শাহজাহান আলী মনন সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি:
প্রকাশ্যে জনসম্মুখে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে নিম্নমানের ইটের খোয়া দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে সরকারের টয়লেট প্রকল্পের সেনেটারি ট্যাংকের রিং ও স্লাব। তারপরও নির্বিকার ইউপি চেয়ারম্যান, সচিব, মেম্বাররাসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তারা। সকলকে ম্যানেজ করে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা ও ঠিকাদার সমঝোতার মাধ্যমে এই দূর্নীতি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
শেষ মূহুর্তে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সংবাদ কর্মীদের তথ্যের ভিত্তিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাহ ফাতেহা তাকমিল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি অভিযোগের সত্যতা পেয়ে নিম্নমানের ইটের খোয়া রিজেক্ট করে নতুনভাবে ভালো মানের খোয়া দিয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ঘটনাটি ঘটেছে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদে।
জানা যায়, সৈয়দপুর উপজেলার ৫ টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে ৮৫ টি করে পাকা টয়লেট (পায়খানা) নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দে মোট ৪২৫ টি টয়লেটের সেনেটারি ট্যাংকের রিং ও স্লাব তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। লালমনিরহাটের নুর ট্রেডার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পেয়ে এই কাজ করছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৯০ ভাগ রিং ও স্লাব তৈরি সম্পন্ন করা হয়েছে।
প্রথম থেকেই অত্যন্ত নিম্নমানের ইটের খোয়া দিয়ে রিং ও স্লাব তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে মাঝে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা প্রতিবাদ জানান। তখন উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আবু জাফর ও ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম তাকে ডেকে নিয়ে হোটেলে বসে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। যা তিনি তার ফেসবুক আইডিতে দীর্ঘ স্ট্যাটাসের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এভাবেই নাকি সকলকেই ম্যানেজ করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
একইভাবে ইবনে আলী নামে আরেক ব্যক্তিও রিং ও স্লাব তৈরিতে অনিয়ম দূর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরে ভিডিও ফুটেজসহ লিখিত পোস্ট দিয়েছেন। সেখানেও ওই বিএনপি নেতাকে ম্যানেজে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাবের বিষয়টা উঠে আসে। এনিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। কিন্তু তারপর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী নির্বিকার থাকেন এবং ঠিকাদারের পক্ষেই সাফাই গেয়ে শতভাগ ভালো কাজ করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন।
এমতাবস্থায় গত রোববার রাতে স্থানীয় লোকজন সংবাদ কর্মীদের বিষয়টা জানান। সে অনুযায়ী সোমবার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বোতলাগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, রিং ও স্লাব তৈরি করা হচ্ছে। আর এতে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যন্ত নিম্নমানের ইটের খোয়া। এক নম্বর ইটের নামে স্থানীয় ভাষায় গুড়িয়া বা শাল্টি (৩ নম্বরেরও নিচে) ইটের খোয়া এগুলো। এসময় ইউপি চেয়ারম্যান, সচিব, মেম্বার ও গ্রাম পুলিশের উপস্থিতিতে রাজ মিস্ত্রি ও হেলপারসহ খোয়া সরবরাহকারীও খোয়ার মান সঠিক নয় বলে স্বীকার করেন।
এর প্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আবু জাফরকে বিষয়টা মুঠোফোনে জানানো হয়। কিন্তু তিনি গুরুত্ব না উল্টো চ্যালেঞ্জ করে বলেন, 'কোন খারাপ খোয়া সেখানে নেই। কাজ শতভাগ ভালো করা হচ্ছে। অহেতুক ভূয়া অভিযোগ করে লাভ নেই। আপনাদের কথা মতোতো আর আমরা চলবোনা। সমস্যা মনে হলে নিউজ করেন বা উপরে জানান। তাতে আমার কোন সমস্যা নেই।' এতে বাধ্য হয়ে খোয়ার ছবি ও ভিডিও ফুটেজ পাঠিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়।
এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাহ ফাতেহা তাকমিলা দ্রুত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আবু জাফরকে সাথে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এতে তিনি খোয়ার মান নিয়ে উল্লেখিত অভিযোগের সত্যতা পান। ফলে সাথে সাথে স্তুপ করে রাখা খোয়াগুলো রিজেক্ট করে এগুলো দিয়ে যেন আর কোন কাজ করা না হয় সেজন্য সরিয়ে ফেলতে বলেন। একইসাথে সঠিক মান সম্পন্ন ইটের খোয়া দিয়ে বাকি কাজ করারও নির্দেশ দেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ এই রিজেক্ট করা খোয়া দিয়েই প্রায় ৫০-৬০ ভাগ কাজ করা হয়েছে। মাঝে কিছু পিকইট এনে ভেঙ্গে খোয়া তৈরি করা হয়েছে। যেগুলো মূলত: সেম্পল হিসেবে দেখানো হয়েছে মাত্র। এনিয়ে কথা বললেই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী একপ্রকার ধমক দিয়েই সবাইকে থামিয়েছেন। সর্বশেষ সাংবাদিকদের কাছে এসে ধরা পড়েছে। কিন্তু কাজতো প্রায়ই শেষ। এখন ধরলেও দূর্নীতিতো পগারপার। খারাপ কাজের তো কোন বিচার হবেনা।
খোয়া সরবরাহকারী কৃষ্ণ কুমার রায় বলেন, আমরা মূলত: টুকরো ইট দিয়ে খোয়া তৈরি করি। আর ভাটায় টুকরোর মধ্যে এক নম্বর, দুই নম্বরসহ সব ইটের মিশ্রণ থাকে। এগুলোই আমাদের কাছে এক নম্বর খোয়া। যা ১০০-১২০ টাকা সেফটি হিসেবে বিক্রি করি। এখানে মাত্র ৭০ সেফটি খোয়া দিয়েছি। আর আপনারা যে এক নম্বর ইটের কথা বলছেন তা গোটা পিকইট কিনে ভেঙ্গে করতে হবে। এতে দাম পড়বে প্রতি সেফটি ১৪০-১৫০ টাকা। আর আমার খোয়া না চললে ফেরত দিলেই হতো। কিন্তু তারাতো কাজ করেছেন।
ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান সরকার জুন ও সচিব (প্রশাসনিক কর্মকর্তা) ফেরেজুল শাহ বলেন, ইউপি চত্বরে কাজ করা হলেও এনিয়ে আমাদের কোন ইখতিয়ারে রাখা হয়নি। সব দায়িত্ব পালন করছেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী। ভালো মন্দ বিষয়ে তিনিই সর্বেসর্বা। মাঝে স্থানীয় বিএনপি নেতারা এসেছিল। কিন্তু পরে কি হয়েছে তা জানিনা। কাজতো যথারীতি চলছে এবং শেষ পর্যায়ে। তবে আজ যে খোয়াগুলো দিয়ে কাজ করা হচ্ছে তা নিম্নমানেরই মনে হচ্ছে।
এব্যাপারে বিকেল ৫ টায় উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আবু জাফরের সাথে তার অফিসে কথা হয়। এসময় তিনি বলেন, শতভাগ ভালো ইটের খোয়া দিয়েই পুরো কাজ করা হচ্ছে। গতকাল খোয়া শেষ হওয়ায় মাত্র ৭০ সেফটি খোয়া বাইরে থেকে কেনা হয়েছে। যা ঠিকাদার আমাকে জানায়নি। তবে এই খোয়াও এক নম্বর, শুধু রংটা একটু সমস্যা। এগুলো ল্যাবটেস্ট না করেই কি করে নিশ্চিত হলেন মান ভালো? এমন প্রশ্নে তিনি বিরক্ত হয়ে বলেন, আমরা বুঝি। আপনারা তো বুঝবেন না।
তা আপনার সেই ভালো খোয়া রিজেক্ট করা হলো কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইউএনও স্যার নির্দেশ দিয়েছেন তাই। তিনিওতো এ বিষয়ে জানেন না। আপনারাও না জেনে না বুঝে অভিযোগ করছেন। অথচ এই কাজ নিয়ে পজিটিভ লিখতে পারতেন তা না করে আমার দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আমাদের ভালো কাজও ভালো মনে হবেনা। এই খোয়া ল্যাবটেস্ট করার কোন প্রয়োজন নাই আমার। আপনারা চাইলে করে দেখেন।
খোয়ার মান খারাপ হওয়ায় স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করলে আপনি ও ঠিকাদার তাদের ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ করেছেন। কিন্তু কেন? এতে তিনি বলেন, ওগুলো কোন বিষয় নয়। ফেসবুকে লিখে কি হবে। আমার কর্তৃপক্ষ ঠিক থাকলে কারও কিছুই করার নাই। সাংবাদিকরা টাকার ধান্ধায় দোষ ধরছেন বলে মন্তব্য করেছেন। এটা কতটা সঠিক? তিনি বলেন, না এমন কথা বলিনি, আপনারা নিজের কাজ করছেন।
এদিকে এবিষয়ে ঠিকাদার শফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে গত কয়েকদিন থেকে একাধিক সংবাদ কর্মী বার বার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। প্রকল্প সাইটেও তার কোন প্রতিনিধি নাই। ফলে তাদের কোন মন্তব্যই পাওয়া যায়নি। অভিযোগ আছে ঠিকাদারের নামে মূলত: জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী নিজেই এই কাজ করছেন। এজন্যই ঠিকাদারকে আড়ালে রাখা হয়েছে।
সূত্রমতে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর সাথে সমঝোতার কারণেই নিম্নমানের ইটের খোয়ায় কাজ করা হয়েছে। আর একারণে অভিযোগ উঠার পরও প্রকৌশলী ঠিকাদারের পক্ষে সাফাই গাচ্ছেন। সেই সাথে দুইজন মিলে ঘুষ দিয়ে প্রতিবাদকারীসহ সংশ্লিষ্ট অনেককেই ম্যানেজ করেছেন। রিং ও স্লাব তৈরিতেই এমন অনিয়ম দূর্নীতি হয়েছে। সামনে টয়লেট স্থাপনে এবং ঘর বানানোর ক্ষেত্রে আরও বেশি করা হবে। তাই প্রশাসনের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের এখনই অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
মতামত