মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত তিন মাসব্যাপী ‘বইপড়া উৎসব-২০২৬’-এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে শ্রীমঙ্গল জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিজয়ী শিক্ষার্থী ও পাঠকদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন;মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল। স্বাগত বক্তব্য দেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান।
অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ,শিক্ষক-শিক্ষার্থী,প্রতিযোগী,অভিভাবক, সাধারণ পাঠকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়,গত ২১ জুলাই ‘বই পড়ি,মন গড়ি’ স্লোগানে শুরু হওয়া এ উৎসবের মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা,জ্ঞানচর্চায় আগ্রহ বাড়ানো এবং সৃজনশীল ও মননশীল প্রজন্ম তৈরি করা। এ আয়োজনে উপজেলার ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক,অভিভাবক ও সাধারণ পাঠকদেরও উৎসবে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়।
উৎসবের ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গত ১৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় চূড়ান্ত মূল্যায়ন পরীক্ষা। এতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠকসহ ৭৬০ জন অংশ নেন বলে আয়োজক-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন,ল্যাপটপ বা পুরস্কার পাওয়া বড় কথা নয়;বই পড়ার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের জ্ঞান,চিন্তাশক্তি ও মননশীলতার বিকাশ ঘটানোই এ উৎসবের মূল সার্থকতা। তরুণেরাই আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর। তাদের মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
তিনি বলেন,প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি তরুণদের বইয়ের সঙ্গেও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এ উৎসব শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বই পড়তে উৎসাহিত করবে এবং দেশ ও সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
উৎসবে ল্যাপটপ বিজয়ী দি বাডস রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাজশ্রী হালদার নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন,ল্যাপটপ পেয়ে তিনি খুব আনন্দিত। তবে এর চেয়েও বেশি আনন্দের বিষয় হলো,বই পড়ার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অনেক জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছেন।
রাজশ্রী বলেন,তিনটি পর্বে নির্ধারিত বইগুলো পড়ার মাধ্যমে তাঁদের জ্ঞানের বিকাশ ঘটেছে। আগে অনেক সময় মোবাইল ফোনে আসক্ত থাকলেও এখন বই পড়ে নতুন নতুন বিষয় জানতে পারছেন এবং নিজেদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে পারছেন। বিশেষ করে ‘জিবরাইলের ডানা’ ও ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’ বই দুটি পড়ে অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পেরেছেন।
উচ্চমাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে ল্যাপটপ বিজয়ী শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী তাসনুভা সুহা বলেন,তিন মাসে তিনটি পর্বে তিনটি ব্যতিক্রমধর্মী বই পড়তে হয়েছে। বইগুলো পড়ে তাঁর খুব ভালো লেগেছে। পাওয়া ল্যাপটপটি পড়াশোনার কাজে ব্যবহার করবেন। এর মাধ্যমে অনলাইন ক্লাস করা এবং পড়াশোনার বিভিন্ন কাজে সুবিধা হবে বলেও জানান তিনি।
এ উৎসবের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল,এতে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়,বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষের অংশগ্রহণ। শিক্ষক,প্রভাষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান,সরকারি কর্মকর্তা,ব্যাংকার,সাংবাদিক,ফার্মাসিস্ট, ইলেকট্রিশিয়ান, গৃহিণী ও সাধারণ পাঠকেরাও বই পড়ার এ উদ্যোগে যুক্ত হন।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও প্রভাষক,শিক্ষার্থী,সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষক আহম্মদ আলী রুবেল,হাফছা খাতুন,নূর মোহাম্মদ (মুশফিক),রুমা আক্তার,গৌরী রানী শীল, তামভীর হোসেন ফরহাদ,কাজী শওকত হোসেন,মিঠু চন্দ্র পাল,মিনারুল ইসলাম, কাকলী পুরকায়স্থ,তমা দাশ,বাদশাহ ফয়সাল,নিশান চৌধুরী,সুমন,শুভ রায়, হাবিবুর রহমান ও জহিরুল ইসলাম মিঠু।
এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা মো. নাজমুল আলম,উজ্জ্বল সূত্রধর ও রাজু বিশ্বাস, ব্যাংকার শাহীন সিরাজী,ফার্মাসিস্ট কংকন পুরকায়স্থ,ইলেকট্রিশিয়ান সোহানুর রহমান রনি,শিক্ষার্থী উর্মি আক্তার ও সমীরণ সরকার,গৃহিণী রত্না চক্রবর্তী ও ফারহানা আফরোজ, সাংবাদিক সত্যজিৎ দাস,প্রথম আলোর শিমুল তরফদার এবং দ্বারিকা পাল মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ জলি পালসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ উদ্যোগে অংশ নেন। উন্মুক্ত বিভাগে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে একটি করে বই ও সম্মাননাপত্র দেওয়া হয়েছে।
বইপড়া উৎসবের অন্যতম আয়োজক-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দেবাশীষ দাশ শিক্ষার্থীদের বই পর্যালোচনা বা বুক রিভিউ লেখার প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে,চূড়ান্ত পর্বের মূল্যায়নে শিক্ষার্থীরা যে মানের বুক রিভিউ লিখেছে, তা তাদের চিন্তা,সৃজনশীলতা ও কল্পনার জগতের পরিচয় দেয়।
তিনি জানান,প্রায় সব বুক রিভিউ তিনি পড়েছেন। কয়েকজন শিক্ষার্থী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তা নিয়ে থাকতে পারে, তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিজেরাই লিখেছে বলে তাঁর মনে হয়েছে। একই বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে লেখা হলেও শিক্ষার্থীদের রচনাগুলোর মধ্যে স্বতন্ত্রতা রয়েছে,যা তাদের নিজস্ব চিন্তা ও উপলব্ধির পরিচয় বহন করে।
দেবাশীষ দাশ আরও জানান,শ্রেণিভিত্তিক সেরা বুক রিভিউগুলো নিয়ে পৃথক দেয়ালিকা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে,যাতে শিক্ষার্থীসহ বইপ্রেমীরা সেগুলো পড়ার সুযোগ পান।
তিনি এ আয়োজন সফল করতে সহযোগিতা করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, ফোকাল পারসন,শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন,এ অর্জনের কৃতিত্ব তাদেরই।
তিন মাসব্যাপী এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও বই পড়াকে নিয়মিত চর্চায় পরিণত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বইয়ের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন, চিন্তার বিকাশ এবং সৃজনশীলতা চর্চার এ উদ্যোগ শ্রীমঙ্গলে পাঠাভ্যাস বিস্তারে ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা প্রকাশ করেছেন।
আয়োজকদের প্রত্যাশা,বইপড়ার এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং শিক্ষার্থীসহ সব বয়সী পাঠকের মধ্যে জ্ঞানচর্চার আগ্রহ আরও বাড়বে। বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যত গভীর হবে,ততই জ্ঞাননির্ভর,মানবিক ও আলোকিত সমাজ গঠনের পথ সুগম হবে।
মতামত