রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩
English
ইউনিকোড কনভার্টার
Bangla FM

গাজীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে 'জামাই সোহেল' সিন্ডিকেট



গাজীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে 'জামাই সোহেল' সিন্ডিকেট
গাজীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে 'জামাই সোহেল' সিন্ডিকেট

গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এখন দুর্নীতি আর অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সদর সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল বাতেনের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে এবং তার আড়ালে পুরো অফিসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন সোহেল রানা যিনি এলাকায় 'জামাই সোহেল' বা 'ঘর জামাই সোহেল' নামে পরিচিত। সরকারি কোনো পদে না থেকেও এই সোহেল রানা প্রতিদিন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বসে কোটি কোটি টাকার ঘুষের কারবার ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতিদিন শত শত সাফ-কবলা, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, ঘোষণাপত্র ও হেবা দলিল সম্পাদিত হয়। সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে প্রতি দলিলে সেরেস্তা ও খাস কামরার নামে আড়াই হাজার থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায় করা হয়। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা অবৈধ উৎকোচ বা ঘুষ আদায় হয়। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহে এই অফিস থেকে প্রায় ১ থেকে ১.৫ কোটি টাকা ১০০ থেকে ১৫০ লাখ টাকা অবৈধভাবে তোলবাজি করা হয়, যার একটি বড় অংশ 'জামাই সোহেল'-এর মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারের খাস কামরা ও তার বাসভবন পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

সোহেল রানার এই অনিয়ম ও ভীতি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। দুপুর আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল সম্পাদনের সময় এক ভুক্তভোগী উপস্থিত ছিলেন। ওই দিন বহিরাগত সোহেল রানা দলিলের কাজ আটকে অতিরিক্ত টাকা দাবি করেন। ভুক্তভোগী ব্যক্তি সরকারি কর্মকর্তা না হয়েও সোহেল কেন অফিসে আধিপত্য বিস্তার করছেন—এই প্রশ্ন তোলায় সোহেল রানা তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন। এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী ব্যক্তি নিজের নিরাপত্তা চেয়ে এবং সাব-রেজিস্ট্রারের যোগসাজশের কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে লিখিত অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন।

স্থানীয় দলিল লেখক ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার এবং গোপন সূত্রে জানা গেছে, সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল বাতেন সরাসরি টাকা স্পর্শ করেন না। তার খাস কামরায় নিয়োজিত নির্দিষ্ট ৩ জন কর্মচারী এবং বাইরে মাঠ পর্যায়ে 'জামাই সোহেল' এই টাকা কালেকশন করেন। টাকা না দিলে ফাইলে নানা ত্রুটি বা কারণ দেখিয়ে দলিল আটকে দেওয়া হয়। সপ্তাহ শেষে সংগৃহীত এই বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা সোহেল রানা সরাসরি বা বিশেষ মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারের নিরাপদ ডেরায় পৌঁছে দেন।

"সোহেল রানা অফিসের কেউ না। কিন্তু তার অনুমতি ছাড়া কোনো ফাইল বাতেন সাহেবের টেবিলে যায় না। প্রতি ফাইলেই বাতেন সাহেবের নাম করে সোহেলকে টাকা দিতে হয়। প্রতিবাদ করলে বাতেন সাহেব নিজেই বলেন, 'কাগজে ঝামেলা আছে, সোহেলের সাথে কথা বলেন।' আমরা এখানে পুরোপুরি জিম্মি।"

সোহেল রানার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, "আমি কাউকে হুমকি দিইনি এবং কোনো টাকা পয়সার লেনদেনের সাথে আমি জড়িত নই। আমাকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগতভাবে হেয় করার জন্য এসব বলা হচ্ছে।"

এই সিন্ডিকেট এবং বাসায় টাকা পৌঁছানোর বিষয়ে আব্দুল বাতেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দেননি। তবে তিনি দাবি করেন, "অফিসে কোনো বহিরাগতের স্থান নেই। সমস্ত দলিল সরকারি নিয়ম মেনেই রেজিস্ট্রি করা হচ্ছে।"

গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এই চরম অনিয়মের খবর চাউর হওয়ার পর, গত ১১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ডিসি এই কার্যালয়ে একটি আকস্মিক যৌথ অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে বালাম বই প্রত্যয়নপত্র ছাড়াই লেখা সহ নানা গুরুতর অসঙ্গতি এবং নিজস্ব বলয় তৈরি করে সেবাপ্রত্যাশীদের হয়রানি করার সত্যতা পাওয়া যায়।

বর্তমানে এই চক্রটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে তদন্ত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Bangla FM

