বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM

বিবাহপূর্ব রোগ: কতটা প্রকাশ বাধ্যতামূলক, কতটা ব্যক্তিগত


ডেস্ক নিউজ
ডেস্ক নিউজ
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

বিবাহপূর্ব রোগ: কতটা প্রকাশ বাধ্যতামূলক, কতটা ব্যক্তিগত

বিয়ের মাত্র কয়েক দিন আগে কোনো পাত্রী যদি জানতে পারেন যে তাঁর হবু বর এক দীর্ঘমেয়াদি ছোঁয়াচে ব্যাধির চিকিৎসা নিচ্ছেন, তবে তাঁর মনে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে? হতে পারে, চিকিৎসক আশ্বস্ত করেছেন যে নিয়মিত চিকিৎসায় থাকায় ভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।

পাত্রের দৃষ্টিতে এটি তাঁর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিষয়ক গোপনীয় তথ্য। কিন্তু ডায়াগনসিস বা রোগের নামটির চেয়েও বড় হয়ে দেখা দেয় একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন, সম্মতি দেওয়ার আগে এটি জানার অধিকার কি ওই নারীর ছিল না?

এ ধরনের প্রতিটি পরিস্থিতিতেই মূলত দুটি মৌলিক অধিকার পরস্পর মুখোমুখি দাঁড়ায়। একদিকে ব্যক্তির স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য গোপন রাখার অধিকার, অন্যদিকে হবু জীবনসঙ্গীর এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার—যা তাঁর নিজের শরীর, ভবিষ্যৎ বংশধর ও সামগ্রিক জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

কেননা, বিবাহপূর্ব স্বাস্থ্যবিষয়ক জটিলতা বিভিন্ন রূপে সামনে আসতে পারে; হতে পারে তা কোনো বংশানুক্রমিক রোগ, গুরুতর মানসিক ব্যাধি, প্রজননক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি যত্ন সাপেক্ষ কোনো অসুস্থতা।

পবিত্র কোরআনে বিবাহবন্ধনকে একটি সুদৃঢ় অঙ্গীকার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। (সুরা নিসা, আয়াত: ২১)

এমন এক পবিত্র সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো উভয় পক্ষের সচেতন সম্মতি। যে সম্মতি কোনো মৌলিক সত্য গোপন রেখে নেওয়া হয়, তথ্য প্রকাশের পর সেই সম্মতির স্থায়িত্ব ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বজায় থাকে না। 

মহানবী (সা.) একটি সার্বজনীন নীতি ঘোষণা করে বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২)

বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দৈহিক বা মানসিক ত্রুটি বা ব্যাধি গোপন রেখে নিজেকে উপস্থাপন করাও এই প্রতারণার শামিল। ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে এমন প্রতিটি ত্রুটি বা ব্যাধিই প্রকাশ করা আবশ্যক যা অপর পক্ষকে মানসিকভাবে দূরে ঠেলে দেয় কিংবা বিবাহের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। (জাদুল মাআদ ফি হাদয়ি খাইরিল ইবাদ, ৫/১৬০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৬)

যেসব গুরুতর রোগ বৈবাহিক জীবনকে ব্যাহত করে কিংবা সংক্রামক ক্ষতির সৃষ্টি করে, তা প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক এবং তা গোপন করা স্পষ্টত প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত।

তবে সাধারণ বা সাময়িক উপসর্গ যা বৈবাহিক উদ্দেশ্যের ওপর প্রভাব ফেলে না, তা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার আওতাভুক্ত থাকবে। (মুহাম্মদ আলি বালাও, মাউসুআতু নাওয়াজিলিল আমরাদ ওয়াল আওবিআ, ১/৬৮–১২৬, দারুল বাশাইর আল-ইসলামিয়্যা, বৈরুত, ২০১৪)

গতকালের মারাত্মক ব্যাধি আজকের দিনে দীর্ঘ স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হতে পারে। এ কারণে তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণে পাঁচ ধাপের মানদণ্ড প্রস্তাব করা যায়:

১. রোগের বর্তমান প্রকৃত অবস্থা কী? ডায়াগনসিস নিশ্চিত কি না, ব্যাধিটি কি সক্রিয় নাকি সুনিয়ন্ত্রিত এবং নিয়মিত ওষুধ সেবনের ফল কেমন?

