিশন বাণিজ্য। ফলে যোগ্য ও প্রকৃত ধারার গণমাধ্যমগুলো বঞ্চিত হচ্ছে, আর ভুঁইফোড় মিডিয়াগুলো টিকে থাকছে।
চাকরির বাজারে লোভনীয় পদবি এবং বড় হওয়ার ভুয়া স্বপ্ন দেখিয়ে হাজার হাজার তরুণ-যুবককে এসব হাউজে নিয়োগ দেওয়া হয়। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা বা বেতন না দিয়ে তাদের খাটিয়ে নেওয়া হয়। ক্যারিয়ারের শুরুতে এসে তরুণরা যখন বুঝতে পারে তারা প্রতারিত হয়েছে, ততক্ষণে তাদের জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যায়। অথচ এই সময়ে তারা অন্য কোনো উৎপাদনশীল পেশায় যুক্ত হতে পারতো।
জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আর্থিক সক্ষমতা এবং উপযুক্ত অবকাঠামো না থাকা সত্ত্বেও এসব হাউজ কীভাবে সরকারি নিবন্ধন বা ডিক্লারেশন পায়? তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর দুর্বল নজরদারি ও রাজনৈতিক বিবেচনাকে এর জন্য দায়ী করা হয়।
গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মতে, মূলধারার সাংবাদিকতাকে বাঁচাতে হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যেসব পত্রিকা বা টেলিভিশনের নিয়মিত বেতন দেওয়ার সক্ষমতা নেই, সেগুলোর নিবন্ধন বাতিল বা বন্ধ করে দেওয়া। এক রুমের অফিস কিংবা অপসাংবাদিকতার আতুড়ঘর ও ভুঁইফোড় পোর্টালগুলোর বিরুদ্ধে তথ্য মন্ত্রণালয়ের চিরুনি অভিযান চালানো। যত্রতত্র প্রেস কার্ড ইস্যু করা এবং কার্ড বাণিজ্য বন্ধে কঠোর আইনি নীতিমালা প্রণয়ন।
মতামত