নীলফামারীর সৈয়দপুরে মানসিক প্রতিবন্ধী পিতাকে জিম্মি মেয়ে ও জামাই ৮৩ শতক জমি লিখে নেওয়ার প্রতিবাদ করায় বাড়িতে হামলা করে মারধর ও ভাঙ্চুর করা হয়েছে। সেই সাথে প্রাণনাশ করাসহ মিথ্যে মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে। এতে আতঙ্কে রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন একটা ভুক্তভোগী অসহায় পরিবার।
ঘটনাটি ঘটেছে নীলফামারীর সৈয়দপুর পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডের কয়া গোলাহাট সরকারপাড়ায়। সোমবার (৫ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১২ টায় ভুক্তভোগী পরিবারটি নিজ বাড়িতে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই অভিযোগ তুলে ধরেছেন। এসময় তারা জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রশাসন ও মানবাধিকার সংগঠনের কাছে ন্যায় বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
জানা যায়, ওই পাড়ার মোখছেদ আলী (৭৫) বয়সের কারণে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন। গত ৫ বছর হলো তিনি মাঝে মধ্যেই বাড়ি থেকে বের হয়ে পথ ভুলে অন্যত্র চলে যান। অনেক সময় খোঁজা খুঁজি করে ৭-১০ দিন পর তাকে দূরে কোথাও থেকে পাওয়া যায়। একবছর আগে তিনি এভাবে জলঢাকার মীরগঞ্জ এলাকায় চলে গিয়েছিলেন। পরে ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পেরে তাকে উদ্ধার করা হয়।
এই বৃদ্ধের ২ ছেলে ও ১ মেয়ে। ছেলেরাও জন্মগতভাবে একটা আলাভোলা ধরনের। শুধু মেয়েটিই স্বাভাবিক। বড় ছেলের ৪ সন্তান। ছোট ছেলের ২ সন্তান। আর মেয়ের ১ সন্তান। গত ১৮ ফেব্রুয়ারী মেয়ে মোরশেদা বেগম ও জামাই আমজাদ হোসেন ৮৩ শতক লিখে নিয়েছেন বৃদ্ধের কাছ থেকে। এতে প্রতিবাদ জানায় বড় ছেলে আবু বকরের (৪৮) স্ত্রী আফরোজা বেগম ও ছেলে আখতারুজ্জামান (২০)।
এর প্রেক্ষিতে পারিবারিক ঝগড়ার সৃষ্টি হয় এবং দলিল বাতিল করাসহ বৃদ্ধের সকল সম্পদ বাটোয়ারার জন্য আদালতে মামলা করে বড় নাতি। এতে বিরোধ আরও বেড়ে যায় এবং বিষয়টা এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত শনিবার (৩ সেপ্টেম্বর) মেয়ে মোরশেদা, জামাই আমজাদ ও ছোট ছেলের বউ রুনি বেগম দলবদ্ধ হয়ে হামলা করে বড় ছেলের পরিবারের উপর। এসময় মারধর করাসহ ঘরের দরজা ভেঙ্গে জিনিসপত্র তচনচ করে।
বৃদ্ধের নাতি আখতারুজ্জামান বলেন, মূলত: আমার বাবা ও চাচা মানসিক প্রতিবন্ধী (আলাভোলা)। এই সুযোগে আমার ফুফু মোরশেদা ও তার স্বামী আমজাদ হোসেন আমার মানসিক ভারসাম্যহীন দাদাকে ফুসলিয়ে ও নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে জিম্মি করে গত ১৮ ফেব্রুয়ারী ৮৩ শতক জমি লিখে নিয়েছেন। এখন বাকি জমিও লিখে নেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।
আমার বাবার কাছে কিছু দলিল দস্তাবেজ থাকায় কিছুদিন থেকে সেগুলোও তারা চাচ্ছেন। না দেওয়ায় শনিবার সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে আমাকেসহ বাবা মায়ের উপর চড়াও হয়ে বেধড়ক মারধর করেছে। এমনকি আমার শিশু ২ ভাইও তাদের হামলা থেকে রেহাই পায়নি। এক পর্যায়ে ঘরের দরজা ভেঙ্গে জিনিসপত্র তচনচ ও ভাঙ্চুর করেছে। এখন আবার হুমকি দিচ্ছে বাটোয়ারা মামলা তুলে নিয়ে দলিলগুলো না দিলে রাস্তায় ভাড়াটিয়া মাস্তান দিয়ে মেরে ফেলবে এবং মিথ্যে মামলায় ফাঁসাবে।
একই কথা বলেন বড় ছেলে আবু বকর ও তার স্ত্রী আফরোজা। তারা আরও বলেন, মোরশেদা ও আমজাদ হোসেন এখন মোতালেব ও তার স্ত্রী রুনি বেগমকে কিছু জমি লিখে দেওয়ার লোভ দেখিয়েছে। এজন্য তারাও আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে হামলায় অংশ নিয়েছে। আমাদের বঞ্চিত করে তারা বাবার প্রায় ২৫-২৮ দোন (৭৫০ থেকে ৮৪০ শতক) সম্পত্তি পুরোটাই দখলে নিতে ষড়যন্ত্র করছে। আর এর প্রতিবাদ করায় মারধর ও ভাঙ্চুরের শিকার হয়েছি আমরা। এর বিচার চাই।
অভিযোগের ব্যাপারে কথা বলতে গেলে মোতালেবের স্ত্রী রুনি বেগম বলেন, আখতারুজ্জামান ছোট ছেলে হয়েও বেশি বেড়েছে। নানা বাড়ির লোকজনের কথায় সে ফুফু ও ফুফার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এখন আদালতেই সমাধান হবে। মারধরের বিষয়ে বলেন, কমই হয়েছে। বাড়াবাড়ি করলে জবাই করে ফেলবো। ফাজলামি পাইছে আমাদের পারিবারিক বিষয়ে বাহিরের লোকজনকে নিয়ে আসছে। দেখি তারা কি করতে পারে।
বৃদ্ধের মেয়ে মোরশেদা ও জামাই আমজাদ হোসেনের বাড়িতে গেলে তারা বলেন, আমরা নিজে লিখে নেয়নি। যার জমি তিনিই লিখে দিয়েছেন। আর ভাঙ্চুরের অভিযোগকে মিথ্যে বলে দাবি করেন। অথচ ভেঙ্গে ফেলা দরজা তাদের বাড়িতে রাখা আছে। এসময় তারা বৃদ্ধ মোখছেদ আলীকে উপস্থিত করেন। বৃদ্ধ বলেন, আমি খুশি হয়ে মেয়েকে ৮৩ শতক জমি লিখে দিয়েছি। সে আরও জমি পাবে। ছেলেদেরকেও তাদের প্রাপ্য দিবো। সময় হলে তারাও জমি পাবে।
এর আগেই যদি আল্লাহ না করুন আপনি মারা যান তখন কি হবে? মেয়ে ও ছেলেদের একসাথে বন্টন করে দেননি কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জমিগুলোর খাজনা খারিজ করতে যে টাকার দরকার তা তো ছেলেরা দিতে পারেনি। তাই তাদের অংশ লিখে দিতে দেরি হচ্ছে। আর যদি আমি মারা যাই তাহলে বাকি জমি বন্টন হবে। এতে মেয়ে আর কোন জমি পাবেনা। মেয়ে যদি দাবি না ছাড়ে তাহলে কি হবে? জানতে চাইলে তিনি নিরব থাকেন।
মতামত