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬


গাজীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে 'জামাই সোহেল' সিন্ডিকেট

প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এখন দুর্নীতি আর অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সদর সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল বাতেনের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে এবং তার আড়ালে পুরো অফিসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন সোহেল রানা যিনি এলাকায় 'জামাই সোহেল' বা 'ঘর জামাই সোহেল' নামে পরিচিত। সরকারি কোনো পদে না থেকেও এই সোহেল রানা প্রতিদিন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বসে কোটি কোটি টাকার ঘুষের কারবার ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতিদিন শত শত সাফ-কবলা, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, ঘোষণাপত্র ও হেবা দলিল সম্পাদিত হয়। সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে প্রতি দলিলে সেরেস্তা ও খাস কামরার নামে আড়াই হাজার থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায় করা হয়। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা অবৈধ উৎকোচ বা ঘুষ আদায় হয়। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহে এই অফিস থেকে প্রায় ১ থেকে ১.৫ কোটি টাকা ১০০ থেকে ১৫০ লাখ টাকা অবৈধভাবে তোলবাজি করা হয়, যার একটি বড় অংশ 'জামাই সোহেল'-এর মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারের খাস কামরা ও তার বাসভবন পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

সোহেল রানার এই অনিয়ম ও ভীতি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। দুপুর আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল সম্পাদনের সময় এক ভুক্তভোগী উপস্থিত ছিলেন। ওই দিন বহিরাগত সোহেল রানা দলিলের কাজ আটকে অতিরিক্ত টাকা দাবি করেন। ভুক্তভোগী ব্যক্তি সরকারি কর্মকর্তা না হয়েও সোহেল কেন অফিসে আধিপত্য বিস্তার করছেন—এই প্রশ্ন তোলায় সোহেল রানা তাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন। এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী ব্যক্তি নিজের নিরাপত্তা চেয়ে এবং সাব-রেজিস্ট্রারের যোগসাজশের কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে লিখিত অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন।

স্থানীয় দলিল লেখক ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার এবং গোপন সূত্রে জানা গেছে, সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল বাতেন সরাসরি টাকা স্পর্শ করেন না। তার খাস কামরায় নিয়োজিত নির্দিষ্ট ৩ জন কর্মচারী এবং বাইরে মাঠ পর্যায়ে 'জামাই সোহেল' এই টাকা কালেকশন করেন। টাকা না দিলে ফাইলে নানা ত্রুটি বা কারণ দেখিয়ে দলিল আটকে দেওয়া হয়। সপ্তাহ শেষে সংগৃহীত এই বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা সোহেল রানা সরাসরি বা বিশেষ মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারের নিরাপদ ডেরায় পৌঁছে দেন।

"সোহেল রানা অফিসের কেউ না। কিন্তু তার অনুমতি ছাড়া কোনো ফাইল বাতেন সাহেবের টেবিলে যায় না। প্রতি ফাইলেই বাতেন সাহেবের নাম করে সোহেলকে টাকা দিতে হয়। প্রতিবাদ করলে বাতেন সাহেব নিজেই বলেন, 'কাগজে ঝামেলা আছে, সোহেলের সাথে কথা বলেন।' আমরা এখানে পুরোপুরি জিম্মি।"

সোহেল রানার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, "আমি কাউকে হুমকি দিইনি এবং কোনো টাকা পয়সার লেনদেনের সাথে আমি জড়িত নই। আমাকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগতভাবে হেয় করার জন্য এসব বলা হচ্ছে।"

এই সিন্ডিকেট এবং বাসায় টাকা পৌঁছানোর বিষয়ে আব্দুল বাতেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দেননি। তবে তিনি দাবি করেন, "অফিসে কোনো বহিরাগতের স্থান নেই। সমস্ত দলিল সরকারি নিয়ম মেনেই রেজিস্ট্রি করা হচ্ছে।"

গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এই চরম অনিয়মের খবর চাউর হওয়ার পর, গত ১১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ডিসি এই কার্যালয়ে একটি আকস্মিক যৌথ অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে বালাম বই প্রত্যয়নপত্র ছাড়াই লেখা সহ নানা গুরুতর অসঙ্গতি এবং নিজস্ব বলয় তৈরি করে সেবাপ্রত্যাশীদের হয়রানি করার সত্যতা পাওয়া যায়।

বর্তমানে এই চক্রটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে তদন্ত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।


Bangla FM

প্রকাশক: আনোয়ার মুরাদ
সম্পাদক: মো. রাশিদুল ইসলাম (রাশেদ মানিক)

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত বাংলা এফ এম
Radio Logo
Bangla FM Live
24/7 Live Audio Stream