বিরোধী দল সরকারের পতন নয়, সফলতা চেয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
জামায়াত আমির বলেছেন, এত দিন তাঁরা সরকারকে সহযোগিতা করার কথা বলেছেন। এখন তাঁরা ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করবেন। সরকার বিরোধী দলের সহযোগিতা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের সেই সহযোগিতা নেওয়ার যোগ্যতা নেই।
আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে এক মুক্ত আলোচনা সভায় শফিকুর রহমান এ কথা বলেন।
‘জুলাই সনদের এক বছর: প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
শফিকুর রহমান বলেন, ৫ আগস্ট দুপুরের আগপর্যন্ত বিএনপি মজলুম ছিল। নির্বাচনের পর শপথের দিন থেকেই তারা জাতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করেছে। সেই ধারা এখনো অব্যাহত আছে।
বিএনপি ‘পোষা লোকদের’ দিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রশ্ন তুলছে, বিরোধী দল এত আগে কেন আন্দোলন শুরু করেছে—এমন অভিযোগ করে জামায়াতের আমির বলেন, বিএনপি জনগণের দেওয়া দুটি ভোটের মূল্যায়ন করলে সংসদের বাইরে গিয়ে বিরোধী দলকে আন্দোলন করতে হতো না। তারাই বিরোধী দলকে আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বিএনপি প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে হাত দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা মেধার অধিকার আদায়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। কিন্তু সরকার একের পর এক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার পর এখন সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) দিকে হাত দিচ্ছে।
কোনো কোনো মন্ত্রী পিএসসির সদস্যদের ডেকে পদত্যাগ করতে বলছেন বলে অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, পিএসসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, কোনো মন্ত্রীর পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়। পিএসসির সদস্যদের এ ধরনের কথা বলার অধিকার কোনো মন্ত্রীর নেই। এর অর্থ, তাঁরা চাকরির এই জায়গা দলীয় লোকজন দিয়ে পূর্ণ করতে চান।
চিফ হুইপের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর রংপুরে গিয়ে একই কথা বলেছিলেন। এই টাকা রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে যাবে, বিএনপির তহবিল থেকে নয়। তাই এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া একধরনের অপরাধ।
সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের ২০৮টি আসনে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিরোধী দলের কোনো সংসদ সদস্যকে তা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘এই বস্তাপচা রাজনীতির জন্য চব্বিশে গণ-অভ্যুত্থান হয়নি।’
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় সরকারি খাসজমিতে মহিষের ঘাস খাওয়ানোর জন্য চাঁদা নেওয়ার অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে শফিকুর রহমান বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত মহিষের ওপরও ট্যাক্স বসানো হচ্ছে। মহিষকেও টাকা দিয়ে ঘাস খাওয়াতে হবে। টাকা না দিলে বিষ দিয়ে মহিষ মেরে ফেলা হবে!’
সাত মাসের মধ্যে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে ‘জবাই করা হয়েছে’ মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, আগের স্বৈরাচারী সরকার যে পথে হেঁটেছে, বর্তমান সরকারও একই পথে হাঁটছে। বিরোধী দল মুখে আঙুল দিয়ে বসে থাকবে না। বিরোধী দলের ৮৯ জন সংসদ সদস্য সারা দেশের ১৮ কোটি মানুষের পাহারাদার হিসেবে কাজ করবেন।
বিএনপি বদলে গেলেও বিরোধী দল তাদের কথা বদলাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করেই ছাড়বেন তাঁরা।
বিরোধী দল কারও চোখ রাঙানিকে ভয় করবে না উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, তাঁদের আন্দোলনে জ্বালাও-পোড়াও হবে না। এই আন্দোলনে নব্য ফ্যাসিবাদের পতন হবে।
বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপির কাছে সবার আগে তারা নিজেরা, তাদের পরিবার, সন্তান, ভাগনে, ভাতিজা, শ্বশুর ও স্ত্রী। এই সিন্ডিকেটের হাতে বাংলাদেশকে তুলে দেওয়া হবে না।
সভাপতির বক্তব্যে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, সরকারের মুখে অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা শুনে মানুষ এখন বিরক্ত। সরকার এত দ্রুত প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবে, তা দেশের মানুষ বুঝতে পারেনি। সরকার তাদের অতীত ভুলে গেছে। প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার পরিণতি শেখ হাসিনার কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল শনিবার ১৪টি জায়গা পরিদর্শন করলেও রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও পরিদর্শনে কেন যাননি, সেই প্রশ্ন তোলেন এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।
জুলাই বিপ্লবের সময় রাজপথে গড়ে ওঠা অভূতপূর্ব ঐক্যে বিএনপি ফাটল ধরানোর চেষ্টা করছে এবং ইসলামপন্থীদের প্রথম লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক।
মামুনুল হক বলেন, ৫০ বছর ধরে ইসলামপন্থীরা বিএনপিকে বিনা মূল্যে সহযোগিতা করে গেছেন। তাঁদের আশা ছিল, বিএনপি বাংলাদেশে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু এখন মানুষের কাছে দিবালোকের মতো পরিষ্কার, বিএনপি রাষ্ট্র মেরামত করতে চায় না। তারা বাংলাদেশে জেঁকে বসা আধিপত্যবাদীদের সঙ্গে আপস করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লবের প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে। জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কার না করে বিএনপি যদি তা অব্যাহতভাবে অগ্রাহ্য করতে থাকে, তবে তাঁরা সংবিধান সংশোধনের বদলে পুনর্লিখনের দিকে অগ্রসর হবেন। এই আন্দোলন ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের চেয়েও ব্যাপক ও ভয়ংকর হবে।
মামুনুল হক আরও বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ধীরে ধীরে শেখ হাসিনার পথে পা বাড়াচ্ছেন। সরকারের সংবিধান সংশোধনের ‘ধাপ্পাবাজিতে’ বিরোধী দল পা দেবে না।
আলেম সমাজের উদ্দেশে মামুনুল হক বলেন, ‘বিএনপির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য আমরা যদি আমাদের সন্তানদের রক্তের সঙ্গে গাদ্দারি করি, ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।’
আলোচনা সভায় লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে তারা কার্ড বিতরণের ঘোষণা দিয়েছিল। এটি এক ধরনের ঘুষ। এর মাধ্যমে নির্বাচন প্রভাবিত হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেও তারা একই কাজ করছে। এটি নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে।
অলি আহমদ বলেন, সরকার গদিচ্যুত হয়, এমন কিছু এখন পর্যন্ত বিরোধী দল করছে না। তাঁরা জনমত গড়ে তুলছেন এবং জনগণের দাবি আদায়ের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
সভায় আরও বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ।
মতামত