গণিতের জটিলতা শেষে ‘ইউরি’ লিখবেন দেং ইউ
যদি একদিন গণিতের সব জটিল সমস্যার সমাধান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) করে ফেলে, তাহলে গণিতবিদ হিসেবে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিকল্প পরিকল্পনাও ভেবে রেখেছেন ৩৭ বছর বয়সী চীনা গণিতবিদ দেং ইউ। ২০২৬ সালের ফিল্ডস মেডেলজয়ী এই গণিতবিদ জানিয়েছেন, এআই তাকে বেকার করে দিলে তিনি বাড়ি ফিরে ‘ইউরি’ উপন্যাস লিখবেন।
দেং ইউ রসিকতা করে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ‘এআই যদি গণিতের সব সমস্যার সমাধান করেই দেয়, তাহলে আমি বাড়ি গিয়ে আমার “ইউরি” উপন্যাস লিখব।’
জাপানি উপন্যাস ও কমিকসের একটি বিশেষ ধারা ‘ইউরি’। এতে নারীদের মধ্যকার অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব ও প্রেমের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়। দেং ইউ এই ধারার বড় ভক্ত হিসেবে পরিচিত।
পরে চীনের আরেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার পোস্টটি শেয়ার করা হয়। সেখানে এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতিতে গণিতবিদদের মধ্যে তৈরি হওয়া অস্থিরতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
দেং ইউ লেখেন, গণিতবিদদের মহলে এআই একধরনের ‘অস্থিরতা ও অধৈর্যতার পরিবেশ’ তৈরি করেছে। তবে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে এই ধাক্কা সামলে উঠলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, গণিতও স্বাভাবিক নিয়মে ধীরগতিতে এআইয়ের সঙ্গে মানিয়ে নেবে এবং এর পাশাপাশি নতুন একটি ইকোসিস্টেমও গড়ে উঠছে।
বুধবার সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে দেং ইউ বলেন, তিনি বর্তমানে কোনো ইউরি উপন্যাস লিখছেন না। পুরো বিষয়টিই ছিল রসিকতা।
তিনি বলেন, ‘আমি এখন কোনো ইউরি উপন্যাস লিখছি না। ওই কথাটি একেবারেই রসিকতা করে বলেছিলাম।’
এআই যে গণিতের সব সমস্যার সমাধান করে ফেলবে, এমন সম্ভাবনাও দেখছেন না এই গণিতবিদ। তার ভাষ্য, ‘আমার মনে হয় না এআই এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যে গণিতের সব সমস্যার সমাধান করে ফেলবে; অন্তত আমার পোস্টে আমি যেগুলোর কথা উল্লেখ করেছি, সেগুলো তো নয়ই।’
তবে এআইয়ের সক্ষমতা নিয়ে গণিতবিদদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এরই মধ্যে অমীমাংসিত গণিত সমস্যার সমাধানে এআইয়ের ব্যবহারের বড় উদাহরণ সামনে এসেছে।
৮ সেপ্টেম্বর ওপেনএআই জানায়, তাদের একটি মডেল ব্যবহার করে নেভিয়ার স্টোকস মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেমের সমাধান করা হয়েছে। আধুনিক গণিতের সবচেয়ে জটিল অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর একটি এটি।
২০০০ সালের ২৪ মে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্লে ম্যাথমেটিক্স ইনস্টিটিউট গণিতের সাতটি বড় চ্যালেঞ্জকে ‘মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেম’ হিসেবে ঘোষণা করে। প্রতিটি সমস্যার সমাধানের জন্য ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে।
২০০৩ সালে রুশ গণিতবিদ গ্রিগরি পেরেলমান এর মধ্যে পয়েনকেয়ার কনজেকচার নামের একটি সমস্যার সমাধান করেন। তবে তিনি এই আর্থিক পুরস্কার এবং পরবর্তীতে পাওয়া ফিল্ডস মেডেলও প্রত্যাখ্যান করেন।
এখন দ্বিতীয় একটি মিলেনিয়াম প্রাইজ প্রবলেমও সমাধান হয়ে থাকতে পারে। তবে এবার সমাধানটি কোনো একক মানুষের হাতে নয়, এআইয়ের সহায়তায় হয়েছে বলে দাবি করছে ওপেনএআই।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্যমতে, সমাধানটি তৈরি করা হয়েছে তাদের এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না পাওয়া পরবর্তী প্রজন্মের একটি মডেল ব্যবহার করে। মডেলটি টানা ৮৮ ঘণ্টা কাজ করেছে এবং এতে প্রায় ১৩০ বিলিয়ন আউটপুট টোকেন ব্যবহার হয়েছে। এর আনুমানিক ব্যয় কয়েক মিলিয়ন ডলার।
তবে একই সমস্যা নিয়ে কাজ করা এক গণিতবিদ দাবি করেছেন, তার গবেষণার অগ্রগতি জানার পরই ওপেনএআই এ বিষয়ে নিজেদের প্রচেষ্টা শুরু করে।
৮ সেপ্টেম্বর সায়েন্টিফিক আমেরিকানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওপেনএআই তাদের প্রমাণের ঘোষণা দেওয়ার আগের রাতে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গণিতের অধ্যাপক ট্রিস্টান বাকমাস্টার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তিনি ও অ্যানথ্রোপিকের গবেষক লেভেন্ট আলপোগে অয়লার সমীকরণ প্রমাণ করেছেন।
নেভিয়ার স্টোকস সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অয়লার সমীকরণকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করেন গণিতবিদরা।
বাকমাস্টারের দাবি, অয়লার সমীকরণ সমাধানে তিনি ও তার সহযোগী এআইয়ের বেশ কয়েকটি মডেল ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে ওপেনএআইয়ের একটি মডেলও ছিল।
সোমবার এক বিবৃতিতে বাকমাস্টার বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ আগে ওপেনএআই তাদের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে পারে। এরপর পুরো সমস্যাটি সমাধানে তারা ওই গণিতবিদদের ব্যবহৃত পদ্ধতিই অনুসরণ করে।
তবে ওপেনএআই পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করে, তারা অয়লার সমীকরণগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্রমাণ করেছে। একই সঙ্গে অন্য গণিতবিদদের ধারণা থেকে কোনো ধরনের রসদ পাওয়ার সম্ভাবনাও পুরোপুরি অস্বীকার করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
ওপেনএআইয়ের ভাষ্য, তাদের পণ্য ব্যবহারের সময় গণিতবিদদের নাম পরিচয়হীন ডেটা সম্ভবত তাদের মডেলগুলোর মান উন্নত করতে সহায়তা করেছে।
এদিকে আমেরিকান ম্যাথমেটিকাল সোসাইটি মঙ্গলবার জানিয়েছে, আলপোগে ও বাকমাস্টার নতুন প্রযুক্তির সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করলেও চূড়ান্ত প্রমাণটি ওপেনএআইয়ের গণিতবিদরাই সম্পন্ন করেছেন।
ফলে গণিতের মতো সৃজনশীল ও উচ্চস্তরের গবেষণার ক্ষেত্রেও এআইয়ের সক্ষমতা কতদূর যাবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আর সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ফিল্ডস মেডালজয়ী দেং ইউর ‘ইউরি উপন্যাস’ লেখার রসিকতা আলোচনায় এনেছে গণিতবিদদের ভবিষ্যৎ নিয়েও মজার এক প্রশ্ন।