২. এতে কি অপর পক্ষের শরীরে সংক্রামক ব্যাধি ছড়ানো, শারীরিক ক্ষতি কিংবা দাম্পত্য ও গর্ভধারণে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়?

৩. এটি কি বিবাহের মূল উদ্দেশ্য যেমন—যৌন সক্ষমতা, প্রজনন কিংবা যৌথ জীবনের স্বাভাবিক গৃহস্থালি দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে?

৪. এটি কি ভবিষ্যত সন্তানের জন্য কোনো বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে?

৫. এটি কি দীর্ঘমেয়াদে এমন প্রভাব ফেলে যা সামাজিকভাবে জানলে অপর পক্ষের সিদ্ধান্ত বদলে যেত; যেমন—অত্যধিক ব্যয়বহুল চিকিৎসা, ঘনঘন হাসপাতালে ভর্তি কিংবা ধারাবাহিক পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা?

এই ৫ প্রশ্নের যেকোনো একটির উত্তর যদি ইতিবাচক হয়, তবে সেই তথ্য হবু সঙ্গীর কাছে প্রকাশ করা নৈতিক ও আইনগতভাবে আবশ্যিক হয়ে দাঁড়ায়। (মুহাম্মদ আলি বালাও, মাউসুআতু নাওয়াজিলিল আমরাদ ওয়াল আওবিআ, ২/২৬৪–৩০৭, দারুল বাশাইর আল-ইসলামিয়্যা, বৈরুত, ২০১৪)

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কার প্রাচীনকালের অনেক ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গিকে পুনর্বিবেচনার সুযোগ করে দিয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, এইচআইভি সংক্রমণের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৩ সালের এক নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে যেসব আক্রান্ত ব্যক্তি নিয়মিত ওষুধ খেয়ে ভাইরাসের মাত্রা অনুল্লিখিত বা অশনাক্তযোগ্য পর্যায়ে নামিয়ে আনেন, তাঁদের মাধ্যমে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। (গাইডলাইনস অন ভাইরাল লো সাপ্রেশন অ্যান্ড এইচআইভি ট্রান্সমিশন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশনা, জেনেভা, ২০২৩)

তবে চিকিৎসার ঝুঁকি কমলেও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সন্তান ধারণের বিশেষ পরিকল্পনার প্রয়োজনে এই তথ্য প্রকাশ করা আবশ্যক।

একইভাবে হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’ ভাইরাসের ক্ষেত্রেও বর্তমান চিকিৎসায় প্রতিষেধক টিকা ও ওষুধ থাকায় পুরোনো রিপোর্টের চেয়ে আধুনিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মূল্যায়নই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

অনেকে বলেন, বিয়ের আগে সরকারি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করালেই হয়। কিন্তু বিভিন্ন দেশের বিবাহপূর্ব স্ক্রিনিং প্রোগ্রামে দেখা গেছে, শুধু নির্দিষ্ট কিছু বংশগত রক্তরোগ (যেমন: সিকল সেল, থ্যালাসেমিয়া) এবং সংক্রামক ব্যাধির (যেমন: হেপাটাইটিস বি, সি ও এইচআইভি) পরীক্ষা করে থাকে।

ফলে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সনদ পেলেই যে সব ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বা মানসিক ব্যাধি থেকে মুক্ত, তা নিশ্চিত হয় না। সনদের বাইরে থাকা যেকোনো গুরুতর স্বাস্থ্যগত তথ্য নিজ দায়িত্বে হবু সঙ্গীর কাছে প্রকাশ করা নৈতিক বাধ্যবাধকতা।

