নীলফামারীর সৈয়দপুরে আহমেদ প্লাইউড কোম্পানির অনিয়ম দূর্নীতি তদন্তে সব নথিপত্র ও ল্যাপটপ জব্দ করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এসময় কাস্টমস কর্মকর্তাদের হেনস্তা ও অপদস্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনা ধামাচাপা দিতে মিথ্যে কথা বলে শ্রমিকদের লেলিয়ে দিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করা হয়েছে। কিন্তু জনতার প্রতিরোধে সেই কর্মসূচী ভেস্তে গেছে।বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে কামারপুকুর ধলাগাছ এলাকায় রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে এই ঘটনা ঘটেছে।
জানা যায়, আহমেদ প্লাইউড কোম্পানির নানা অনিয়ম দূর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কাস্টমস এর রংপুর আঞ্চলিক অফিস কর্তৃপক্ষ গত ৩ নভেম্বর প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও ল্যাপটপ জব্দ করে নিয়ে যায়। এসময় কাস্টমসের লোকজনকে হেনস্তা করা হয়। এর প্রেক্ষিতে নিজেদের অপরাধ ঢাকতে শ্রমিকদের ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।
এর অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার দুপুরে ফ্যাক্টরীর ভেতরে প্রথমে মাত্র ৫ জন সংবাদ কর্মীকে ডেকে কাস্টমস এর বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। পরে ওই সংবাদ কর্মীদের পরামর্শেই শ্রমিকদের লেলিয়ে দেওয়া হয় সড়কে। এজন্য শ্রমিকদের বলা হয় কাস্টমস সব কাগজপত্র ও ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়ায় এমাসে তোমাদের বেতন দেওয়া সম্ভব হবেনা। তাই আন্দোলনের মাধ্যমে প্রশাসনকে বাধ্য করে জব্দকৃত কাগজপত্র ও ল্যাপটপ ফেরত আনতে হবে।
এর প্রেক্ষিতে শ্রমিকরা ফ্যাক্টরী থেকে বেরিয়েই গেটের সামনে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে বসে পড়ে। প্রায় ২ ঘন্টা ধরে তারা সড়ক অবরোধ করে রাখে। এসময় তারা বেতন পেতে নথিপত্র ফেরত দেওয়ার দাবি জানান। কিন্তু বেতনের জন্য মালিক পক্ষের কাছে দাবি না জানিয়ে সড়কে কেন? জানতে চাইলে তারা বলেন, কাগজপত্র না থাকায় বেতন দিতে পারছেন না বলে কর্তৃপক্ষ জানানোর কারণেই আমরা আন্দোলনে নেমেছি।
পরে এলাকার লোকজন ও ভোগান্তির শিকার শত শত গাড়ির চালক ও হেলপাররা ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানান। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে বাক বিতন্ডা হয়। এসময় উপস্থিত লোকজন ও সংবাদ কর্মীরা শ্রমিকদের বলেন, তোমাদের বেতন তো দিবে মালিক। তাহলে তোমরা মালিককে না ধরে এভাবে সড়কে এসে সাধারণ মানুষকে দূর্ভোগে ফেলেছো কেন? মালিক ইচ্ছে করলেই বেতন দিতে পারেন। তোমরা মালিকের কাছেই দাবি জানাও। মালিক তোমাদের ভূল বুঝিয়েছে। কাস্টমস কর্তৃক কাগজপত্র ও ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়ার কারণে বেতন দিতে না পারার বক্তব্য তাদের মিথ্যে অজুহাত।
