জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং রাজস্ব আদায়ে ধীরগতিসহ নানা অভ্যন্তরীণ সমস্যায় বাংলাদেশের অর্থনীতি চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়ায় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে যেতে পারে। তবে সরকার দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারলে এবং জ্বালানি সংকটের সমাধান হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।
মঙ্গলবার ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের কার্যালয়ে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এতে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম, জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা ও নাজমুস সাদাত খান বক্তব্য দেন।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সময়ে খেলাপি ঋণ ও ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির কারণে আর্থিক খাতেও ঝুঁকি বাড়ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্যও বাড়ছে।
সরকার সামাজিক নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও সারসহ বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করলেও এর উল্লেখযোগ্য অংশ প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারও এসব সুবিধার একটি বড় অংশ পাচ্ছে। ফলে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অনেকেই সহায়তার বাইরে থাকছেন।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম বলেন, অর্থনীতিকে আবারও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফেরাতে ব্যাংকিং, রাজস্ব ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলোও দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রবৃদ্ধি নামতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারেনি। কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, আবার কেউ উৎপাদন বন্ধ বা কর্মী ছাঁটাই করেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ শতাংশ। ওই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। করোনা মহামারির পর কোনো প্রান্তিকে শিল্প খাতে এটিই প্রথম সংকোচন।
অর্থনীতির এই ধীরগতির প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারেও। শিল্প ও সেবা খাতে চাকরি হারানো অনেক নারী শ্রমবাজার থেকে সরে গেছেন। ফলে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। তবে ২০২৫ সালের পর নতুন শ্রমশক্তি জরিপ না থাকায় সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
টানা চার বছর বাড়ছে দারিদ্র্য
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দৈনিক ৩ ডলারের দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের হার ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে এই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে।
জাতীয় দারিদ্র্যসীমার হিসাবেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা বেড়ে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে।
ব্যাংক খাতে বাড়ছে ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে।
ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ। ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন ও আমানত সুরক্ষা আইন পাসের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে বিশ্বব্যাংক।
তবে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বারবার ছাড় ও তারল্য সহায়তা দেওয়ার কারণে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং সমস্যার স্থায়ী সমাধান পিছিয়ে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, বাড়ছে ব্যয়
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ কর আদায় করতে পেরেছে। মোট রাজস্ব জিডিপির ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। এর মধ্যে কর-রাজস্বের পরিমাণ প্রায় ৭ শতাংশ।
সীমিত করভিত্তি, কর ফাঁকি, দুর্বল প্রশাসন এবং অতিরিক্ত করছাড় রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। করনীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনকে আলাদা করার উদ্যোগও এখন পর্যন্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
সংস্কারে তিন খাতে জোর
ব্যাংক খাতের সংস্কারে দ্রুত সম্পদের মান যাচাই করে কোন ব্যাংক টিকে থাকার মতো অবস্থায় আছে, তা নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যাংকের মালিক, বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের লোকসানের দায় নেওয়া এবং নিয়ন্ত্রক ছাড় ধীরে ধীরে বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
জ্বালানি খাতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ, বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা উন্নত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প গ্রহণ ও বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করার কথাও বলেছে সংস্থাটি।
রাজস্ব বাড়াতে করনীতি ও কর প্রশাসন পৃথক করা, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে কর ফাঁকি শনাক্ত করা এবং অকার্যকর করছাড় ধাপে ধাপে কমানোর পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সঠিকভাবে সহায়তা দিলে দারিদ্র্য কমতে পারে
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সরকারের বর্তমান আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির মাত্র ৫৪ শতাংশ প্রকৃত দরিদ্র মানুষ পাচ্ছেন। অর্থাৎ এসব কর্মসূচির বড় একটি অংশ তুলনামূলক সচ্ছল জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, খাদ্যভিত্তিক বিভিন্ন ভর্তুকি একত্র করা এবং নগদ সহায়তা কর্মসূচিতে আরও ভালোভাবে উপকারভোগী নির্বাচন করার পাশাপাশি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে নিয়ে আসা সম্ভব।
সীমিত সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ সুফল পেতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও নির্দিষ্টভাবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
মতামত