আবার অনেক মানুষ কোনো নির্দিষ্ট ব্যাধির জিনগত বাহক হতে পারেন, অথচ তাঁদের নিজেদের শরীরে কোনো রোগলক্ষণ থাকে না। কেউ কোনো জিনগত বৈশিষ্ট্যের বাহক হলেই তাঁকে ‘রোগী’ আখ্যা দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ ভুল বটে। তবে পাত্র-পাত্রী উভয়েই যদি একই বিরূপ জিনের বাহক হন, তবে তাঁদের ভবিষ্যৎ সন্তানের ক্ষেত্রে জিনগত ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এ ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ জেনেটিক কাউন্সেলরের পরামর্শ নিয়ে সঠিক তথ্য ও ঝুঁকি হবু দম্পতিকে বোঝানো উচিত। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও তথ্য প্রকাশে সংবেদনশীলতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

অতীতে ঘটে যাওয়া এককালীন সাময়িক হতাশা বা ডিপ্রেশন যা চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সেরে গেছে, আর এমন একটি জটিল মানসিক ব্যাধি যা ঘনঘন হাসপাতালে ভর্তি কিংবা সামাজিক ও পারিবারিক জীবন পরিচালনায় চরম বিঘ্ন ঘটায়—এ দুটি কখনো এক নয়।

মানসিক রোগের ক্ষেত্রে বর্তমান স্থায়িত্ব, রোগীর নিজ ব্যাধি সম্পর্কে সচেতনতা, ওষুধ সেবনের নিয়মকানুন এবং দাম্পত্য দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বিচার করে তথ্য প্রকাশের সীমানা ঠিক করতে হবে। তবে গোপনীয়তা প্রকাশের নামে কারও মানসিক অসুস্থতার কথা সমাজে ছড়িয়ে তাঁকে হেয় করা ধর্মীয় নীতির পরিপন্থী।

তথ্য প্রকাশের একটি সুনির্দিষ্ট আদব রয়েছে। এটি হওয়া উচিত বিয়ের চুক্তি বা আকদের পূর্বে, সম্পর্ক যখন বিয়ের দিকে চূড়ান্তভাবে গড়ায় এবং উভয় পক্ষ একটি সামাজিক বা আর্থিক দায়বদ্ধতায় আবদ্ধ হওয়ার ঠিক আগে।

তথ্য প্রকাশ করা উচিত সরাসরি হবু সঙ্গীর কাছে, এবং প্রয়োজনবোধে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতিতে যাতে সত্য সঠিকভাবে অনুধাবন করা যায়।

অন্যদিকে, চিকিৎসকদের পেশাগত গোপনীয়তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক নীতিমালায় বলা হয়েছে যে রোগীর স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া তাঁর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য তৃতীয় কারও কাছে প্রকাশ করা যাবে না। (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশনা, জেনেভা, ২০২২)

শুধু যদি তথ্য গোপন রাখলে অপর ব্যক্তি গুরুতর ক্ষতি বা মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়েন, তবে জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে তথ্য প্রকাশের বিষয়ে ডাক্তার বিবেচনা করতে পারেন।

বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর যদি জানা যায় যে কোনো এক পক্ষ জেনেবুঝে কোনো গুরুতর ব্যাধি গোপন রেখেছিলেন, তবে তা স্পষ্টত প্রতারণা বলে গণ্য হবে। এমন পরিস্থিতিতে তারা আদালতে বিবাহ বাতিলের আবেদন করার অধিকার রাখেন। (মুহাম্মদ আলি বালাও, মাউসুআতু নাওয়াজিলিল আমরাদ ওয়াল আওবিআ, ২/২৬৪–৩০৭, দারুল বাশাইর আল-ইসলামিয়্যা, বৈরুত, ২০১৪)

হ্যাঁ, যদি অপর পক্ষ স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যেতে সম্মত হন, তবে তা তাঁদের ব্যক্তিগত উদারতা হিসেবে বিবেচিত হবে।

