চারদিকে খা খা রোদ্দুর। কখনো কালবৈশাখীর ঝড়, আবার কখনো বালুঝড়। এমন বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেই খেয়া নৌকার জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হতো যাত্রীদের। মাথার ওপর ছিল না ছাউনি, আশপাশেও ছিল না কোনো বাড়িঘর। রোদ-বৃষ্টি আর ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করেই নদী পারাপারের অপেক্ষায় থাকতে হতো তাঁদের। সেই দুর্ভোগ লাঘবে এবার খেয়াঘাটে তৈরি হয়েছে ছোট্ট একটি যাত্রীছাউনি। আকারে ছোট হলেও এটি এখন নদী পারাপারের অপেক্ষায় থাকা শত শত মানুষের কাছে স্বস্তির আশ্রয় হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার চরনাছিরপুর ইউনিয়ন পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদবেষ্টিত একটি জনপদ। এ ইউনিয়নের অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন খেয়া নৌকায় নদী পার হয়ে উপজেলা সদরে আসেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, কেনাকাটা, চিকিৎসাসেবা গ্রহণ, শিক্ষা কার্যক্রমসহ নানা প্রয়োজনে তাঁদের উপজেলা সদরে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু নদীর পাড়ে এসে খেয়া নৌকার জন্য অপেক্ষা করাই তাঁদের অন্যতম ভোগান্তি। ইচ্ছা করলেই সব সময় নৌকা পাওয়া যায় না। কখনো কখনো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের।
বিশেষ করে প্রচণ্ড রোদ, বৃষ্টি কিংবা ঝোড়ো বাতাসের সময় অপেক্ষার দুর্ভোগ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। আশপাশে কোনো বসতি বা বাড়িঘর না থাকায় আশ্রয় নেওয়ারও সুযোগ ছিল না। এতে নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি পোহাতে হতো বেশি।
যাত্রীদের এমন দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে চরনাছিরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রোকনুজ্জামান নিজ অর্থায়নে ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম চরের মধ্যে দুর্বারটেক খেয়াঘাটে একটি ছোট যাত্রীছাউনি নির্মাণ করেছেন। ছাউনিটি তৈরি হওয়ায় এখন নৌকার জন্য অপেক্ষার সময় রোদ-বৃষ্টি থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাচ্ছেন যাত্রীরা। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মালামাল রাখা ও বৃষ্টি থেকে সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এটি কাজে আসছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন মোল্যা বলেন, “রোদ-বৃষ্টি যা-ই হোক, নৌকা আসতে দেরি হলেও এখন আর আগের মতো অসুবিধা হয় না। যাত্রীদের মাথার ওপর অন্তত একটু আশ্রয় রয়েছে। এটি আমাদের অনেক উপকারে এসেছে।
উপজেলা সদরে চিকিৎসা নিতে আসা জামেলা বেগম বলেন, আগে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে নৌকার জন্য দাঁড়িয়ে থাকলে ভিজে যেতাম। আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো জায়গা ছিল না। চেয়ারম্যানের এই উদ্যোগে এখন অন্তত একটু আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়েছে।
ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আঃ জব্বার মেম্বার বলেন, খেয়া ঘাট চালু হওয়ার পর থেকে এখানে কোন ছাউনি ছিলনা। রোদ বৃস্টি ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো।অনেক সময় জেলা ও উপজেলা থেকে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা চরাঞ্চল পরিদর্শনে আসলে এই খেয়াঘাটেই তাদেরও অপেক্ষা করতে হতো। চেয়ারম্যান নিজের টাকায় যাত্রী ছাউনি করে দিয়েছে। এখন সবাই এখানে একটু হলেও স্বস্তি খুজে পায়। এই যাত্রী ছাউনি মানবিক কাজের উজ্জ্বল দৃস্টান্ত। নৌকা কখন আসবে, তা নিয়ে আগের মতো আর দুশ্চিন্তা করতে হয় না।
চরনাছিরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রোকনুজ্জামান বলেন, “অনেক দিন ধরেই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্বারটেক শিমুলতলী খেয়াঘাটে যাত্রীদের অপেক্ষা করার জন্য কোনো ছাউনি ছিল না। রোদ-বৃষ্টি ও ঝড়ের মধ্যেই তাঁদের দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। বিষয়টি বিবেচনা করে মানবিক দিক থেকে নিজের অর্থায়নে যাত্রীছাউনিটি নির্মাণ করেছি। স্থাপনাটি ছোট হলেও অনেক যাত্রী এর সুফল পাচ্ছেন। মানুষের উপকারে আসতে পেরেছি, এতেই আমি তৃপ্ত।
ছোট্ট এই উদ্যোগে চরনাছিরপুরের খেয়াঘাটে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কিছুটা কমেছে। স্থানীয়দের মতে, জনদুর্ভোগ লাঘবে এ ধরনের মানবিক উদ্যোগ অন্যদেরও উৎসাহিত করতে পারে।
মতামত