তাছাড়া প্রশাসন কোম্পানির অনিয়ম দূর্নীতির তদন্ত করতেই কাগজপত্র ও ল্যাপটপ নিয়ে গেছে। এটা যদি আইন বিরোধী হয় তাহলে মালিক যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারেন। কিন্তু তা না করে তোমাদেরকে ব্যবহার করে ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহের অপচেষ্টা করছে। এসময় মালিক পক্ষের শ্রমিকদের উপর অকারণে নানা নির্যাতন ও মজুরি বৈষম্যের বিষয় তুলে ধরলে শ্রমিকরা তাদের ভুল বুঝতে পারে এবং কর্মসূচী সমাপ্ত করার উদ্যোগ নেয়। তবে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কয়েকজন তা মেনে নিতে অনিহা প্রকাশ করেন। এতে দূর্ভোগগ্রস্থদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়। তারা ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন। ফলে চালকরা জোর করেই গাড়ি চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং একযোগে গাড়ি চালু করে এগিয়ে যায়। এমতাবস্থায় শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে সড়ক থেকে সরে যায়।
এলাকার লোকজন সাংবাদিকদের বলেন, এই ফ্যাক্টরী আমাদের জমিতেই গড়ে উঠেছে। অথচ স্থানীয়দের এখানে কাজে নেওয়া হয়না। তাছাড়া শ্রমিকদের চরম অত্যাচার করে। ভ্যাট ট্যাক্স ফাঁকি দিতে রাতের আঁধারে শত শত ট্রাক ভরে মালামাল সরানো হয়। এজন্যই কাস্টমস কাগজপত্র ও ল্যাপটপ জব্দ করেছে। জমি কেনার ক্ষেত্রেও এলাকার লোকজনকে বাধ্য করা হয়েছে। আজ একইভাবে শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে মিথ্যে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং জন মানুষকে দূর্ভোগে ফেলেছে। এর দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
নীলফামারীর জেলা মটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, এই ফ্যাক্টরীর মালিক আওয়ামী লীগের লোক। বিগত দিনে তারা শত শত কোটি টাকা ভ্যাট ট্যাক্স ফাঁকি দিয়েছে। এজন্য কাস্টমস অনিয়ম দূর্নীতি তদন্তে নথিপত্র ও ল্যাপটপ জব্দ করেছে। এতে শ্রমিকদের কোন বিষয় নাই। অথচ নিজেদের অনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে শ্রমিকদের উস্কে দিয়ে এই সড়ক অবরোধ করা হয়েছে। মিথ্যে অভিযোগ তুলে অপরাধ ঢাকার অপচেষ্টা করছে। সম্পূর্ণ পরিকল্পিত ভাবে সরকারকে বিব্রত করতেই এমন জনভোগান্তি সৃষ্টি করেছে। এজন্য ফ্যাক্টরীর মালিক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
আহমেদ প্লাইউড কোম্পানির মহা ব্যবস্থাপক (জিএম) এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা শ্রমিকদের সড়কে নামাইনি। বরং কাস্টমস ইচ্ছেকৃতভাবে আমাদের উপর অন্যায় করেছে। মূলত: সরকারকে বিব্রত করতেই কাস্টমস এর ভেতরে থাকা সরকার বিরোধীরা এমন করেছে। এজন্য আমরা শ্রমিকদের বেতন দিতে পারছিনা। তাই শ্রমিকরা আন্দোলন করছে। কাস্টমসের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে এভাবে শ্রমিকদের উস্কে দিয়েছেন কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা তো অনেক সময়ের ব্যাপার।
আপনাদের প্রশ্রয়ে ও উস্কানিতেই শ্রমিকরা সড়কে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তা না হলে শ্রমিকরা কিভাবে সড়কে আসতে পারলো? এই প্রশ্নের জবাবে জিএম বলেন, শ্রমিকরা শুধু বেতনের জন্য কাজ করে। তারাতো আমাদের হুকুমে চলেনা। তাদের বেতন দিতে না পারাতো আপনাদের ব্যর্থতা। তাহলে শ্রমিকরা আপনাদের কাছে দাবি না জানিয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলছে কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, মূলত: এটা শ্রমিকদের ব্যাপার। আর আমরা উদ্যোগ নিয়েছি দুই একদিনের মধ্যে বেতন দেওয়ার। এই জনভোগান্তির জন্য কাস্টমস দায়ী।
মতামত