বিষয় : বিয়ে রোগ ইসলামের কথা মাসআলা প্রশ্ন পাঠকের প্রশ্ন বিবাহ বিচ্ছেদ

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


বিবাহপূর্ব রোগ: কতটা প্রকাশ বাধ্যতামূলক, কতটা ব্যক্তিগত

প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বিয়ের মাত্র কয়েক দিন আগে কোনো পাত্রী যদি জানতে পারেন যে তাঁর হবু বর এক দীর্ঘমেয়াদি ছোঁয়াচে ব্যাধির চিকিৎসা নিচ্ছেন, তবে তাঁর মনে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে? হতে পারে, চিকিৎসক আশ্বস্ত করেছেন যে নিয়মিত চিকিৎসায় থাকায় ভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।

পাত্রের দৃষ্টিতে এটি তাঁর সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিষয়ক গোপনীয় তথ্য। কিন্তু ডায়াগনসিস বা রোগের নামটির চেয়েও বড় হয়ে দেখা দেয় একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন, সম্মতি দেওয়ার আগে এটি জানার অধিকার কি ওই নারীর ছিল না?

এ ধরনের প্রতিটি পরিস্থিতিতেই মূলত দুটি মৌলিক অধিকার পরস্পর মুখোমুখি দাঁড়ায়। একদিকে ব্যক্তির স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য গোপন রাখার অধিকার, অন্যদিকে হবু জীবনসঙ্গীর এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার—যা তাঁর নিজের শরীর, ভবিষ্যৎ বংশধর ও সামগ্রিক জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

কেননা, বিবাহপূর্ব স্বাস্থ্যবিষয়ক জটিলতা বিভিন্ন রূপে সামনে আসতে পারে; হতে পারে তা কোনো বংশানুক্রমিক রোগ, গুরুতর মানসিক ব্যাধি, প্রজননক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি যত্ন সাপেক্ষ কোনো অসুস্থতা।

পবিত্র কোরআনে বিবাহবন্ধনকে একটি সুদৃঢ় অঙ্গীকার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। (সুরা নিসা, আয়াত: ২১)

এমন এক পবিত্র সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো উভয় পক্ষের সচেতন সম্মতি। যে সম্মতি কোনো মৌলিক সত্য গোপন রেখে নেওয়া হয়, তথ্য প্রকাশের পর সেই সম্মতির স্থায়িত্ব ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বজায় থাকে না। 

মহানবী (সা.) একটি সার্বজনীন নীতি ঘোষণা করে বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২)

বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দৈহিক বা মানসিক ত্রুটি বা ব্যাধি গোপন রেখে নিজেকে উপস্থাপন করাও এই প্রতারণার শামিল। ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে এমন প্রতিটি ত্রুটি বা ব্যাধিই প্রকাশ করা আবশ্যক যা অপর পক্ষকে মানসিকভাবে দূরে ঠেলে দেয় কিংবা বিবাহের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। (জাদুল মাআদ ফি হাদয়ি খাইরিল ইবাদ, ৫/১৬০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৬)

যেসব গুরুতর রোগ বৈবাহিক জীবনকে ব্যাহত করে কিংবা সংক্রামক ক্ষতির সৃষ্টি করে, তা প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক এবং তা গোপন করা স্পষ্টত প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত।

তবে সাধারণ বা সাময়িক উপসর্গ যা বৈবাহিক উদ্দেশ্যের ওপর প্রভাব ফেলে না, তা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার আওতাভুক্ত থাকবে। (মুহাম্মদ আলি বালাও, মাউসুআতু নাওয়াজিলিল আমরাদ ওয়াল আওবিআ, ১/৬৮–১২৬, দারুল বাশাইর আল-ইসলামিয়্যা, বৈরুত, ২০১৪)

গতকালের মারাত্মক ব্যাধি আজকের দিনে দীর্ঘ স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হতে পারে। এ কারণে তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নির্ধারণে পাঁচ ধাপের মানদণ্ড প্রস্তাব করা যায়:

১. রোগের বর্তমান প্রকৃত অবস্থা কী? ডায়াগনসিস নিশ্চিত কি না, ব্যাধিটি কি সক্রিয় নাকি সুনিয়ন্ত্রিত এবং নিয়মিত ওষুধ সেবনের ফল কেমন?

২. এতে কি অপর পক্ষের শরীরে সংক্রামক ব্যাধি ছড়ানো, শারীরিক ক্ষতি কিংবা দাম্পত্য ও গর্ভধারণে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়?

৩. এটি কি বিবাহের মূল উদ্দেশ্য যেমন—যৌন সক্ষমতা, প্রজনন কিংবা যৌথ জীবনের স্বাভাবিক গৃহস্থালি দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে?

৪. এটি কি ভবিষ্যত সন্তানের জন্য কোনো বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে?

৫. এটি কি দীর্ঘমেয়াদে এমন প্রভাব ফেলে যা সামাজিকভাবে জানলে অপর পক্ষের সিদ্ধান্ত বদলে যেত; যেমন—অত্যধিক ব্যয়বহুল চিকিৎসা, ঘনঘন হাসপাতালে ভর্তি কিংবা ধারাবাহিক পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা?

এই ৫ প্রশ্নের যেকোনো একটির উত্তর যদি ইতিবাচক হয়, তবে সেই তথ্য হবু সঙ্গীর কাছে প্রকাশ করা নৈতিক ও আইনগতভাবে আবশ্যিক হয়ে দাঁড়ায়। (মুহাম্মদ আলি বালাও, মাউসুআতু নাওয়াজিলিল আমরাদ ওয়াল আওবিআ, ২/২৬৪–৩০৭, দারুল বাশাইর আল-ইসলামিয়্যা, বৈরুত, ২০১৪)

চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কার প্রাচীনকালের অনেক ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গিকে পুনর্বিবেচনার সুযোগ করে দিয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, এইচআইভি সংক্রমণের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৩ সালের এক নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে যেসব আক্রান্ত ব্যক্তি নিয়মিত ওষুধ খেয়ে ভাইরাসের মাত্রা অনুল্লিখিত বা অশনাক্তযোগ্য পর্যায়ে নামিয়ে আনেন, তাঁদের মাধ্যমে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। (গাইডলাইনস অন ভাইরাল লো সাপ্রেশন অ্যান্ড এইচআইভি ট্রান্সমিশন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশনা, জেনেভা, ২০২৩)

তবে চিকিৎসার ঝুঁকি কমলেও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সন্তান ধারণের বিশেষ পরিকল্পনার প্রয়োজনে এই তথ্য প্রকাশ করা আবশ্যক।

একইভাবে হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’ ভাইরাসের ক্ষেত্রেও বর্তমান চিকিৎসায় প্রতিষেধক টিকা ও ওষুধ থাকায় পুরোনো রিপোর্টের চেয়ে আধুনিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মূল্যায়নই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

অনেকে বলেন, বিয়ের আগে সরকারি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করালেই হয়। কিন্তু বিভিন্ন দেশের বিবাহপূর্ব স্ক্রিনিং প্রোগ্রামে দেখা গেছে, শুধু নির্দিষ্ট কিছু বংশগত রক্তরোগ (যেমন: সিকল সেল, থ্যালাসেমিয়া) এবং সংক্রামক ব্যাধির (যেমন: হেপাটাইটিস বি, সি ও এইচআইভি) পরীক্ষা করে থাকে।

ফলে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সনদ পেলেই যে সব ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বা মানসিক ব্যাধি থেকে মুক্ত, তা নিশ্চিত হয় না। সনদের বাইরে থাকা যেকোনো গুরুতর স্বাস্থ্যগত তথ্য নিজ দায়িত্বে হবু সঙ্গীর কাছে প্রকাশ করা নৈতিক বাধ্যবাধকতা।

আবার অনেক মানুষ কোনো নির্দিষ্ট ব্যাধির জিনগত বাহক হতে পারেন, অথচ তাঁদের নিজেদের শরীরে কোনো রোগলক্ষণ থাকে না। কেউ কোনো জিনগত বৈশিষ্ট্যের বাহক হলেই তাঁকে ‘রোগী’ আখ্যা দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ ভুল বটে। তবে পাত্র-পাত্রী উভয়েই যদি একই বিরূপ জিনের বাহক হন, তবে তাঁদের ভবিষ্যৎ সন্তানের ক্ষেত্রে জিনগত ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এ ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ জেনেটিক কাউন্সেলরের পরামর্শ নিয়ে সঠিক তথ্য ও ঝুঁকি হবু দম্পতিকে বোঝানো উচিত। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও তথ্য প্রকাশে সংবেদনশীলতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

অতীতে ঘটে যাওয়া এককালীন সাময়িক হতাশা বা ডিপ্রেশন যা চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সেরে গেছে, আর এমন একটি জটিল মানসিক ব্যাধি যা ঘনঘন হাসপাতালে ভর্তি কিংবা সামাজিক ও পারিবারিক জীবন পরিচালনায় চরম বিঘ্ন ঘটায়—এ দুটি কখনো এক নয়।

মানসিক রোগের ক্ষেত্রে বর্তমান স্থায়িত্ব, রোগীর নিজ ব্যাধি সম্পর্কে সচেতনতা, ওষুধ সেবনের নিয়মকানুন এবং দাম্পত্য দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বিচার করে তথ্য প্রকাশের সীমানা ঠিক করতে হবে। তবে গোপনীয়তা প্রকাশের নামে কারও মানসিক অসুস্থতার কথা সমাজে ছড়িয়ে তাঁকে হেয় করা ধর্মীয় নীতির পরিপন্থী।

তথ্য প্রকাশের একটি সুনির্দিষ্ট আদব রয়েছে। এটি হওয়া উচিত বিয়ের চুক্তি বা আকদের পূর্বে, সম্পর্ক যখন বিয়ের দিকে চূড়ান্তভাবে গড়ায় এবং উভয় পক্ষ একটি সামাজিক বা আর্থিক দায়বদ্ধতায় আবদ্ধ হওয়ার ঠিক আগে।

তথ্য প্রকাশ করা উচিত সরাসরি হবু সঙ্গীর কাছে, এবং প্রয়োজনবোধে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতিতে যাতে সত্য সঠিকভাবে অনুধাবন করা যায়।

অন্যদিকে, চিকিৎসকদের পেশাগত গোপনীয়তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক নীতিমালায় বলা হয়েছে যে রোগীর স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া তাঁর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য তৃতীয় কারও কাছে প্রকাশ করা যাবে না। (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশনা, জেনেভা, ২০২২)

শুধু যদি তথ্য গোপন রাখলে অপর ব্যক্তি গুরুতর ক্ষতি বা মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়েন, তবে জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে তথ্য প্রকাশের বিষয়ে ডাক্তার বিবেচনা করতে পারেন।

বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর যদি জানা যায় যে কোনো এক পক্ষ জেনেবুঝে কোনো গুরুতর ব্যাধি গোপন রেখেছিলেন, তবে তা স্পষ্টত প্রতারণা বলে গণ্য হবে। এমন পরিস্থিতিতে তারা আদালতে বিবাহ বাতিলের আবেদন করার অধিকার রাখেন। (মুহাম্মদ আলি বালাও, মাউসুআতু নাওয়াজিলিল আমরাদ ওয়াল আওবিআ, ২/২৬৪–৩০৭, দারুল বাশাইর আল-ইসলামিয়্যা, বৈরুত, ২০১৪)

হ্যাঁ, যদি অপর পক্ষ স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যেতে সম্মত হন, তবে তা তাঁদের ব্যক্তিগত উদারতা হিসেবে বিবেচিত হবে।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream